ছোটোবেলায় সরিষার তেল খেয়ে খেয়ে, গায়ে মাথায় মেখে বড় হয়েছি। পূর্বপুরুষ সর্ষের তেল খেয়ে এসেছে। শরীর তাগড়া হয়েছে, চামড়া মসৃণ হয়েছে, চুল হয়েছিল মজবুত। আজ যেমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে তেমন কোনোদিন হার্ট, লিভার খারাপ হ'তে শুনিনি, শুনিনি হাঁটুর ব্যথা।
তারপর বড় হ'য়ে হঠাৎ শুনলাম ডাক্তাররা বলছেন, সরিষার তেল হার্টের পক্ষে, পেটের পক্ষে ক্ষতিকর। বাতের পরম বন্ধু। তাই আর সরিষার তেল খাওয়া নিরাপদ নয়। তাই চালু হ'লো সাদা তেল। সূর্যমুখী তেল, রাইস বান তেল অর্থাৎ চালের তুষ থেকে তেল, বাদাম তেল, জলপাই তেল, সয়াবিন তেল ইত্যাদি নানা রকমের তেলে তেলে তেলাপিয়ার বংশবৃদ্ধির মত ভরে গেল বাজার।
ছোটোবেলায় ডালডা দিয়ে বানানো ম' ম' সুগন্ধে ভরা বাতাসে সুস্বাদু গরম গরম লুচি খেয়েছি, কখনো বা ঘিয়ে ভাজা লুচি খেয়েছি, সর্ষের তেল দিয়ে ভাজা ডগা সহ লম্বা লম্বা বেগুন ভাজা দিয়ে লুচি খেয়েছি, সর্ষের তেল দিয়ে জম্পেশ ক'রে কষানো আর ঘি দিয়ে তৈরী মাংস দিয়ে, আলুর দম দিয়ে গরম ফুলকো ময়দার লুচি খেয়েছি।
তারপর শুনলাম ডালডা আর ঘি খেলে অবধারিত স্ট্রোক, লিভার ড্যামেজ। তাই সেটাও হ'লো খাওয়া বন্ধ। বাজার থেকে উধাও হ'লো বিখ্যাত সুস্বাদু ডালডা, ঘি-এর বাজার হ'লো মন্দা।
মাখন খেতাম পাউরুটিতে লাগিয়ে, কি তার স্বাদ! পরে শুনলাম মাখন খেলে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই মাখনের পরিবর্তে বাজারে এলো মার্জারিন। তাই পাউরুটিতে লাগিয়ে খেয়েছি কিন্তু স্বাদহীন।
একটা সময় সস্তায় পাম তেলেও বাজার চেয়ে গেছিল। সরকারীভাবে রেশনেও পাল তেল সরবরাহ হ'তো। তারপর তাও বন্ধ হয়ে গেল। কেন বন্ধ হ'য়ে গেল গরীবের ঘরের ঘি পাম তেল? কেন বন্ধ হ'য়ে গেল ডালডা, ঘিয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত পাম তেল?
তাই মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা ক'রে বুদ্ধিমান মানুষ বিকল্প হিসেবে বাজারে নিয়ে এলো ১০০% স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ তেল। তেলাপিয়ার বংশবৃদ্ধির মত বাজার ছেয়ে ফেলল নানারকম উদ্ভিজ তেল যাকে আমরা চলতি কথায় বলি সাদা তেল। সূর্যমুখী তেল, রাইস বান তেল অর্থাৎ চালের তুষ থেকে তেল, বাদাম তেল, জলপাই তেল, সয়াবিন তেল ইত্যাদি নানা রকমের তেলে ভরে গেল বাজার।
এই উদ্ভিজ তেল অর্থাৎ সাদা তেল দিয়ে রান্না ক'রে খাও তরিতরকারি।মাছ, মাংস, ডিম রান্না করো সাদা তেল দিয়ে, লুচি, পরোটা, বেগুন ভাজা, আলু ভাজা, চপ, বেগুনি ইত্যাদি সব খাও সাদা তেলে। সাদা তেল জিন্দাবাদ। সর্ষের তেল, ঘি, ডালডা, মাখন মুর্দাবাদ।
এইভাবে বেশ কিছুদিন গেল। অনেক বছর ধ'রে চললো সাদা তেলের বাজার। তারপর আবার বহুদিন পর একদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় শুনলাম ডাক্তাররা বলছেন, বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা ক'রে জেনেছেন সর্ষের তেল শরীরের পক্ষে উত্তম তেল, হার্টের পক্ষে উপকারী, স্বাস্থ্যকর। আবার চালু হ'লো ঘরে ঘরে সর্ষের তেলের ব্যবহার। শুরু হ'লো সর্ষের তেলের জয়ধ্বনি। ততদিনে মানুষ অভ্যস্থ হ'য়ে গেছে উদ্ভিজ তেলে অর্থাৎ সাদা তেলে। তবুও আবার মানুষ খাওয়া শুরু করলো সর্ষের তেল ডাক্তারের আশ্বাস বাণী শুনে।
কিন্তু আজ আবার শুনছি উল্টো কথা। কি বলছেন সব জ্ঞানী, পন্ডিতরা? তাঁরা বলছেন, "অতিরিক্ত সরিষার তেল খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতির কারণ। ইউরোপের সব দেশ, USA, কানাডায় নিষিদ্ধ হয়েছে সর্ষের তেল। ভিডিওতে বলা হচ্ছে যেহেতু ক্যানাডা, ইউ এস এ নিষিদ্ধ করেছে তাই ওরাই একমাত্র জ্ঞানী পন্ডিত দেশ আর আমরা বালখিল্য ঋষির দেশ। তাই খাওয়া বন্ধ করো সর্ষের তেল।
তাহ'লে কোনটা ঠিক? কারা ঠিক? আগে যারা বলেছিল সর্ষের তেল শরীরের জন্য ভালো, উপকারী তাঁরা ঠিক নাকি যারা পরে বললো সর্ষের তেল শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর, তাঁরা ঠিক? এর কিছুদিন পরে সর্ষের তেল সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের দৌলতে তার সুনাম ফিরে পেলেও আবার তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ইউরোপের সব দেশ, USA, কানাডা। এখন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? কোথায় যাবো আমরা?
সাধারণ মানুষ বলছে, শালা বাঁচবোই তো গড় আয়ু অনুযায়ী ৬৪ বছর। জানি না এখন গড় আয়ু বেড়েছে নাকি আরও কমেছে। জানার ইচ্ছাও নেই। আর কলিযুগে মানুষের আয়ু নাকি নির্ধারিত হয়েছে ১০০বছর। কে নির্ধারণ করেছে জানি না, জানার ইচ্ছাও নেই। শুধু এটুকু বুঝি সব শালা আধা জ্ঞানী পোঙ্গা পন্ডিতের দল। জ্ঞানী পন্ডিতদের আজ এক কথা, কাল আর এক কথা শুনতে শুনতে চার অক্ষর মানুষ শালা puzzled হ'য়ে যাচ্ছে, সবাই আজ confused.
শালা চারপাশের ভেজাল মেশানো মারাত্মক বিষ খেতে খেতে সেটাই মানুষ হজম ক'রে নিয়ে গড় আয়ু ৬৪ বছর পার ক'রে দিচ্ছে এমনকি অনেকেই ৮০ বছর এমনকি ৯০ পার ক'রে দিব্যি বেঁচে আছে এই জ্ঞানী পন্ডিতদের দ্বারা কখনো স্বীকৃত ও ঘোষিত অমৃত আবার কখনো বা স্বীকৃত ও ঘোষিত বিষাক্ত তেল খেয়ে। আর অতীতে সর্ষের তেল খেয়ে টানটান মেদহীন চকচকে শরীরে, বিনা চশমায়, বিনা কানের মেশিনে গটগট ক'রে হেঁটে চলে ফিরে বেড়াতো ৯০ উত্তীর্ণ প্রায় সবাই।
এখন প্রশ্ন জাগে মনে তাহ'লে আর কি প্রয়োজন এত বিষ খোঁজার? তাঁর থেকে বরং খুঁজুন না সমস্ত খাদ্যদ্রব্য, প্রসাধনী দ্রব্য ইত্যাদি সবেতেই রমরম ক'রে চলা ভেজাল কারবারীদের। সেদিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই, নজর দেবার দরকার নেই। শুধু গোড়া কেটে আগায় জল ঢেলে গাছ বাঁচাবার মত বাজার জুড়ে কৃত্রিম বিষাক্ত নকল জিনিস প্রস্তুত কারবারীদের ছেড়ে বা তাদের বাঁচাবার জন্য প্রকৃতির দেওয়া দান অরিজিনাল জিনিসে কত বিষ লুকিয়ে আছে তাই খুঁজতেই ব্যস্ত বুদ্ধিমান মানুষ মানুষকে সাবধান করতে, সতর্ক করতে, বাঁচাতে!!!! তাদের কাছে প্রশ্ন, সর্ষের তেল কি উদ্ভিজ তেল নয়?
গোড়া কেটে আগায় বালতি বালতি জল ঢাললে গাছ বাঁচবে? ঠিক তেমনি ভেজাল তেলে, খাদ্যদ্রব্যে মারণ বিষ না খুঁজে প্রকৃতির দেওয়া জিনিসে কতটা বিষ আছে সেটা খুঁজলে ভেজাল বিষাক্ত তেলে, খাদ্যদ্রব্যের মারণ বিষে তৈরী খাবার খেয়ে মারণ রোগে আক্রান্ত মানুষ বাঁচবে????
কি বিচিত্র এই পৃথিবী! পথিবীর মানুষ!!
এই জন্যেই নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (D.L. Roy) লেখা 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকের বলেছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার, '
"সত্য সেলুকাশ কি বিচিত্র এই দেশ!!!!!"
( লেখা ৬ই এপ্রিল'২০২৫)।
