Powered By Blogger

Monday, October 10, 2022

অভিজ্ঞতাঃ ধিক্কার। জানাই ধিক্কার।

অনেকদিন ধ'রে ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলাম। একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হ'লো। দেখছিলাম আমার কিছু ফেসবুক বন্ধু এবং অন্য অনেক ফেসবুক পাঠক লেখা পছন্দ না হলেই কিম্বা স্বার্থে অকারণ ঘা লাগলেই (নিজের থেকে নিজের উপরে নিয়ে নেয় যা আমাকে অবাক করে) আমার লেখায় খোঁচা মেরে অপমানজনক মন্তব্য করে। মন্তব্যের উত্তরে যখন আমি মন্তব্য করি তখন আবার নিজের ঐ খোঁচা মারা কমেন্ট ডিলিট ক'রে দেয়; কেন? এরকম অনেক ফেসবুক বন্ধু বা গুরুভাইদের দেখছি অপমানজনক খোঁচা মেরে চিমটি কেটে পরে কমেন্ট ডিলিট ক'রে দেয় যাতে আম পাঠক বা আম সৎসঙ্গী বুঝতে না পারে। সাধারণ আম পাঠকের কথা ছেড়ে দিলাম কিন্তু সৎসঙ্গীর চরিত্র এমন হ'তে বলেছিল নাকি ঋত্বিকরা দীক্ষা দেবার সময়? আমি শুধু বলতে পারি, জ্ঞানের খোঁচা মারলে, আর ঐ আমার পোষ্ট করা বিষয় সম্পর্কে কিম্বা সৎসঙ্গ জগৎ সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান থাকলে বাপের বেটার মত মুখোমুখি হবেন, কমেন্টের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাবেন না। আর সৎসঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলি আলোচনার মুখোমুখি হ'য়ে বাপ কা বেটা সহিস কা ঘোড়ার মতন অন্তত নিজের পরিচয় দেবেন  আর তা না হ'লে কাউকে অপমানজনক খোঁচা দিয়ে চিমটি কেটে নিজেকে ঠাকুরের কাছে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। আমার বিচারের ফাঁকফোকর আছে সেই ফাঁকফোকর দিয়ে গলে বেরিয়ে যাবেন নিশ্চিত কিন্তু ঠাকুরের বিচার ভয়ঙ্কর, সাবধান। ঠাকুরের পরিষ্কার বলা আছে, "তুমি যা করছো বা ক'রে রেখেছো ভগবান তাই গ্রাহ্য করবেন আর সেগুলির ফলও পাবে ঠিক তেমনি।" খোঁচা মারুন, চিমটি কাটুন, অপমান করুন, গালাগালি দিন, সমালোচনা করুন কিন্তু গিদরের মত লেজ তুলে পালাবেন না। আম সৎসঙ্গী দেখুক, জানুক, বুঝুক কে বা কি বা কোনটা ঠিক বা বেঠিক। এমন সৎসঙ্গীদের ঠাকুর সোনার সৎসঙ্গী বলেছিলেন নাকি!? প্রায়ই এমন গুরুভাইদের মুখোমুখি হ'ই। হয় ফেসবুকে এসে ফাঁপা ভিত্তিহীন উপলব্ধিহীন অর্থহীন খাপছাড়া প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পার না হয়েই মন্তব্য করার অছিলায় জ্ঞানের পাঠশালা খুলে বসবে আর সেগুলি হজম করতে হবে। এটা সৎসঙ্গীদের মধ্যে ভয়ংকরভাবে প্রকট হ'য়ে উঠেছে। সবাই জ্ঞানের খাতা খুলে বসেছে। আর নাহয় অন্যকে, পরস্পর পরস্পরকে খোলাখুলি গালিগালাজ অপমান করছে। যুক্তিতে, জ্ঞানে, তত্ত্ব ও তথ্য মূলক আলোচনায় না পেরে, পোষ্ট করা বিষয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে না পেরে বিরাট পান্ডিত্যের ধ্বজা উড়িয়ে প্রতিপক্ষকে তার লেখার বিষয় সম্পর্কে না জেনে, আদ্যপান্ত না পড়ে, না বুঝেই মন্তব্য ক'রে দিচ্ছে। আবার কখনো বা রেগে উন্মাদ হ'য়ে  জন্ম বিকৃত আখ্যা দিয়ে দিচ্ছে আর পরমুহূর্তে ভালো মানুষের মত ভাব ক'রে ভন্ড, কপট ঈশ্বর প্রেমিক হ'য়ে পড়ছে। তারা খেয়ালই করছে না অদীক্ষিত মানুষেরা কি ভাবছে। সবটাই গিয়ে ঠাকুরের উপর পড়ছে এই বোধ কারও নেই। আরে ভুল হতেই পারে, আমারও ভুল হয়, প্রত্যেকের ভুল হয়। নানা চড়াই উৎরাই এলোমেলো ঘটনা ও নানারকম কালো সাদা ও রঙ্গীন কথার ভিড়ে মানুষের ভুল হতেই পারে। আমারও নানা সময়ে হয়েছিল। এবং যেটার ভুল বুঝতে পেরেছি সেটা স্বীকার ক'রে নিয়েছি, সংশোধন ক'রে নিয়েছি ও ক্ষমা চেয়েছি। উদাহরণ তুলে ধ'রে এখানেও বলতে পারি, শ্রীশ্রীঠাকুরকে নিয়ে সজনীকান্ত দাস তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা 'শনিবারের চিঠি' সাহিত্য পত্রিকায় এত কুৎসা ক'রে এত জনপ্রিয় হয়েছিলেন যে পরে যখন তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় সম্পাদনার কাজে যুক্ত হন তখন তাঁর নাম আর নামী  আনন্দবাজার পত্রিকার জনপ্রিয়তা একসঙ্গে জড়িয়ে গেলে মানুষ ভাবতো 'শনিবারের চিঠি' আনন্দবাজার পত্রিকার একটা অংশ। আমারও সেই ভুল হয়েছিল। সেই ভুলের জন্য আমি আগেও ক্ষমা চেয়েছি আজও এই লেখার মধ্যে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আনন্দবাজার পত্রিকার কাছে। এতটাই সজনীকান্ত দাস আর আনন্দবাঝার পত্রিকার জনপ্রিয়তা ও নাম একাত্ম হয়ে গিয়েছিল যে আজও অসতর্কভাবে 'শনিবারের চিঠি' প্রসঙ্গ এলেই সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার কথা অসাবধানবশত এসে যায় মুখে।  

 
যাই হ'ক সবাই এতবড় ঠাকুর প্রেমী এক একজন যে তারা খেয়াল করছে না ছেলে খারাপ কাজ করলে আম পাবলিক বাপ-মাকে টেনে আনে বাপ-মায়ের দোষ না থাকলেও। ঠিক তেমনি এইটাও যেন আম সৎসঙ্গীর মাথায় থাকে অদীক্ষিত মানুষ ওপেন মিডিয়ার এই সমস্ত ঠাকুর সম্পর্কিত পোষ্ট দেখছে, পড়ছে, জানছে আর কোমর ক'ষে নেবে পড়ছে ঠাকুরের কুৎসা করতে আর এই রোগ বাংলা ও বাঙালির মধ্যেই সর্বাধিক প্রকট এবং তা' বহু আগে থেকেই। বোদ্ধা বাংলার যোদ্ধা  বাঙ্গালী কোনোদিনই বাংলার রত্নদের, বিশ্বশ্রেষ্ঠ বাংলার সন্তানদের স্বীকৃতি দেয়নি। দিয়েছে কখনও? যখন বহির্বাংলা ও  বহির্বিশ্বের এলিট সমাজ সেই রত্নদের গলায় রত্নহার পড়িয়েছে তখন। তখন বাংলার বুকে পড়েছে শ্রদ্ধা, সম্মান প্রদর্শনের চুলকানির হুড়োহুড়ি। কে কত আগে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাবে তার শুরু হ'য়ে যায় প্রতিযোগিতা। রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ইত্যাদির ভিড়ে নাভিশ্বাস ওঠে সেই রত্নের।  

The greatest phenomenon of the world শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বেলায় এই বাংলার বুক থেকে উঠেছিল অকথ্য কুৎসার ঝড়। সেই ঝড়ে সামিল হয়েছিল বাংলার সব স্তরের কম বেশী কৃতী সন্তানেরা।  আর সেই সময় এই সরস কুৎসার নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলার সবচেয়ে অগ্রণী সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস তার একসময়ের সম্পাদনায় পরিচালিত 'শনিবারের চিঠি' সাহিত্য পত্রিকার মধ্যে দিয়ে। তখন 'শনিবারের চিঠি' ছিল আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের একসময়ের হট সাহিত্য পত্রিকা আর শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন তাঁর 'শনিবারের চিঠি' র হট আইটেম। প্রতি শনিবার বেরোতো সজনীকান্ত দাসের 'শনিবারের চিঠি' সাহিত্য পত্রিকায়। আর আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস তাঁর একসময়ের সম্পাদনায় পরিচালিত 'শনিবারের চিঠি' সাহিত্য পত্রিকায় ছদ্মনামে লেখা লেখক সেই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলের মহান জীবনকে বলাৎকার ক'রে ক'রে জনপ্রিয়তার চূড়ায় বসে ঠাকুরকে আয়ের উপকরণ বানিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করতো ও রোজগার করতো। বাংলার বুকে বাঙ্গালিরা রসিয়ে রসিয়ে চা বিস্কুট খেতে খেতে, চাটনির মত চাটতে চাটতে সেদিন বিশ্বের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বিস্ময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে নিয়ে খোরাক করতো যা আজও বাংলার বুকে পথে ঘাটে, মাঠে ময়দানে, পাড়ায় পাড়ায় ঐ খোরাকের ট্রাডিশান ব'য়ে নিয়ে চলেছে বিশ্বের সবচেয়ে মিষ্টি ভাষাভাষীর মানুষ মহান বাঙ্গালী। আর তাই দেখে অবাক হয়েছিল এবং এখনও হয় দেশবিদেশের অন্য ভাষাভাষীর মানুষ। তাই বোধহয় ঠাকুর বলেছিলেন আমার সৎসঙ্গের আন্দোলন বাংলার বাইরে থেকে উঠবে। আর তাই-ই যেন সত্য হ'য়ে উঠছে দিনে দিনে ক্রমশ অতি দ্রুতবেগে। হায়! বাঙ্গালী! ধিক! ধিক্কার জানাই তোমায়।

(লেখা ১০ই সেপ্টেম্বর'২০১৭)

কবিতাঃ ম্যায় হু না!

আহা! রূপ তো নয় রূপের সাগর!
স্বর্গ থেকে কে নেবে এলে তুমি ভাসিয়ে চরাচর!!
রূপ সাগরে মন ডুব দিতে চায় নেই যে ঘাট ফাঁকা
পাড়ে আমি থাকি বসে দেখি তোমায়
তুমি স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি একা!!!!!
চোখে তোমার যাদুর ছোঁয়া মিষ্টি বাঁকা ঠোঁটের হাসি!
মন বলে শুধু তোমার কাছে আসি!!
বরাভয় হাতে বলছো আমায়, মাভৈ! ম্যায় হুঁ না!
আমার কাছে এসো তুমি কিসের তোমার ভাবনা!?----প্রবি।

( লেখা১০ই সেপ্টেম্বর' ২০১৯)

Friday, October 7, 2022

কার অনুসারিঃ ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারী"?

গগনদার "শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী" বক্তব্যের উত্তরে আমার লেখা "ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারী" সম্পর্কে দু'এক কথা।

ঠাকুর সবার উপর কি উপর না, কে কার উপর আর কে কার নীচে এই কথা বলবার জন্য আমার এই লেখা নয়। চেষ্টা করেছি অপটু হাতে বিশ্লেষনমূলক গবেষনা সমৃদ্ধ ক'রে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিষয়টাকে তুলে ধরার। যদি সফল হ'ই, সবার ভালো লাগে তা' সম্ভব হয়েছে একমাত্র তাঁর ইচ্ছায় ও আশীর্বাদে। 

ঠাকুর সবার উপর এটা আন্ডারস্টূড; আর সেটা একমাত্র সৎসঙ্গীদের কাছেই, সকলের কাছে নয়। ঠাকুর যে সবার উপর, ব্যাপক অর্থে এর মূল এসেন্স পেতে গেলে বা মানবজাতীর কাছে এই কথার মূল এসেন্স তুলে ধরতে বা পৌঁছে দিতে গেলে গভীর সাধনালব্ধ পরম ভক্তের প্রয়োজন, প্রয়োজন গভীর ত্রুটিহীন নিখুঁত তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ আলোচনার এবং বাকসিদ্ধ প্রচারকের। 

আর এখানে আমি যে বিষয়টা লিখতে বা তুলে ধরতে চেয়েছি কিম্বা আমি আমার লেখার মধ্যে দিয়ে যা যা বলতে চেয়েছি তা বুঝতে গেলে আগে লেখাটা (ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারীঃ ১ ও ২ ) পুরো পড়ার অনুরোধ রইলো। পরবর্তী পদক্ষেপে মন্তব্য করা যাবে। সৎসঙ্গী বলেই সৎসঙ্গীর কাছে এই দাবীটা করলাম। যদিও লেখাটা দীর্ঘ আর পড়া সময়সাপেক্ষ্য। তবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে দীর্ঘ বা হ্রস্ব লেখা কোনও ম্যাটার করে না, তার কাছে ম্যাটার করে মহাসমুদ্রের গভীর বুকে ডুব দিয়ে শুক্তি খোঁজা ও তুলে আনা এবং সেই শুক্তির বুকে মুক্তো খুঁজে বের করা। তাই সকলের কাছে আমার অনুরোধ এবং যাদের পড়ার অসীম ধৈর্য ও জানার অনুসন্ধিৎসা আছে তাদের কাছে বিশেষভাবে আমার অনুরোধ আমি কোনও পক্ষ অবলম্বন ক'রে লেখাটা লিখিনি; আমি শুধু সত্যানুসন্ধানে অতীত ও বর্তমানে ঘটে চলা ঘটনাগুলির পোষ্টমর্টেম করেছি মাত্র। একজন সৎসঙ্গী হিসাবে পোষ্টমর্টেম ক'রে ঘটনার শরীরের গভীরে যা যা দেখতে পেয়েছি অর্থাৎ শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধা, ঘৃণা-ভালোবাসা, সত্য-মিথ্যা, কপটতা-অকপটতা, নিন্দা-প্রশংসা, কুৎসা-সুখ্যাতি, অপমান-সম্মান, সুখ-দুঃখ, পরিশ্রম-বিলাসিতা, দেওয়া-নেওয়া, নিষ্ঠা-ভন্ডামি, প্রেম-শত্রুতা সবগুলিকে চেষ্টা করেছি লেখায় যত্ন ক'রে তুলে আনতে। এই কাজটা একজন লেখক হিসাবে আমি গবেষণামূলক লেখার চেষ্টা করেছি মাত্র আমার সাধ্যমত বোধবুদ্ধি দিয়ে আর এই দীর্ঘ লেখার সম্পূর্ণ ক্রেডিট গগনদার, একমাত্র গগনদার; বিন্দুমাত্র আমার ক্রেডিট নেই। গগনদার পোষ্ট "শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী" আমাকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত এবং অনুপ্রাণিত করেছে এই লেখা লিখতে। গগনদার কাছে এই বিষয়ে লেখা লিখতে পেরে আমি ঋণী কিন্তু জানি না এই ঋণ শোধ করবো কিভাবে। লেখার বিষয়বস্তু গ্রহণ ও বর্জন পাঠকের ব্যক্তিগত; গ্রহণ করতেও পারেন এবং বর্জন করতে পারেন, সেই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ পাঠক সমাজের, সেখানে আমার কোনও হাত নেই, কোনও বক্তব্যও নেই। যার যার দেখা, বিশ্বাস, নির্ভরতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান, নিষ্ঠা ইত্যাদি তার তার নিজস্ব। জয়গুরু।

(লেখা ৭ই অক্টোবর'২০১৭)

প্রবন্ধঃ কার অনুসারিঃ ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারী। (২)

পরবর্তী ও শেষ অংশ।

এরপরে এলো ‘সৎসঙ্গ’ আকাশ জুড়ে আরও বড় দিগন্তব্যাপী কালো ঝড়। ঠাকুরের মহাপ্রয়ানের পর বাঁধভাঙ্গা জলের মত চক্রান্তের বি-শা-ল বি-শা-ল ঢেউ আছড়ে পড়লো ‘সৎসঙ্গ’ আকাশে, বড়দার বুকে।  ব্রহ্মা গঙ্গাকে মর্তে প্রবাহিত হ’তে বললে গঙ্গা রেগে গিয়ে যখন মর্তলোককে ভাসিয়ে দেবে ব’লে ঠিক করলো, ঠিক সেই সময় ভগীরথের আরাধনায় তুষ্ট হ’য়ে শিব শান্ত হ’য়ে গঙ্গাকে তাঁর জটাজালে আবদ্ধ করেন এবং পরম স্নেহে গঙ্গাকে মর্তভুমিতে বইয়ে দিয়ে মর্তলোককে রক্ষা করেন। ঠিক তেমনি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারীরা যখন ঠাকুরের অনুপস্থিতির সুযোগে ঠাকুরের প্রাণের ‘সৎসঙ্গ’-কে ভেঙে টুকরো টুকরো ক’রে দেবার নোংরা খেলায় মেতে উঠলো ইষ্টপ্রাণতার দোহাই দিয়ে তখন সৎসঙ্গীদের আরাধনায় ঠাকুরের অন্তর কেঁপে উঠলো আর সেই মুহূর্তে তাঁর কথামত রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে জ্যান্ত হ’য়ে উঠলেন তিনি শ্রীশ্রীবড়দার মধ্যে। আর বড়দা শিবের মত শান্ত ধীর স্থির হয়ে ষড়যন্ত্রকে তাঁর বলিষ্ঠ হাতে মোকাবিলা ক’রে পরম যত্নে ও ভালোবাসায় ঠাকুরের প্রাণের অধিক প্রিয় ‘সৎসঙ্গ’-কে বিশ্ববাসীর মুক্তির জন্য বিশ্বভুমিতে ভাসিয়ে দিলেন আর তার সুবাস পৌঁছে যেতে লাগলো বিশ্বের ঘরে ঘরে। মূল কেন্দ্র বিরোধী বিরুদ্ধবাদী চক্রান্তকারীদের ঘৃণ্য নানা চক্রান্ত, সমালোচনা, নিন্দা, কুৎসা, অপমান ইত্যাদি এতটুকু বড়দাকে তাঁর লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি। পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা ও সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা, ইষ্টভৃতির মন্ত্র পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে অকারণ বিতর্ক তৈরি ক’রে ঠাকুরের পরম ভক্ত সেজে বড়দার প্রতিপক্ষ হ’য়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে মরীয়া হ’য়ে উঠলো কতিপয় বৃত্তি প্রবৃত্তিতে ডুবে থাকা ভন্ড, কপট ভক্তের দল। সেই সময়ের প্রথম সারির অন্যতম প্রধান পার্ষদদের নানা চক্রান্তে অস্থির হ’য়ে উঠলো দুই দেশের ঠাকুরের পুণ্যভূমি। ঠাকুর পরিবারের অনুপস্থিতি ও বড়দার মত কঠিন ও কোমল এবং আপোষরফাহীন ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতির অভাবে চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশের মাটিতে সফল হ’লেও ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দেওঘরের মাটিতে বড়দার প্রবল ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতিতে ঝাড়ে-মূলে মূল কেন্দ্র থেকে উৎখাত হ’য়ে যায়। যার রেশ এখনও ব’য়ে নিয়ে চলেছে ধান্দাবাজ রক্তবীজের দল।  

আজকের দেশ তথা বিশ্ব জুড়ে ঠাকুর পরবর্তী ‘সৎসঙ্গ’-এর যে অকল্পনীয় প্রচার ও প্রসার, এর পিছনে মূল কেন্দ্র ও দেশ বিদেশের দিকে দিকে বহু ইষ্টপ্রাণ জীবন উৎসর্গীকৃত সৎসঙ্গীর অবদানের মূল্যায়ন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে ইষ্টস্বার্থরক্ষা ও ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীশ্রীবড়দার বিরুদ্ধে ক্রমাগত ছেদহীন কুৎসা, নিন্দা, অপমান, অপবাদ, বেইমানী, নেমকহারামি, অকৃতজ্ঞতা, চরিত্রহনন ইত্যাদি সত্ত্বেও তাঁর নিরলস, ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন, নিখুঁত, নির্ভুল, আপোষরফাহীন নেতৃত্ব প্রমাণ করে ঠাকুর কেন এবার তাঁর প্রধান ভক্তকে সন্তান রূপে নিয়ে এসেছিলেন! কেন ঠাকুর শ্রীশ্রীবড়দাকে তাঁর কৃষ্টিজাত ও ঔরসজাত সন্তান ক’রে নিয়ে এসেছিলেন! বিরোধীরা মিষ্টি মিষ্টি ক’রে হাসি মুখে ঠাকুর প্রেমী সেজে যখন ইষ্টকথা বলে তখন দিনের আলোর মত ঝলমল ক’রে চোখেমুখে ফুটে ওঠে, ‘শয়তানের হাসি ভগবানের চেয়েও মিষ্টি”! এবং ঠাকুরের বিশেষ বিশেষ বাণীগুলি যেগুলি নিজের বৃত্তি প্রবৃত্তির সঙ্গে খাপ খায় সেগুলিকে বেছে বেছে হাতিয়ার ক’রে বাণীগুলির অন্তর্নিহিত অর্থকে ভুল ব্যাখ্যা ক’রে সাধারণ সীমাহীন ভাঙাচোরা ভক্তকুলকে বোকা বানিয়ে যখন সেই অবৈধ কেন্দ্রের প্রধান হ’য়ে  মৌরসি পাট্টা জমিয়ে বসে এবং ইষ্টকে আয়ের উপকরণ বানিয়ে চুটিয়ে অর্থ ,মান, যশ ইত্যাদি কামায়, কিন্তু শেষের সে দিন যে ভয়ঙ্কর এই সত্যকে তারা মানতে চায় না, উপেক্ষা করে তখন স্পষ্ট বোঝা যায় কেন ঠাকুর এবার বলেছিলেন,”যা দিয়ে গেলাম, আগামী ১০ হাজার বছরের মধ্যে কিছু লাগবে না”। কি দিয়ে গেলেন ঠাকুর যার জন্য আগামী ১০ হাজার বছর কিছু লাগবে না? ঠাকুরের অন্তহীন সাহিত্য ভান্ডার এবং আচার্য পরম্পরা! যার মধ্যে দিয়ে তিনি স্বয়ং তাঁর বাণীর মধ্যে বলা রেতঃ শরীরে লীলা করবেন। ঠাকুরের অন্তকালের অব্যবহিত পরেই “হারে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে দে রে------গন্ডার মেরে ভান্ডার লুটি মনের আনন্দে রে” ব’লেই ছুপা রুস্তমেরা লম্ফ দিয়ে ঝম্প মেরে বেরিয়ে এলো খোলা ময়দানে যাদের উত্তরসূরিরা এখনও “ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন” দেখার মত বালখিল্য স্বপ্ন দেখে ইষ্টপ্রতিষ্ঠার, ইষ্টস্বার্থরক্ষা ও ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার। আর, তখন দিনের আলোর মত পরিষ্কার হ’য়ে যায় কেন ঠাকুর এবার বলেছিলেন, 

“ইষ্ট গুরু পুরুষোত্তম,

প্রতীক, গুরু বংশধর 

রেতঃ শরীরে সুপ্ত থেকে 

জ্যান্ত তিনি নিরন্তর”।  

এই সমস্ত সাপের খোলস ছাড়ার মত মুখের মুখোশ খুলে যাওয়া পরম শক্ত  ভক্তরা ঠাকুর মানে, কিন্তু ঠাকুর পরিবার ও ঠাকুর পরিবারের বড়মা ও বড়দা, অশোকদাদা, বাবাইদাদা, অবিনবাবু কাউকে মানে না। এইসমস্ত ভক্তদের দেখে প্রমাণ হয় যে কেন ঠাকুর কেষ্টদাকে বলেছিলেন, “কেষ্টদা, মন্দিরের আশেপাশে কুৎসিত লোকের আনাগোনা বেশী, সাবধান থেকো তা থেকে”!

এই বাণী কতটা যে জীবন্ত তা’ আজ প্রমাণিত। প্রমাণিত ঠাকুরের জীবিত কালে, অন্তকাল সময়ে, ঠাকুর পরবর্তী সময়ে এবং আজও বিভিন্ন কেন্দ্র মন্দিরে।      

তাই যখন দেখি আজও সেই ঠাকুরকে আয়ের উপকরণ বানিয়ে কামিয়ে নেওয়া, বাগিয়ে নেওয়ার ট্র্যাডিশান সমানে চলেছে বিজ্ঞাপিত ইষ্টপ্রাণ ভক্তদের মধ্যে তখন ভাবি শ্রীশ্রীবড়দা যদি না থাকতো তাহ’লে এই বিশাল সৎসঙ্গ পরিবারের কি হ’ত! ঠাকুর যদি শ্রীশ্রীবড়দাকে নিজের আত্মজ ক’রে প্রথম সন্তান রূপে না আনতেন তাহ’লে কি হ’ত ভাবলেই পরম শ্রদ্ধায়, নির্ভরতায়, নিশ্চিন্ত মানসিকতায় অজান্তে মাথা নত হ’য়ে আসে তাঁর শ্রীরাঙ্গা চরণে এই ভেবে এই না হ’লে ‘পুরুষোত্তম’! এই না হ’লে জীবন্ত ঈশ্বর! আমাদের মানবজাতির ভাবনা চিন্তার ডায়মেনশান যেখানে শেষ সেখান থেকে তাঁর শুরু মাত্র। তাই তিনি নিজের লাঠি নিজেই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কারও ওপর ভর দিয়ে বা নির্ভর ক’রে তিনি চলবেন না ব’লে। এইবারের তাঁর আসা যুগ পরিবর্তনের এক ট্রাঞ্জিশানাল পিরিয়ডে। তাই তিনি আঁটঘাঁট বেধেই এসেছিলেন। তিনি সব জানতেন কে, কখন, কোথা দিয়ে, কোন সময়ে পিছন থেকে ছুরি মারবে আর সেই ছুরি মারাকে কিভাবে, কাকে দিয়ে, কখন, কোন মুহূর্তে প্রতিহত করতে হবে। তিনি নিজে যেমন মানুষের গোল বা লক্ষ্য বা গন্তব্য স্থল ঠিক তেমনি সেই গোলে বা লক্ষ্যে বা গন্তব্য স্থলে পৌঁছনোর তিনিই সেই ব্রিজ হ’য়ে বিরাজ করেন; যে ব্রিজের উপর দিয়ে মানুষকে গন্তব্য স্থলে পৌঁছতে হয়। তিনি যখন মানুষের  রূপ ধ’রে মানুষের মাঝে নেবে আসেন তখন তিনিই তাঁর রুপকে খন্ডিত ক’রে বিশেষ ভাবে পরম শ্রেষ্ঠ ভক্ত রূপে সঙ্গে ক’রে নাবিয়ে নিয়ে আসেন নিখুঁত, নির্ভূল, নির্বিগ্নে, নিষ্কণ্টক ভাবে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য, তাঁর কাজকে, মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, পূর্ণ রূপ দেবার জন্য। এখানে কারও মাতব্বরি চলবে না সে যেই হ’ক আর যতবড় ব্যক্তিত্বই হ’ক। এমনিভাবেই তিনি নিজের কাজের জন্যই শ্রীশ্রীবড়দাকে নিজের ঔরসজাত ও কৃষ্টিজাত সন্তান ক’রে সঙ্গে ক’রে নিয়ে এসেছিলেন এইবার।

তাই, যদি আমাদের ঠাকুরের মনের মত হ’য়ে উঠতে হয়, ঠাকুরের ইচ্ছা পূরণ করতে হয়, ঠাকুরের পথে চলতে হয়, ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণ করতে হয় তাহ’লে ঠাকুরকে ভালবাসতে হবে ঠাকুরকে জীবনে প্রথম ও প্রধান ক’রে, ঠাকুরের কাছে সারেন্ডার করতে হবে নিজেকে। আর ঠাকুরকে ভালোবাসবো কিভাবে, ঠাকুরের কাছে সারেন্ডার করবো নিজেকে কিভাবে, ঠাকুরের মিশনকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবো, কিভাবেই বা ঠাকুরের স্বপ্ন কে পূরণ করার পথে শত সহস্র বাধার পাহারকে ডিঙ্গিয়ে, লজ্জা-ঘৃণা-ভয়কে উপেক্ষা ক’রে, নিন্দা-কুৎসা-অপমান-অপবাদকে আমল না দিয়ে, দুঃখ-কষ্ট-জ্বালা-যন্ত্রণাকে নীরবে নিভৃতে স’য়ে নিয়ে ইষ্টের স্বার্থকে রক্ষা করা ও তাকে প্রতিষ্ঠা করার পথে জীবনকে উৎসর্গ করবো তা’ শিখে নিতে হবে এই সমস্ত কিছুকে যিনি পেরিয়ে এসেছেন নিজের জীবনকে ঠাকুরের জীবনবৃদ্ধির যজ্ঞে উৎসর্গ করার মধ্যে দিয়ে তাঁর কাছে, তাঁকে অনুসরণ করার মধ্যে দিয়ে। তিনি হ’লেন ঠাকুরের আত্মজ, পরম আদরের বড়খোকা ও আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় চোখের মণি শ্রীশ্রীবড়দা। শ্রীশ্রীবড়দাকে যে ভালোবাসে না সে শ্রীশ্রীঠাকুরকে ভালবাসতে পারে না, পারে নি। কারণ ইতিহাস তার সাক্ষী। শ্রীশ্রীরামচন্দ্র দীর্ঘ বনবাস শেষে যখন অযোধ্যায় ফিরে এসেছেন তখন তিনি রাজ্যবাসীর সঙ্গে তাঁর সঙ্গে যারা এতদিন দুঃখ-কষ্টের সাথী ছিলেন তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। সবাইকে একে একে পরিচয় করানোর সঙ্গে সঙ্গে যখন শ্রীশ্রীরামচন্দ্র হনূমানের সামনে এসে দাঁড়ালেন তখন হনূমানের দিকে তাকিয়ে রামচন্দ্র আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি হনূমানকে জড়িয়ে ধ’রে অঝোর ধারায় শুধু কাঁদতে লাগলেন। তাঁর পর সবার উদ্দেশ্যে অশ্রুসজল কন্ঠে হনূমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, যে হনূমানকে ভালোবাসে না বা ভালোবাসবে না সে আমাকেও ভালোবাসে না। প্রভু রামচন্দ্র গভীর অন্তর্নিহিত অর্থ সমৃদ্ধ বক্তব্যের সারবস্তুর যা বোঝাবার একটা ছোট্ট কথায় বুঝিয়ে দিলেন। বোঝে সে, প্রাণ বোঝে যার। ঠিক তেমনি শ্রীশ্রীবড়দাকে বুঝতে হ’লে, শ্রীশ্রীবড়দার প্রতি ঠাকুরের সেন্টিমেন্ট বুঝতে হ’লে, ঠাকুরের হৃদয়ের কোন জায়গায় বড়দার স্থান তা’ বুঝতে হ’লে ঠাকুরের সঙ্গে বড়দার প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্তের সম্পর্কের ইতিহাস জানতে হবে। জানতে হবে, কিসে ঠাকুরের হয় আনন্দ, কিসে আসে ঠাকুরের তৃপ্তি, কিসে ঠাকুরের জাগে ছন্দ, কিসে পায়  ঠাকুর স্বস্তি, এই পুরো ব্যাপারটা; আর এই পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারতেন একমাত্র এ যুগের পরম ভক্ত হনূমানরূপী শ্রীশ্রীবড়দা। তাই প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দকে বাদ দিয়ে যেমন ঠাকুর রামকৃষ্ণকে ভাবা যায় না, যায় না মহাবীর হনুমানকে বাদ দিয়ে পুরুষোত্তম শ্রীরামকে এবং অর্জুন ছাড়া শ্রীকৃষ্ণ যেমন অসম্পূর্ণ ঠিক তেমনি শ্রীশ্রীবড়দা ছাড়া ঠাকুরের পাশে আর কাউকে মানায় না। পরম ভক্ত মহাত্মা যিনি তিনি পরমাত্মায় লীন হ’য়ে যায় অবশেষে। ভক্ত ভগবানে মার্জ ক’রে দিয়ে ভগবানে বিলীন হ’য়ে যায়।

তাই এই দীর্ঘ লেখার শেষে একটা কথায় বলতে পারি, গগনদা যে কথা বলতে চেয়েছেন সেই কথার অর্থ স্বরূপ এটাই বলা যায় শ্রীশ্রীবড়দাকে অনুসরণ না করলে ঠাকুরের স্বার্থ রক্ষা ও স্বার্থপ্রতিষ্ঠার পথে যে হাজার বাধা, পথের বাঁকে বাঁকে শয়তান কিলবিসের মারাত্মক ছোবল, বৃত্তি প্রবৃত্তির রকমারি হাতছানি ইত্যাদিকে চিনতেই পারবো না, জানতে বা বুঝতেই পারবো না এবং তাকে মোকাবিলা করার কৌশল শিখতে পারবো না। ঠাকুর প্রতিষ্ঠার পথে, কেন্দ্র ও মন্দিরগুলিতে ঠাকুরকে জীবন্ত ক’রে রাখতে সংঘ আচার্য শ্রীশ্রীবড়দার আশীর্বাদ ও অভিজ্ঞতা ছাড়া এক পাও এগোতে পারবো না, সফল হ’তে পারবো না। যারা শ্রীশ্রীবড়দার জীবনকে অনুসরণ ক’রে ঠাকুর প্রতিষ্ঠা  ও ঠাকুরের স্বার্থপ্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলে তারা সত্যি সত্যিই আসল সৎসঙ্গী।                                   

শেষ।

(লেখা ৭ই অক্টোবর' ২০১৭)

প্রবন্ধঃ কার অনুসারিঃ ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারী ( ১ )

গগনদার পোষ্টটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটা বিতর্ক দানা বাঁধায় স্বাভাবিকভাবেই নজরটা গিয়ে পড়লো পোষ্টটাতে। দেখলাম এবং বুঝলাম বিতর্কের বিষয় একটা শব্দ চয়নকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। শব্দটা ‘অনুসারী’। বিষয়ঃ “শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী”। অনুসারী শব্দের মানে যদি করি তাহ’লে যেটা পায় তাহ’লো অনুসরণকারী, অনুযায়ী। তাহ’লে এখানে বিতর্কটা কোন জায়গায় ও কি নিয়ে? বিতর্কঃ আমরা ঠাকুর অনুসারী না বড়দা অনুসারী?  যদি বলা হয় আমরা ঠাকুর অনুসারী। তাহ’লে ভুল বা ঠিকটা কোথায়? ভুলের প্রশ্নতো এখানে আসেই না, অর্থহীন। আমরা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মন্ত্রশিষ্য, অনুগামী ও ভক্ত। ঠাকুরকেই আমরা কায়মনোবাক্যে অনুসরণ ক’রে চলি। অর্থাৎ দেহে, মনে ও কথায় অর্থাৎ সর্বোতভাবে ঠাকুরকেই শয়নে, স্বপনে ও জাগরণে মেনে চলার অর্থই হ’লো তাঁর অনুসারী হওয়া। এই অর্থে ঠাকুরের মন্ত্রশিষ্য মাত্রই অনুকূলচন্দ্রের অনুসারী তা’ সে ঠাকুর সৃষ্ট মূল কেন্দ্র ‘সৎসঙ্গ দেওঘর’-এর সঙ্গে যুক্ত শিষ্যবর্গ হ’ক বা অন্যান্য ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্ট ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শিষ্যবর্গই হ’ক। আর এখানে বলে রাখা ভালো বৈধ শিষ্য বা অবৈধ শিষ্য এই বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা আলোচনার বিষয়। এখানে এই আলোচনার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন প্রসঙ্গবহির্ভূত। এই বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে দীক্ষিত-অদীক্ষিত আম জনতার কাছে, তামাম দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে এককথায় ব্যাপক অর্থে সমস্ত শিষ্য মাত্রই ‘ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অনুসারী ও সৎসঙ্গী কারণ বহির্বিশ্ব সৎসঙ্গের আভ্যন্তরীণ বিষয় সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন। 

কিন্তু গগনদা যেটা বলতে চেয়েছেন সেই বক্তব্য বিষয়কে যদি বর্তমান জটিল সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটু গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করা যায় তাহ’লে কি দেখা যাবে?    

গগনদা বলেছেন, শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী। প্রথম কথা হচ্ছে ‘বড়দা অনুসারী’ বলতে কি বোঝানো হয়েছে? ‘বড়দা অনুসারী’ মানে বড়দা অনুসরণকারী। প্রশ্ন হচ্ছে, বড়দাকে অনুসরণ করবো কেন? আমার ইষ্ট বা মঙ্গল বা আদর্শ কে? ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যদি আমার ইষ্ট বা মঙ্গল বা জীবন্ত আদর্শ হয় তাহ’লে বড়দাকে অনুসরণ করার কথা আসে কোথা থেকে? আমার গোল বা লক্ষ্য কে? ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র না-কি বড়দা? ঠাকুর যদি আমার গোল হয় তাহ’লে ঠাকুরকে অনুসরণ ক’রে চলাই আমার জীবনের এক ও একমাত্র কর্ম। আমরা তো বড়দাকে অনুসরণ করার জন্য ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিনি, সৎসঙ্গের পতাকার তলায় আসিনি। এসেছি কি? তাহ’লে গগনদার এই কথার অর্থ কি? 

উপরিউক্ত কথাকে যদি মেনে নিই তাহ’লে গগনদার পোষ্টের বিরোধিতা ক’রে সুকৃতি সুন্দরদার বলা “আমরা সবাই ঠাকুর অনুসারী কেউই বড়দা অনুসারী ন’ই” কথাটা ঠিক। তাহ’লে গগনদার কথাটা কি ভুল বা বেঠিক? আসুন, দেখা যাক গগনদার বিশ্বাস “শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী” কথাটার যদি পোষ্টমর্টেম করা যায় তাহ’লে কি পাওয়া যায়। গগনদার বক্তব্যকে যদি তত্ত্ব ও তথ্য সহযোগে সংশ্লেষণী ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সমুদ্রমন্থনের মত মন্থন করা যায় তাহ’লে সমুদ্রমন্থনে অমৃতের ভান্ড উঠে আসার মত ঠাকুরের ১৯৪৬ সালে দেশত্যাগের পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলী ও ১৯৬৯ সালে দেহত্যাগের পরবর্তী সময়ে সৎসঙ্গ কেন্দ্রের উপর ও শ্রীশ্রীবড়দার উপর ঘটে যাওয়া দুঃখ ও অপমানজনক ঘটনাবলি মন্থনে গগনদার বক্তব্যের গভীরে অন্তঃসলিলার মত শ্রীশ্রীবড়দার জীবনের যে চলনামৃত বয়ে যাচ্ছে সেই অমৃতের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে যা’ কিনা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে যে সত্যিই কি শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারী হওয়া উচিত কি উচিত নয়।  

১৯৪৭ সালের দেশভাগের যে পটভূমি ব্রিটিশের চক্রান্তের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল ভারতের মাটিতে তার আঁচ দেশভাগের অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ঠাকুর আর তার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় দেশভাগকে রুখতে। অনেক আগে থেকেই তিনি তাঁর অতীন্দ্রিয় শক্তির বলে দেশভাগের চক্রান্ত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয়ংকর আঁচ পেয়েছিলেন এবং সেইমত তিনি চেষ্টা করেছিলেন দেশভাগ রুখতে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ফর্মুলাও তিনি দিয়েছিলেন তৎকালীন দেশবরেণ্য নেতৃবর্গকে কিন্তু কে কার কথা শোনে। সবাই সবার ধান্দায় মত্ত তখন। দেশভাগের চক্রান্তের ডামাডোলের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপে দিন দিন ঠাকুরের শরীর খারাপ হ’তে থাকে; ফলস্বরুপ হাওয়া বদলের জন্য তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন আশ্রমের বিশিষ্ট জনেরা।        

এই সময় থেকেই অর্থাৎ দেশভাগের চক্রান্ত  ও ঠাকুরের মানসিক যন্ত্রণা কিছু কপট ধান্দাবাজ সৎসঙ্গীকে উৎসাহিত ক’রে তোলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। তারা বুঝতে পারে ঠাকুর শরীর খারাপের কারণে হাওয়া বদলের জন্য সপরিবারে দেশত্যাগ করলে এই শুনশান ঠাকুর পরিবারহীন বাংলার মাটিতে এই সুযোগে ঠাকুরকে আয়ের উপকরণ বানিয়ে ঠাকুরের নামে বেকুব আম সৎসঙ্গীকে বোকা বানিয়ে ইষ্টের সুড়সুড়ি দিয়ে মৌরসি পাট্টা জমিয়ে বসা যাবে। আর শুরুও হ’য়ে যায় সেই ‘মারি তো গন্ডার, লুটি তো ভান্ডার’ পরিকল্পনা। সব ভক্তরুপী শকুনরা অপেক্ষা করতে থাকে চেটেপুটে খাওয়ার কখন সেই মোক্ষম দিনটা আসবে। এইজন্য একদিকে শুরু হ’য়ে যায় তলে তলে নানারকম ষড়যন্ত্র। ঘুঁটি সাজানো শুরু হ’য়ে যায় পরিকল্পিতভাবে। আর অন্যদিকে হাওয়া বদলের কারণে দেওঘরের বুকে স্থানান্তরিত সৎসঙ্গের পরবর্তী কার্যধারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলতে থাকে ঠাকুরের নির্দেশে বড়দার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে। তখনই দূরদৃষ্টির অধিকারী ধান্দাবাজ সৎসঙ্গীরা শ্রীশ্রীবড়দার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের সময়কালে বুঝতে পেরে যায় ভয়ংকর কঠিন এক বাধার সম্মুখীন হ’তে হবে ষড়যন্ত্রকারীদের। আর সে ভয়ঙ্কর বাধার পাহাড় হ’য়ে সামনে দাঁড়াবে ঠাকুরের আত্মজ ও আদরের প্রথম ও জেষ্ঠ্য সন্তান এ যুগের হনূমান শ্রীশ্রীবড়দা। তাই ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল ‘মৃদুনি কুসুমাদপি, বজ্রাদপি কঠোরানি’ অর্থাৎ একদিকে ফুলের মত নরম, সুন্দর অন্যদিকে বজ্রের চেয়েও কঠিন এ হেন চরিত্রের অধিকারী শ্রীশ্রীবড়দার সঙ্গে আত্মস্বার্থপ্রতিষ্ঠাকারীরা সুবিধা করতে পারবে না জেনেই পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রকারীদের শুরু হ’য়ে গেল ধীরে ধীরে সুকৌশলে শ্রীশ্রীবড়দা বিরোধী অভিযান। এই অভিযান শুধু বাংলাদেশের বুকেই সীমাবদ্ধ ছিল না খোদ দেওঘরের বুকেও ধীরে ধীরে ডালপালা বিস্তার লাভ করছিল এবং ছড়িয়ে পড়ছিল এ পার বাংলা তথা দেশ বিদেশের কতিপয় জায়গায়। 

১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল দেওঘরের বুকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হ’য়ে চলেছিল নতুন ক’রে আশ্রম  গড়ে তোলার রাজসূয় যজ্ঞ। সঙ্গে চলছিল ঠাকুরের হাজার হাজার বাণীর ঠাকুরের জীবদ্দশায় বই আকারে প্রকাশের অমানুষিক কাজ। ছিল ক্রমবর্ধমান ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আসার চাপ। চলছিল দেশ বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আশ্রমে ঠাকুর দর্শনে আসা-যাওয়া। আরও কত কত কাজ হ’য়ে চলেছিল দেওঘর আশ্রমের বুকে। ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশে বড়দার তত্ত্বাবধানে ও নেতৃত্বে হ’য়ে চলেছিল একে একে ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণ!!!! ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৯ এই ২৩ বছর ঠাকুরের কুকুর হ’য়ে ঠাকুরের পায়ে পায়ে লেগে থেকে সৎসঙ্গ জগতের সকলের চোখের মণি ঘোর কলি যুগের হনূমান শ্রীশ্রীবড়দা মগ্ন হ’য়ে ছিলেন বাধার পাহাড়কে বলিষ্ট দু’হাতে সরিয়ে দিয়ে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে অটল, অটুট, অচ্যুত, অস্খলিত থাকার ভীষ্মের মত ভীষণ প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়ে ঠাকুরের ইচ্ছা, ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এক কঠিন ব্রত, অবদমিত সংকল্প নিয়ে অটুট, অচ্যুত ও অস্খলিত মনোভাবে!     

এমনিভাবে যখন এগিয়ে চলেছিল সৎসঙ্গের আন্দোলন ‘নূতন বৃন্দাবন’ দেওঘরের বুকে নানা বাধা-বিপত্তি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বিপদ-আপদ ইত্যাদি অজস্র প্রতিকূল প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবিলা করতে করতে সেই সময় একদিন ঠাকুর বেঁচে থাকাকালীন ঠাকুরের সামনে দিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম ক’রে একদল কপট ধান্দাবাজ অসৎ ভক্ত ঠাকুরের ফটো মাথায় নিয়ে ‘বন্দে পুরুষোত্তমম’ ধ্বনি দিয়ে লম্ফ দিয়ে ঝম্প মেরে বেরিয়ে গিয়ে প্রমাণ করেছিল ইষ্টের জীবিত অবস্থায় ইষ্টস্বার্থরক্ষা ও ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার নামে আত্মস্বার্থরক্ষা ও আত্মস্বার্থপ্রতিষ্ঠার মিশন কি চতুরতায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় অর্থনীতিতে কালো টাকা ও সাদা টাকার সমান্তরালভাবে অন্তর্ভুক্তির মত! আর এটা সম্ভব হয় কখন? যখন ঠাকুরের বাকী অনুগামীরা ঠাকুর সম্পর্কে থাকে উদাসীন, অজ্ঞ, বেকুব, ভীতু ও দুর্বল এবং হয় অবিশ্বাসী, ফাঁকিবাজ, কপট, ক্যালাস, অতিবোদ্ধা ও অতিচালাক। সেই সময়টা চলছিল বড়দা বিরোধিতার চরম যুগ। ঠাকুরের কাছে চলেছিল ভন্ড, কপট কেষ্ট দাসের মত অর্থ, মান, যশের বদ্ধ পাগল, ভন্ড, কপট ভক্তদের শ্রীশ্রীবড়দার নামে নানা মিথ্যে অভিযোগ। ঠাকুরের মুখ চেয়ে ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণে নিবেদিত প্রাণ হ’য়ে অসীম ধৈর্য ও সহ্য শক্তি বুকে নিয়ে সমস্ত কিছু মুখ বুঝে সহ্য করেছিলেন শেষ জীবনে ঠাকুরকে স্বস্তি, শান্তি দেওয়ার একমুখী বাসনায় ঠাকুরের আদরের বড়খোকা, আমাদের সৎসঙ্গ জগতের অতি প্রিয়, চোখের মণি এ যুগের অর্জুন শ্রীশ্রীবড়দা। দ্বাপর যুগে যেমন শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত অর্জুন লক্ষ্যে স্থির থেকে অটল অটুটভাবে প্রতিপক্ষকে ছারখার ক’রে দিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের আদেশকে মাথায় নিয়ে ঠিক তেমনি এ যুগে শ্রীশ্রীবড়দা রূপে অর্জুন পুনরায় আত্মস্বার্থপ্রতিষ্ঠাকারীদের ষড়যন্ত্রের নিবিড় জালকে ছিন্নভিন্ন ক’রে ঠাকুরের ‘আশ্রয় দাও প্রশ্রয় দিও না’ আদেশকে মাথায় নিয়ে ঠাকুরের মিশনের পতাকাকে উর্ধে তুলে ধ’রে সারা বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। দেহ ত্যাগের আগে ঠাকুর দেখে গেছিলেন, জেনে গেছিলেন, বুঝে গেছিলেন যে এই বিশাল সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসাবে তীব্র প্রতিকূল পরিস্থিতির দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা শয়তানী ঝড়, তুফানকে উপেক্ষা ক’রে অনায়াস ভঙ্গীতে অবহেলায় অবলীলায় ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠা ও ইষ্টস্বার্থরক্ষা বিরোধী শত্রু  শক্তির মোকাবিলা ক’রে একটা স্তম্ভের মত নিজের শক্তিতে অটল হ’য়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তাঁর বড় আদরের বড়খোকা, ‘সৎসঙ্গ’ জগতের সবার অতি প্রিয় শ্রীশ্রীবড়দা। ঠাকুর সেদিন শ্রীশ্রীবড়দার পাহাড়ের মত টানটান হ’য়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা চখা আঁখি আর অবয়ব দেখে এবং বজ্রের মত কঠিন ও কুসুমের মত কোমল হৃদয় ও মন দেখে শান্তিতে চিরনিদ্রায় চলে গেছিলেন এই ভেবে যে তাঁর অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট, অনেক যন্ত্রণা, নিন্দা, অপবাদ, অপমান, বদনাম, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা পারিপার্শ্বিক সহ বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার বড় সাধের বিশ্বজুড়ে এক ও একমাত্র পীঠস্থান বিশাল ‘সৎসঙ্গ’-কে রক্ষা করা ও আরো থেকে আরোতর ক’রে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার উপযুক্ত বিশাল বলিষ্ঠ শক্তিশালী কাঁধ তিনি রেখে যাচ্ছেন দেওঘরের পুণ্যভূমিতে; রেখে যাচ্ছেন তাঁর মিশনকে সামনে রেখে, তাঁর রেখে যাওয়া আগামী মানব সভ্যতা গঠনের নীল নকশাকে মাথায় নিয়ে আগামী পৃথিবী রচনার সূচনার কারিগরকে। ঠাকুর একবার তাঁর প্রধান পার্ষদদের সকলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আচ্ছা এই যে আমি হাজার হাজার না-কি বাণী দিয়েছি, এই সব কার জন্য?” তখন সেই সময়ের প্রধান পার্ষদ তথা ভক্তমন্ডলীবর্গ বলেছিলেন, “এই সমস্ত দেশবাসীর জন্য, বিশ্ববাসীর জন্য, মানবজাতির জন্য।“ ঠাকুর কিন্তু এই উত্তরে খুশী হননি। তখন তিনি পরমপুজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দাকে দেখে ডেকে বলেছিলেন, “হ্যাঁরে বড়খোকা, এরা কি কয়?” বড়দা বললেন, “কি বাবা?” ঠাকুর বললেন, এই যে আমি এত হাজার হাজার না-কি বাণী দিয়েছি এই সমস্ত কার জন্য?” তখন বড়দা হাতজোড় ক’রে হাঁটুগেড়ে বসে বলেছিলেন, “এই সমস্ত বাণী আমার জীবনের জন্য।“ এই কথায় ঠাকুর সেদিন শিশুর মত উল্লসিত হ’য়ে সবাইকে বলে উঠেছিলেন, “দেখেন, দেখেন বড়খোকা কি কয়?, বড় খোকা কি কয়?” সেদিন ঠাকুর তাঁর আদরের বড়খোকা তথা সৎসঙ্গীদের শ্রীশ্রীবড়দার কথায় খুব খুশী হয়েছিলেন। আনন্দাশ্রু বেরিয়ে এসেছিল তাঁর সেদিন দু’চোখ দিয়ে। আমাদের সংসারেও এমন হয়;  যখন আমাদের সন্তানেরাও আমাদের মনের কথা বুঝে নিয়েই বলতে পারে আমরা কি চাইছি। আর সেই আনন্দ যে পেয়েছে সেই একমাত্র বুঝতে পারবে ঠাকুরের আনন্দের পারদের মাত্রা। কিন্তু সচরাচর আমাদের সংসারে তা’ হয় না। আর তাই ঠাকুর আর ঠাকুরের বড় আদরের বড়খোকার সম্পর্কের রসায়ন বোঝে সে সাধ্য কার? তিনি নিজে না বোঝালে, বোঝে কোন জন? আর বুঝতে গেলেও চাই সেই আধার, চাই পরমাত্মামুখী শুদ্ধ জীবাত্মা। কথায় আছে, ‘বোঝে, প্রাণ বোঝে যার।‘ সেই প্রাণ কই? যে প্রাণ শুনতে পায় ঠাকুরের ইচ্ছা পূরণের জন্য বড়দার অন্তরের নিরন্তর কান্না? যারা ‘মারি তো গন্ডার, লুটি তো ভান্ডার’ স্বপ্নে বিভোর হ’য়ে ঠাকুরের ‘দেশত্যাগ এবং দেহত্যাগ’-এর সঙ্গে সঙ্গেই লম্ফ দিয়ে ঝম্প মেরেছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হ’য়ে অর্থ, মান, যশের অধিকারী হবে ব’লে তারা শুনতে পাবে ঠাকুরের ‘অনুকূল রাজ্য’ গঠনের কান্না? তারা শুনতে পাবে বড়দার ঠাকুরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার অন্তর উৎসারিত কান্না? তারা শুনতে পায় মহাশ্মশানের ওপার থেকে ভেসে আসা শয়তান কিল্ভিসের মৃত্যুর মহাসঙ্গীত।

যাই হ’ক, এই হলেন আমাদের শ্রীশ্রীবড়দা। ঠাকুরের সমস্ত বলাগুলি, বাণীগুলি বড়দার জীবনের জন্য। শ্রীশ্রীবড়দার মধ্যেই মূর্ত হ’য়ে উঠেছে সমস্ত বাণী। সত্যানুসরণের জীবন্ত রূপ বা চলমান সত্যানুসরণ হলেন আমাদের সকলের চোখের মণি শ্রীশ্রীবড়দা। তাই বড়দার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে ‘সত্যানুসরণ’-এর বিশ্লেষণ যা’ আর কারও পক্ষে সম্ভব হ’য়ে ওঠেনি। তাত্ত্বিক আমেজে ডুবে থেকে, বিশাল পান্ডিত্যের অধিকারী হ’য়ে, বই পড়ে বই হ’য়ে যে ‘সত্যানুসরণ’-এর ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করা যায় না তা’ টের পেয়েছেন ঠাকুরের দীক্ষিত-অদীক্ষিত বহু পন্ডিতবর্গ। 

ঠাকুরের বাণী, ঠাকুরের ‘সত্যানুসরণ’ বুঝতে হ’লে ঠাকুরের প্রতি Surrendered   (আত্মসমর্পিত) হ’তে হয়। অর্থাৎ ঠাকুরের কথা অনুযায়ী “Surrender (আত্মসমর্পণ) করলাম মানে আমি তাঁকে নিলাম। কেন নিলাম তাঁকে? Only to love and serve him অর্থাৎ কেবলমাত্র তাঁকে ভালোবাসা এবং সেবার জন্য তাঁকে নিলাম।“ ঠাকুর বললেন, Surrender কথাটার মধ্যে আছে ‘Sur’ যার মানে হ’ল ‘above’ অর্থাৎ উপরে আর  ‘render’ কথার মানে হ’ল ‘to give’ অর্থাৎ দেওয়া। ঠাকুর বললেন, ইষ্টের উপরে নিজেকে ন্যস্ত করতে হয়, নিবেদন করতে হয় অর্থাৎ সর্বোতভাবে  ইষ্টের হ’তে হয়। 

এইরকমভাবে আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় শ্রীশ্রীবড়দা নিজেকে ঠাকুরের উপরে ন্যস্ত করেছিলেন, নিজেকে নিবেদন করেছিলেন অর্থাৎ সৎসঙ্গ জগতে শ্রীশ্রীবড়দা সর্বোতভাবে ঠাকুরের হ’য়ে উঠেছিলেন। শ্রীশ্রীবড়দা ঠাকুরকে কেবলমাত্র ভালোবাসা ও সেবার জন্য জীবনে গ্রহণ করেছিলেন। আর তাই শ্রীশ্রীবড়দার চোখমুখ দিয়ে, সর্বাঙ্গ দিয়ে ছিটকে বেরোতো ঠাকুরের প্রতি একান্ত অনুরাগ। শ্রীশ্রীবড়দার জগন্নাথের মত চখা আঁখির দিকে মুখ তুলে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারতো না কেউ। 

এইরকম জীবন্ত চলমান ‘সত্যানুসরণ’ শ্রীশ্রীবড়দা আমাদের চোখের সামনে ছিলেন বলেই সমস্ত রকম শয়তানী কর্মকান্ডকে নিরাশি নির্মম ভাবে পায়ে দ’লে এগিয়ে চলা পৃথিবী জুড়ে ব্যাপ্ত বিশাল বিখ্যাত ‘সৎসঙ্গ’ প্রতিষ্ঠানকে আমরা আজ অনুভব করতে পারছি, উপলব্ধি করতে পারছি কিন্তু শ্রীশ্রীবড়দার মূল্যায়ন করতে পারছি না। কেন? এই কেন উত্তরই লুকিয়ে আছে গগনদার “শ্রীশ্রীবড়দার অনুসারীরা আসল সৎসঙ্গী” কথাটার মধ্যে।

ক্রমশঃ।

(লেখা ৭ই অক্টোবর' ২০১৭)

Thursday, October 6, 2022

অভিজ্ঞতাঃ ইহে হ্যায় পাবলিক!

অষ্টমীর সন্ধ্যা! বাড়ির সামনে মাঠ, সেই মাঠে স্থানীয় ক্লাবের পুজো হচ্ছে। সন্ধ্যে হ'তে না হতেই আলো জ্বলে উঠেছে পুজো মণ্ডপে, রাস্তায়, রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলোতে সাজানো আলোর মালাগুলি! অপূর্ব সুন্দর আলো ঝলমলে লাগছে চারপাশটা! মনে হয় এমন যদি হ'তো সারাটা বছর আলো ঝলমলে চারপাশ! ক'দিন পরেই অন্ধকারে ডুবে যাবে চারপাশ। রাস্তার আলো কোনোটা জ্বলবে, কোনোটা জ্বলবে না। মাইকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর! ভেসে আসছে পুজোর মূল ভাব, মূল আনন্দ ধ'রে রাখে, বেঁধে রাখে, ছড়িয়ে দেয় প্রাণে প্রাণে যে সুর সেই ঢাকের মিষ্টি বোল, মিষ্টি সুর ঢাক কুড়াকুর, কুড়াকুর ঢাক কুড়াকুর আওয়াজ! আজকাল আর প্যান্ডেলের ভিতর ছাড়া ঢাকের আওয়াজ বাইরে শোনা যায় না, ভেসে আসে না। প্যান্ডেলের ভিতরও শোনা যায় কখনো সখনো! ঢাকের শব্দ শুনতে পারবো একাদশীর সকালে; যখন ঢাকি বাড়ি বাড়ি আসবে টাকা, জামা-কাপড় সংগ্রহের জন্য! বাকি সময় বড় কাপড়ের দোকানের সামনে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকা বিজ্ঞাপনের স্ট্যাচুর মত প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁধে ঢাক নিয়ে ঢাকি দেখলেও দেখতে পাওয়া যায় কোনো কোনো প্যান্ডেলে! কেন যে ক্লাব কর্মকর্তারা একটু ভেবে দেখে না বিষয়টা! পুজো প্যান্ডেলে মাইকের ব্যবস্থা থাকে ঘোষণার জন্য সেখানে মাইকের সামনে সকাল সন্ধ্যে ঢাকিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ঢাক বাজালে সেই ঢাকের সুমধুর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে! দোলা লাগে প্রাণের ভিতরে! পুজোর গন্ধ, পুজোর আমেজ সকালের ঠান্ডা হাওয়ার সাথে সাথে ভেসে আসে ঘরের ভিতরে! কেন যে করে না! কেন যে ভাবে না! পুজো হয়, প্যান্ডেল-লাইট হয়, ঠাকুর আসে, আসে ঢাকি কিন্তু ঢাকের আওয়াজ কানে আসার আগেই পুজো শেষ হ'য়ে যায়!!!! বছর আসে বছর যায় কিন্তু ভেবে দেখার সময় হয় না কারও!

যাক যে কথাটা বলতে বসেছিলাম সেই কথায় আসি। অষ্টমীর সন্ধ্যায় সেই পুজো প্যান্ডেলে  বিতরণ হবে খিচুড়ি ভোগ। কিন্তু সকালের বেয়াদপ বৃষ্টির জলে প্যান্ডেলের সামনের ফাঁকা জায়গায় জল জমে থাকায় প্রসাদ বিতরণে অসুবিধা দেখা দিয়েছে। ঘরে বসে চা পান করতে করতে একটু লেখালেখি করছিলাম। ভাইপো এসে বললো জেঠু বলেছে পার্কের গেটের তালাটা খুলে দিতে। জিজ্ঞেস ক'রে জানলাম খিচুড়ি ভোগ বিতরণে অসুবিধা দেখা দেওয়ায় পার্কের সামনের রাস্তায় লাইন ক'রে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি বিতরণ করবে আর সেই খিচুড়ি নিয়ে হাতে হাতে নিয়ে সবাই পার্কে বসে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়ে নেবে। এ কথা শুনে আমি বললাম, পার্ক যে নোংরা হ'য়ে যাবে! খিচুড়ি আর কাগজের থালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার হ'য়ে নষ্ট হ'য়ে যাবে পার্কের সৌন্দর্য! পার্কের পাশে নর্দমায় কাগজের পাতা ফেলে বন্ধ হ'য়ে যাবে নর্দমা! ক্লাবের ছেলেরা একথা শুনে বললো, আমরা কাল সকালে পার্ক পরিষ্কার ক'রে দেবো আর কেউ পার্কে কাগজ ফেলবে না, ডাস্টবিন দিয়ে দেবো সামনে সেখানে ফেলবে। প্যান্ডেলের সামনে মাঠে প্রচুর জল জমে গ্যাছে, জল বের করার ব্যবস্থা করেছি তবুও অবস্থা আয়ত্তে আসেনি এই অবস্থায় শিবুদা বললো তোমার কাছে পার্কের চাবি আছে তাই এলাম। পার্কের চাবি আমার কাছেই থাকে। সময়মত খোলা বন্ধ করি আমি; কখনও কখনও বা আমার বউ, আমার বড়দা শিবুদা ও বাড়ির অন্যান্যরা। পার্কের গায়ে আমার বাড়ি তাই পার্ক খোলা-বন্ধ ও দেখাশোনা করি নিজের ইচ্ছেয়। আমার ভালো লাগে! ছোট পার্ক। বাচ্চারা আসে, বাচ্চাদের অভিভাবকরা আসেন, বাচ্চারা খেলাধুলা করে আর তাদের বাবা-মা-কাকা-জেঠু-দাদাদাদীরা পার্কের বেঞ্চে বসে থাকেন তারপর খেলা হ'য়ে গেলে যে যার মত চলে যায়। সেখানেও কেউ গেট খুলে রেখে চলে যায়, কেউ পাঁচিল টপকে আসে যায়, বাচ্চাদের মত বড়রাও টপকায়, বাচ্চাদের দোলনায় বড়রাও কখনও কখনও দোল খায়, কোলের বাচ্চাকেও দোল খাওয়াবার জন্যে মায়েরা নিজেরাও বসে পড়ে দোলনায়, দোলনা ভেঙে পড়ে যাবার ভয় থাকে, দল বেঁধে হুড়মুড় ক'রে উপড়ে উঠে যায় বাচ্চারা স্লিপারে স্লিপ খাবে ব'লে, সেখান থেকে ধাক্কাধাক্কিতে নীচে পড়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল! বড় বল নিয়ে আসে পার্কে বাচ্চারা খেলবে ব'লে, বলের ধাক্কা গিয়ে লাগে পার্কের সাজানো লাইটে, লাইট খারাপ হ'তে পারে! হয়ও! পার্কের পরিবেশ ভালো থাকলে বাচ্চারা ও বাচ্চাদের মায়েরা সেই পার্কে আসে। তাই পার্কের পরিবেশ যাতে ভালো থাকে সেদিকে পড়শীর দায়িত্বেই খেয়াল রাখি এই যা মাত্র! কখনো কখনো দুপুরে, রাতে পার্ক যখন বন্ধ থাকে তখন পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়ে ছেলে ছোকরার দল। আড্ডা মারে, দোলনায় দোল খেতে খেতে সিগারেট-বিড়ি খায়, কখনো বা গাঁজা ভরে মনের সুখে সুখটান দিতে থাকে, কোলড্রিঙ্কস (?) খায়, নানারকম ভঙ্গিতে সেলফি তোলে! সঙ্গে কারও আবার সঙ্গিনীও থাকে! কখনও কখনও রাতে (১০টা) বাচ্চা নিয়ে হাজির হ'য়ে যায় কিছু আধুনিক পুরুষ! পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়ে পার্কে অবলীলায়, অবহেলায় বাচ্চাদের দোলনা চড়াবে ব'লে! বললে বলে, অফিস কাছাড়ির জন্য আসতে পারে না তাই রাতে আসে! অদ্ভুত যুক্তি! কে কখন সময় পাবে, কে কখন আসবে তার জন্য পার্ক সবসময় খোলা রাখতে হবে তা নাহ'লে পাঁচিল টপকাবে বাচ্চাদের বাবারাও!!!

এই অবস্থায় বাচ্চারা যাতে পাঁচিল না টপকায়, ঝগড়াঝাঁটি না করে, বড়রা যাতে দোলনা না চড়ে, স্লিপারে না ওঠে, পার্কে যেন কোনও প্যাকেট, ঠোঙা না ফেলে, পার্ক যেন নোংরা না করে, পার্কে ঢোকা ও বেরোনোর সময় গেট সবসময় যেন বন্ধ রাখে, বাচ্চাদের পার্কে বড় ছেলেমেয়েরা যেন অশালীন আচরণ না করে, পার্কের বেঞ্চিতে না ঘুমোয়, বিড়ি-সিগারেট-গাঁজা-মদ পার্কে নিষিদ্ধ, নির্দিষ্ট সময় ছাড়া পার্কে যেন না আসে ইত্যাদি ইত্যাদি বোঝাতে বোঝাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত! কতজনের কাছে যে খারাপ হ'য়ে গেলাম তার হিসাব নেই! যারা অশালীন আচরণকারী, যারা নেশা করে তাদের তো চক্ষুশূল কিন্তু যারা সাধারণ আম আদমী তারাও আমার উপর বিরক্ত গেট বন্ধ থাকা ও না থাকা অবস্থায় পাঁচিল টপকানোর কারনে, দোলনায় ও স্লিপারে চড়ায় বাধা পাওয়ায়!!!!! বিরক্ত আরও কিছু পাবলিক যারা পার্কে গরমকালে পার্কের ঘাসে জল দেওয়ার জন্য যে কল লাগানো হয়েছে সেই কলে স্নান করে, সেই কলে ব্যক্তিগত গাড়ি ধোওয়ার কাজ করে, তারা। সেখানে আগে কোনো কল ছিল না, কল লাগানোর পরে সেখানে সবসময় জলে ভিজে থাকে, জল জমে থাকে আর সেই জলে পার্কে দৌড়ে আসা বাচ্চারা পা পিছলে প'ড়ে যায় আর তাই বাধ্য হ'য়েই আমায় তাদের বিরুদ্ধে বলতে হয় পার্কের পরিস্থিতির গগুরুত্ব বোঝাতে। আর তার ফলে তাদের বিরক্তির কারণ আমি। যাক বাচ্চাদের কথা ভেবে ওইসব গায়ে লেগে না আমি।

তবুও আনন্দ হয় বাচ্চারা যখন আমার কথা শোনে, নতুন বাচ্চা যারা আসে তাদের পুরোনো যারা তারা ব'লে দেয় গেট বন্ধ রাখা, পাঁচিল না টপকানো ইত্যাদি অনুশাসনের কথা! না শুনলে, ঝগড়াঝাঁটি করলে এসে রিপোর্ট করে! এমনকি আশ্চর্যের বিষয় পার্কে কয়েকবার বাচ্চারা টাকাও পেয়েছে সেই টাকা এনে হাতে তুলে দিয়েছে আর আমি অবাক হ'য়ে ভেবেছি এদের সরলতার কথা! ভেবেছি সময় নামক চাবুকের কড়া আঘাতে এই সরলতা যখন ভেঙে চুরমার হ'য়ে যায় তার জন্য দায়ী কে! কে দায়ী! সমাজ!? সমাজ ব্যবস্থা!? দেশ!? দেশের নেতৃত্ব!? বাবা-মা!? বাড়ির পরিবেশ-শিক্ষা!? 

যাই হ'ক, তারপরে সেই টাকা দিয়ে তাদের লজেন্স, বিস্কুট কিনে এনে দিলে তারা সবাই মিলেমিশে ভাগাভাগি ক'রে খেলো, তাই দেখে মনটা ভরে গেলো আনন্দে! আরো ভালো লাগলো বাচ্চারা সেই বিস্কুট, লজেন্সের কাগজ যাতে পার্কে না প'ড়ে থাকে সেদিকেও নজর রেখেছে! মন বলল, বাচ্চাদের যা শেখানো যায় প্রায় ক্ষেত্রে বাচ্চারা তাই শেখে এবং তা ধ'রে রাখতেও পারে যদি ক্রমবর্ধমানতা বজায় রাখা যায় আর জন্মে যদি খুঁত না থাকে।

আবার ফিরে আসি অষ্টমীর সন্ধ্যায়। পার্কের গেট খুলে দেবার জন্য যখন ক্লাবের পক্ষ থেকে অনুরোধ এলো তখন তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিচার ক'রে এবং ক্লাবের ছেলেদের পার্ক পরিষ্কার ক'রে দেবার কথায় গেট খুলে দিলাম। নিমেষের মধ্যে পার্ক ভরে গেল মানুষে। প্রত্যেকের হাতে অষ্টমী ভোগ। কাগজের থালায় দেওয়া হয়েছে সেই ভোগ। পার্কের বেঞ্চে বসে, পার্কের পাঁচিলের উপর থালা রেখে সবাই প্রসাদ খাচ্ছে। আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম আর সকলকে অনুরোধ করতে লাগলাম পার্কে ও পার্কের বেঞ্চিতে, পাঁচিলের উপরে কেউ যেন পাতা, খিচুড়ি না ফেলে। যতটা সম্ভব চেষ্টা করলাম সবাইকে বোঝাতে, একটা শৃঙ্খলার চাপে রাখতে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে যাদের খাওয়া হ'য়ে গেছে তাদের বললাম, দেখিয়ে দিলাম নির্দিষ্ট জায়গায় খাওয়া শেষ হ'লে পাতা ফেলতে। ক্লাবের ছেলেরাও একইভাবে ব'লে চলেছে। যেখানে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে সেইখানেই ক্লাবের ছেলেদের বললাম প্রসাদ দেওয়ার সময়ই কোথায় পাতা ফেলতে হবে তা ব'লে দিতে। সেইভাবে তারা তা বললো। এইভাবে অনেকক্ষন চলার পর একটু ভিড় হালকা হ'লে আমি ঘরে চলে এলাম। তারপরে বেশ কিছুক্ষণ পর প্রসাদ বিতরণ পর্ব শেষ হ'লে আমার স্ত্রী আমায় এসে জানালো পার্কে আর কেউ নেই কিন্তু পার্কের সামনে নর্দমার অবস্থা খারাপ! আমি পার্কে তালা দেবার জন্য আবার ঘর থেকে বেরোলাম। পার্কের সামনে গিয়ে দেখলাম পার্কের সামনে নর্দমায় স্তূপ হ'য়ে প'ড়ে রয়েছে এঁটো পাতা, রাস্তায় ও পার্কে ছড়িয়ে রয়েছে যত্রতত্র! 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি আর ভাবছি যতক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, পার্কের ভিতরে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর সবাইকে বলছিলাম কোথায় পাতা ফেলতে হবে ততক্ষণ শৃঙ্খলা ছিল অটুট (তার মধ্যেও ফাঁকতালে একটা পাতা নর্দমায় ফেলেছে) কিন্তু স্থানত্যাগ করার পরমুহূর্তে এই অবস্থা!? শুধু মনে মনে বললাম, ইয়ে হ্যায় পাবলিক!

যাই হ'ক আজ নবমীর সকাল, দেখলাম কথা রেখেছে ক্লাব। ক্লাবের নাম ভদ্রকালী শিবাজী স্পোর্টিং ক্লাব। আমার বড়দা অর্থাৎ ক্লাবের সবার প্রিয় শিবুদা ক্লাবের সদস্যদের (নবীন, তিনু ইত্যাদি) নিয়ে পার্কের পূর্বের অবস্থা থেকেও আরো ঝকঝকে ক'রে দিয়েছে পার্ক, পার্ক সন্নিহিত রাস্তা ও নর্দমা! 

দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেলো পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কথা যা প্রতিমুহূর্তে ঠাকুরবাড়ি থেকে আচার্যদেব শ্রীশ্রীঅশোকদাদা ও শ্রীশ্রীবাবাইদাদা মনে করিয়ে দিচ্ছেন: 

যার থেকে যে জিনিস ব্যবহারের জন্য নেব তা যেন ফিরিয়ে দেওয়ার সময় আরও সুন্দর, আরও পরিষ্কার ক'রে ফিরিয়ে দেওয়া হয়!

তারই বাস্তব রূপ দেখলাম এই পার্কে! ধন্য শিবাজী স্পোর্টিং ক্লাব! ধন্য! আমাকে দেওয়া কথা রাখার জন্য! পরমপিতা ক্লাবের সবার মঙ্গল করুক!

(লেখা ৭ই অক্টোবর' ২০১৯)

প্রবন্ধঃ নুসরাত বনাম মৌলবী-মৌলানা-উলেমা!

নুসরাতের ধর্ম বিশ্বাসে, ধর্মাচরণে আপত্তি, বাধা মুসলিম ধর্মগুরুদের! শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান-অভিনয়-ক্রীড়া-রাজনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রের কৃতি মুসলিম সেলিব্রিটিরা নুসরাতের পাশে না বিরুদ্ধে!? তাঁরা চুপ কেন!? তাঁরা কি বলেন!? তাঁরা কেউ কেন কিছু বলেন না, মুখ খোলেন না!? কাকে ভয় পান তাঁরা? ভারতের অভিনয় জগতে তো নুসরাতের মত অনেক মুসলমান অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন তাঁরা এতদিন ধ'রে নুসরাতের বিরুদ্ধে মৌলবী- মৌলানা-উলেমাদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে তো আজ পর্যন্ত কোনও মতামত দিলো না! সিনেমার পর্দায় মিথ্যে বাহাদুরী দেখিয়ে যারা কোটি কোটি টাকা কামায়, দেশের যুব সমাজের কাছে হিরো-হিরোইন হ'য়ে যায় তারা বাস্তবের মাটিতে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে বাহাদুরী দেখাবার সুযোগ কাজে লাগায় না কেন? এখানে নোট নেই তাই? এখানে কারও চক্ষুশূল হওয়ার ভয় আছে? নুসরাত তো মুসলিম তাহ'লে তার ভয় নেই কেন? বাংলার বাঙালি অভিনেত্রীর পাশে কেউ থাকুক না থাকুক বাংলার ব্র্যান্ড আম্বাসাডার শাহরুখ খান আপনি তো বাংলার অভিনেত্রীর জন্য কিছু বলুন! তার পাশে দাঁড়ান! ভারতের কৃতি খাঁটি মুসলিমদের বক্তব্য শুনতে চায় সমস্ত সম্প্রদায়ের আম ভারতবাসী! আজ আবার নতুন বিতর্ক নুসরাতকে নিয়ে! দুর্গাপূজায় অংশগ্রহণের জন্য, পুজো প্যান্ডেলে পুজো দেবার জন্য, ঢাক বাজাবার জন্য, মাথায় সিঁদুর কপালে বিন্দি পড়ার জন্য ক্ষিপ্ত মুসলিম মৌলব-মৌলানা-উলেমারা! কিন্তু মুসলিম বুদ্ধিজীবী, মুসলিম ব্যবসায়ী, মুসলিম উচ্চ শিক্ষিত সমাজ, মুসলিম সেলিব্রিটি, মুসলিম প্রগতিবাদীরা তো কিছু বলুন! শুনি আপনাদের কথা, মতামত!  নাকি আপনারা সবাই সেই প্রাকঐতিহাসিক যুগের জংলী সভ্যতার পূজারী!? আসুন সমস্ত সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ শুনে নিই, জেনে নিই ভারতের প্রতিষ্ঠিত মুসলিমরা কি বলেন!!!! আজ সময় এসেছে মুখ আর মুখোশের মাঝে পর্দা ওঠাবার! নুসরাতকে ধন্যবাদ দুধ কা দুধ, পানি কা পানি-র পোল খোল ক'রে দেবার জন্য!

কথায় আছে, সময় সবসে বড়া বলবান! দেখা যাক কে বা কারা জেতে নুসরাতের ধর্ম বিশ্বাস বনাম মৌলানা, উলামাদের অন্ধ, গোঁড়া, উগ্র, অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় ফতোয়ার লড়াইয়ে!!! আর কারা নিরপেক্ষতার পর্দার আড়ালে মুখ লুকিয়ে বসে আছে!!!

( লেখা ৭ই অক্টোবর'২০১৯)