গত রবিবার ২১শে ডিসেম্বর’১৪ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্টানে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী বলেন, ‘কোন
রাজনীতিক,
কর্পোরেট শক্তি
ও ধর্মীয় নেতাদের কথায় কান দিও না। চলো নিজের চেতনার ডাকে সাড়া দিয়ে’। তাঁর বক্তব্যের পর হাততালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ। তৃণমূল সাংসদ ও প্রেসিডেন্সির মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান সুগত বসু প্রাক্তন রাজ্যপালের এই মন্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করেন এবং বলেন, আজকের ছাত্রদের সামনে স্বামী বিবেকানন্দ বা নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের মত কোন রোল মডেল নেই। তাই তারা যেন কোন রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় নেতাদের দিকে তাকিয়ে না থাকে এবং কারও কথায় যেন প্রভাবিত না হয়।
প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ‘পথ দেখানোর জন্য রাজনৈতিক নেতা, কর্পোরেট শক্তি ও ধর্মগুরুদের মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে চেতনার ডাকে সাড়া
দেওয়ার’
পরামর্শ শ্রোতাদের মনে আলোড়ন তুলেছে। উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দ গোপালকৃষ্ণ গান্ধী এবং তৃণমূল সাংসদ ও প্রেসিডেন্সির মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান সুগত বসুর বক্তব্যে যারপরনাই প্রভাবিত ও উল্লসিত। প্রাক্তন রাজ্যপালের কথায় স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জাগে মহাত্মা গান্ধীর উত্তরসূরি এবং একজন শিক্ষাবিদ হিসাবে তিনি যে কথা ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছেন তাতে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পর্কে তাঁর একটা বিজাতীয়
মনোভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে! গোপালকৃষ্ণের মত একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পর্কে এহেন খোলামেলা নগ্ন মন্তব্যে যারপরনাই অবাক হ’য়ে গেলাম। ঠিক বুঝতে পারলাম না তাঁর এই ধরণের বক্তব্য পেশের কারণটা কি! বুঝতে
পারলাম না বক্তব্যের অন্তরালে কোনো লুকোনো এজেন্ডা আছে কিনা! বুঝতে পারলাম না
একশ্রেণীর স্বার্থপর, বেইমান, বিশ্বাসঘাতক, আদর্শহীন, অশিক্ষিত, মূর্খ, লোভী, ভন্ড,
চরিত্রহীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা সম্পর্কে
বীতশ্রদ্ধ হয়েই কি তিনি এমন মন্তব্য করলেন, না-কি তামাম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের
সম্পর্কেই তাঁর এল্যার্জী? এমন অসম্পুর্ণ মন্তব্যে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা যেমন
থেকে গেল ঠিক তেমনি ছাত্র সমাজের কাছে তামাম সাদা-কালো রাজনৈতিক
নেতা, ধর্মগুরুদের সম্পর্কে চালেডালে মেশানো একটা খিচুড়ি মার্কা ভুল বার্তা পৌঁছে
দেওয়া হ’ল বলে মনে হ’ল। যার পরিণতিতে ছাত্র সমাজের ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্চিত ভয়ঙ্কর
সবরকম সম্ভাবনার সম্মুখীন হবার জায়গায় পৌঁছে গেল। যদি প্রথমে উল্লিখিত রাজনৈতিক
ও ধর্মীয় নেতাদের
সম্পর্কে বক্তা এমন বক্তব্য পেশ করে থাকেন তাহলে বলব যা বলার সরাসরি বলা ভালো,
ধোঁয়াশা রাখা ভালো না। বক্তা সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মায়। এ প্রসঙ্গে বক্তার পক্ষ
অবলম্বন করে বলা যেতেই পারে কে কি ভাবে বক্তব্য বিষয়কে নেবে সেটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত
ব্যাপার এতে বক্তার কিছু আসে যায় না। এক্ষেত্রে একটাই কথা বলতে হয়, এটা বিতর্ককে
এড়িয়ে যাবার জন্য কুযুক্তির অবতাড়না ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু যেটা আসে যায় সেটা
হ’ল সমাজ এই বক্তব্যের দ্বারা কতটা উপকৃত হ’ল। চেতনা জাগাবার কথা বলে তিনি ছাত্র সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার যে প্রয়াস গ্রহণ করলেন
তা’ যেন গোড়া কেটে আগায় জল দেবার মত মনে হ’ল। তাঁর ঐ বক্তব্যে এক অকারণ বিতর্কের
জন্ম হ’ল। চেতনা জাগাবার কথা বলে
তিনি চেতনার গর্ভে আঘাত করে বসলেন। চেতনার ভ্রুন হত্যা যে শুধু করলেন তিনি তাই নয়,
বন্ধ্যা করে দিলেন চেতনার ভূমি চিরতরে। একজন শিক্ষাবিদের হাতে উঠে এলো শিক্ষার বুক
ভেদ করার মারণ অস্ত্র। চেতনা বা বিবেক জাগ্রত হবার উৎসমুখেই তিনি সেই মারণ অস্ত্র নিক্ষেপ
ক’রে বসলেন। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, তাঁর মত একজন বিশিষ্ট সম্মানীয় প্রাজ্ঞ ব্যাক্তিত্ব কি জেনে বুঝেই
এমন বক্তব্য পেশ করলেন নাকি অজ্ঞতা থেকে করলেন? জেনে বুঝেই করুন
আর অজ্ঞতা থেকেই করুন তাঁর মত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যখন কোনো কথা বলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই
সাধারণ মানুষ সেই কথাকে বেদবাক্য বলে মনে করে এবং তাকে জীবনে গ্রহণ করে। তাই সমাজের বিশিষ্ট সম্মানীয়
ব্যাক্তির সুস্থ সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে জনগণের
উদ্দেশ্যে মতামত প্রকাশের সময় অসম্পূর্ণ বা ভুল বক্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিৎ। কারণ রাজ্যপালের মতে
চেতনার ডাকে সাড়া দিতে বলা মানে, হয় ছাত্র সমাজ চেতনার ডাকে সাড়া দিয়েই তাদের
আন্দোলন-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন আর নয় চেতনা বা বিবেকের ডাকে সাড়া না দিয়ে আন্দোলন
সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মনকে অনুসরণ করে চলেছে, যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কোনো
শক্তি। যে অস্থির মন কখনোই মানুষকে
লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় না। হয় রাজ্যপাল ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন আর না হয় তার
বিরোধিতা করলেন এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে। একটা রহস্য মেশানো দ্ব্যর্থ বক্তব্য পেশ করেছেন তিনি ছাত্র সমাজের কাছে। এ কথা
যেন সমাজের বিশিষ্ট এলিট সমাজ ভুলে না যান যে, আদর্শহীন
কোনো জীবনে চেতনা বা বিবেক বলে কিছু থাকে না, সাড়া দেওয়া তো দূরের
কথা। আর এ কথাও যেন আমরা
ভুলে না যায় যে ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের উদাহরণ
ভুরি ভুরি।
আর সুগত বসু মহাশয় প্রাক্তন রাজ্যপালের বক্তব্যের সাথে সহমত হলেন শুধু নয় সঙ্গে
একথাও তিনি স্বীকার করে নিলেন বর্তমানে নেতাজী ও বিবেকানন্দের মত কোনো ব্যক্তিত্ব
নেই যাকে ছাত্ররা অনুসরণ করবে। অতএব ছাত্ররা যেন রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় কোনো
নেতাদের দিকে না তাকান এবং অনুসরণ না করেন। এ কথায় স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যেতে
পারে যে সুগত বসু যেহেতু একজন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত
জনপ্রতিনিধি সেই হিসাবে তিনি নিজেও একজন রাজনৈতিক নেতা আর তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী
ছাত্রদের দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলের বর্তমান কোনও রাজনৈতিক নেতাকে শুধু নয় এমনকি তাঁকেও
অনুসরণ করা ও তাঁর কথায় প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। কারণ বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনৈতিক
বা ধর্মীয় নেতা হিসাবে কেউই এমনকি তিনি নিজেও ছাত্র সমাজের কাছে কি শিক্ষাবিদ ও
রাজনৈতিক দলের নেতা হিসাবে রোল মডেল হ’য়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু প্রশ্ন অন্য
জায়গায়, তিনি প্রাক্তন রাজ্যপালের কথায় সহমত পোষণ করলেও প্রকারান্তরে ঘুরিয়ে
নেতাজী ও বিবেকানন্দের কথা তুলে ধরে রাজ্যপালের কথায় ভিন্নমত পোষণ করে বুঝিয়ে
দিলেন প্রাক্তন রাজ্যপাল পুরো ঠিক কথা বলেননি। আর্ধেক ঠিক আর আর্ধেক বেঠিক। আর
বিবেকানন্দ বিষয়ে বলতে চাই বিবেকানন্দের নাম বিবেকানন্দ ছিল না, ছিল নরেন।
সর্ব্বশ্রেষ্ট আদর্শ পুরুষোত্তম পরম প্রেমময় শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণের স্পর্শে
তাঁর বিবেক জেগে উঠেছিল এবং এক আনন্দময় জীবনের অধিকারী হয়েছিলেন। তাই তাঁর নাম
হয়েছিল বিবেকানন্দ। নেতাজী অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বিবেকানন্দের জীবন থেকে। আর
নেতাজীর ডাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সাড়া দিয়ে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বাঙালী,
বিহারী, পাঞ্জাবী ইত্যাদি সমস্ত সম্প্রদায় ও জাতির মানুষ গড়ে তুলেছিলেন আজাদ হিন্দ
ফৌজ! তাই এ কথায় এটা প্রমাণ হয় যে, আদর্শের সাহচর্য ছাড়া ছাত্রদের চেতনা বা বিবেক
জাগ্রত হ’তে পারে না। লেখাপড়া না-জানা
থেকে লেখাপড়াজানাওয়ালা অশিক্ষিত চৈতন্যহীন মানুষ প্রতিনিয়ত সকাল থেকে রাত
পর্য্যন্ত ঘরে-বাইরে, কলে-কারখানায়, মাঠেঘাটে কি করছে তা আমরা পড়ছি ও দেখতে পাচ্ছি
কাগজে কাগজে ও টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে। গভীর এক শূন্যতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে বর্তমান ছাত্র সমাজ। দুর্ভাগ্যের বিষয় বর্তমান এই জটিল, অস্থির ও এক মহাশূন্য
অবস্থায় ছাত্রদের কি করা উচিৎ সে সম্পর্কে ছাত্রদের কোনও সঠিক পরামর্শও দিতে
পারেননি শিক্ষাবিদ প্রাক্তন রাজ্যপাল গপালকৃষ্ণ গান্ধী ও শিক্ষাবিদ ও নেতা সুগত বসু।
এসব দেখে শুনে মনে হয়, একটা অন্ধ আর একটা অন্ধকে পথ দেখাতে পারে না। পথ পার
হতে হলে নিদেনপক্ষে একজন খোঁড়াকে দরকার। অন্ধ ও খোঁড়া পরস্পর পরস্পরের সাহায্যে
দুর্গম পথ পার হলেও হতে পারে।
No comments:
Post a Comment