Tuesday, December 13, 2022
কবিতাঃ প্রার্থনা
নয় কেন প্রতি ক্ষণে প্রতি পলে? নয় উদয়াস্ত জীবন মাঝে
শয়নে স্বপনে জাগরণে? তোমায় পেয়েও যদি না পাই,
না দাও ধরা চিরতরে তবে কিসের জন্য বাঁচা আর
কার জন্যেই বা মরা? তোমায় নিয়ে বাঁচি, তোমায়
নিয়েই মরি এই-ই তো মনের ইচ্ছা; মনের ইচ্ছা মনেই
মরে মরণ -তরণ ঐ নাম জপে এই-ই কি তোমার সদিচ্ছা?
তোমার ইচ্ছা তোমারি আমার ইচছা আমার
তোমার ইচ্ছায় জ্বলে আলো আমার ইচ্ছায় আঁধার।
তোমার ইচ্ছায় আছে দিশা মুক্তির আমার বন্দী দশা
তোমার আছে অমৃতের স্বাদ আমার আছে বিষের নেশা।
তোমায় বাসি ভালো তোমার কাছে ফিরেফিরে আসি তাই
জীবন মাঝে হাজারো ভুল! আছে হাজারো অন্যায়!
তবুও আমার যা আছে তাই দিয়েই
তোমার মাঝে তুমি হয়েই থাকতে আমি চাই
আর প্রার্থনা এই,
বৃত্তি সুখের উল্লাসে যেন তোমাকে আর না হারায়।
প্রবি।
(রচনা ১৪ই ডিসেম্বর '২০১৮)
Monday, December 12, 2022
প্রবন্ধঃ ঈশ্বর কোথায়? ঈশ্বর কে?
ঈশ্বর বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী প্রায় সকলের এক কথা, ঈশ্বর কোথায়? ঈশ্বরকে তো দেখিনি, দেখাও যায় না। তাহ'লে কিভাবে ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে তা বিশ্বাস করবো? রামকৃষ্ণ মঠের মহারাজরা বলেন, শুনেছি-----আমি বই পড়িনি, আর পড়ার একটা বিশেষ ধৈর্য্যও নেই, কারণ ঘোর কলিযুগের প্রোডাক্ট তো তাই, ------- স্বামী বিবেকানন্দও নাকি বলেছেন, ঈশ্বরকে অনুভব না করা পর্যন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বে যেন বিশ্বাস না করা হয়। অর্থাৎ ঈশ্বরকে অনুভব করো তারপর ঈশ্বরকে বিশ্বাস করো। বেদ অধ্যয়ন আমি করিনি। তবে শুনেছি কিম্বা কোথাও পড়েছি; কোথায় পড়েছি এখন অবশ্য মনে নেই। বেদে নাকি আছে 'আমি কে?' এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে একদিন তুমি তোমার ভিতরেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাবে; বুঝতে পারবে তুমিই সে। তুমিই সেই পরাৎপর ব্রহ্ম অর্থাৎ শ্রেষ্ঠের শ্রেষ্ঠ সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্ম, পরমেশ্বর। রামকৃষ্ণ মঠের এক মহারাজের লেখা পড়ছিলাম ইশ্বর যে আছেন, ঈশ্বরের যে অস্তিত্ব আছে তার প্রমাণ হ'লো আমার অস্তিত্ব।
এখন প্রশ্ন হ'লো তাহ'লে ঠাকুর রামকৃষ্ণ কে? তিনি কি পরমাত্মা? তিনি কি পুরুষোত্তম? তিনি কি পরমপিতা? তিনি কি সদগুরু? তিনিই কি সৃষ্টিকর্তা? তিনি কি জীবন্ত ঈশ্বর? তাহ'লে আমি কে? আমি যদি ঈশ্বর হবো, ঈশ্বরের অস্তিত্ব হবো তাহ'লে প্রভু রামচন্দ্র থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রই বা কে? কে দেবে উত্তর? বিবেকানন্দ প্রথম জীবনে যে কথা বলেছিলেন সেই কথা কি তিনি রামকৃষ্ণকে পাওয়ার পর শেষ জীবনেও বলেছিলেন? তিনি ঈশ্বরকে অনুভব না করা পর্যন্ত ঈশ্বরকে না বিশ্বাস করার কথা যে বলেছেন তা তিনি ঈশ্বরকে কিভাবে অনুভব করেছিলেন? তিনি কি ঠাকুর রামকৃষ্ণকে দেখে, ঠাকুরের সঙ্গ ক'রে ঠাকুর রামকৃষ্ণের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিলেন, ঈশ্বরকে অনুভব করেছিলেন ও ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেছিলেন? নাকি বেদ, বেদান্ত পড়ে, নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজতে খুঁজতে একদিন নিজের ভেতরেই ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছিলেন? বিবেকানন্দ কি সনাতন ধর্ম তথা হিন্দু ধর্মের এবং বেদ-বেদান্তের প্রচার করেছিলেন? নাকি শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণের প্রচার করেছিলেন? আমেরিকায় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেখানে তিনি কোন বিষয়কে হাইলাইটস করেছিলেন? ঠাকুর রামকৃষ্ণ নাকি সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম? কেন মহারাজরা আজও বিবেকানন্দ আর বেদ-বেদান্তের কথায় ব'লে বেড়ান? কেন ধর্মজগতের ধর্মগুরুরা খালি নানা তাত্ত্বিক কথার প্যাচাল পাড়েন? কেন রামভক্ত, কৃষ্ণভক্ত, বুদ্ধ বা যীশুভক্ত, রসুল, মহাপ্রভু বা রামকৃষ্ণ ভক্তরা তাঁদের আরাধ্য দেবতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী রূপের মধ্যে তাঁদের আরাধ্য দেবতাকে দেখতে পান না?
যাই-ই হোক আমার বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, উপনিষদ ইত্যাদি গ্রন্থ পড়া হয়নি, পড়া হয়নি একটু আধটু পুরুষোত্তমদের মুখ নিঃসৃত কথামৃত ছাড়া আর কোনও ধর্মগ্রন্থ। আর পড়ার মতো ধৈর্য্যও নেই। আমি ভালো পাঠক, ভালো সাধক, ভক্তও নই। শুধু ভাবি আমার সামনে যখন এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা রক্তমাংসসংকুল জীবন্ত ঈশ্বর পুরুষোত্তম পরমপিতা পরমাত্মা সদগুরু শ্রীশ্রীরাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণ ও The greatest phenomenon of the world SriSriThakur Anukulchandra আছেন তখন আমার কি আর দরকার বেদ, বেদান্ত ইত্যাদি পড়ার? কি দরকার নিজের ভেতরে ঈশ্বরকে খুঁজতে যাওয়ার? তিনারাই তো জীবন্ত বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, উপনিষদ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরান, সত্যানুসরণ সহ তাঁর ২৫হাজার বাণী ও হাজারো প্রশ্ন উত্তর সহ কথোপকথন। তিনারাই তো জীবন্ত ঈশ্বর। তাঁদের উপস্থিতিই তো আমার কাছে জীবন্ত ঈশ্বর। তাঁদের মুখনিঃসৃত অমৃত কথা আমার জীবনে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার এবং ঈশ্বরের উপস্থিতি, ঈশ্বরকে অনুভব করার সহজ সরল সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এক-অদ্বিতীয় উপায়। আমার মন, আমার প্রাণ, আমার হৃদয় বলে,
'রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মহাপভু, রামকৃষ্ণ, অনুকূল রূপে
সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছো ঈশ্বর?
তাঁদের প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।
তাহ'লে কেন আমি কঠিন পথ অনুসরণ করবো? কেন আমি "মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন" সেই পথ অনুসরণ করবো না? কেন আমি জেনে শুনে পরিক্ষিত সত্য সেই সহজ সরল পথ ছেড়ে অজানা অদেখা কণ্টকাকীর্ণ দুর্গম পথ অকারণ বেছে নেব? কেন আমি রামচন্দ্র থেকে ঠাকুর অনুকূল পর্যন্ত জীবন্ত ঈশ্বরকে আট আটবার কাছে পেয়েও বনে জংগলে, পাহাড়ে পর্বতে, হাজারো দেবদেবী, ধর্মগুরু ও ধর্মগ্রন্থের মধ্যে, আমার নিজের অন্তরে বেমতলব খুঁজতে যাবো!?
ঈশ্বর কোথায়? ঈশ্বর কে? এই প্রশ্নের উত্তরে যখন ঈশ্বর ভক্ত পূজারি বলে, ঈশ্বর তোমার অন্তরে। অন্তরে তাঁকে খোঁজ। আর প্রশ্ন করো নিজেকে 'আমি কে? আমি কে?' তখন মন-প্রাণ-হৃদয় বিদ্রোহী হ'য়ে বলে ওঠে, ধ্যাৎ তোর অন্তর আর অন্তরে খোঁজা। গুলি মেরেছে 'আমি কে? আমি কে? জানা।
আমি বোকা, আমি মূর্খ, আমি অশিক্ষিত, আমি হাবলা-ক্যাবলা তাই আমি আর ঈশ্বরকে খুঁজতে মন্দির, মসজিদ, গীর্জা ইত্যাদি কোথাও যাই না। নিজের অন্তরে ও কোনও ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজতে যাই না, জানতেও চাই না ও যাইও না 'আমি কে?'। কোথাও গিয়ে ও নিজেকে জানতে চেয়ে এই অল্প ক'দিনের জন্য আসা পৃথিবীতে সময় নষ্ট করতে চাই না। কারণ আমি হাজার বছর বাঁঁচবো না যে সময় নষ্ট করবো।
আমি পেয়েছি, আমি জেনেছি আমার প্রিয়পরম ঈশ্বরকে। আমার জীবন সার্থক।
Tuesday, December 6, 2022
উপলব্ধিঃ সাদা পোশাক ও আমরা।
একসঙ্গে অনেকে সাদা ধুতি আর ফতুয়া পড়লে একটা শান্ত সৌম্য ভাব আসে, সুন্দর লাগে। পরিবেশের ওপর তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু সাদা পোশাকের মর্যাদা রক্ষা না হ'লে সাদা পোশাক তার গৌরব হারায়। এখন সাদা পোশাক প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ'রে ফেলেছে। সবাই সাদা পোশাকে সুসজ্জিত হ'য়েই মারণ যজ্ঞের ছক কষে। ফলে গেরুয়া পোশাকের মতো সাদা পোশাকও এখন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। গেরুয়া পোশাকের আর আগের মতো জৌলুশ নেই। যে গেরুয়া পোশাক ছিল ত্যাগের প্রতীক সেই পোশাক আজ ত্যাগের ওপর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আর এঁকে দেওয়ার কাজটা একশ্রেণীর গেরুয়াধারীরা নিজেরাই করেছে। ঠিক তেমনি যেখানে যত নোংরামো সেখানে তত একশ্রেণীর সাদা পোশক। -----প্রবি।
( ২৫শে নভেম্বর'২২)
প্রবন্ধঃ আমার দয়াল ঠাকুর ও আচার্যদেব। (২)
একবার একটা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। চাকরী সংক্রান্ত সমস্যায় সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হওয়ায় ছেলেমেয়ে উভয়েই দৌড়ে গেছিল ঠাকুরবাড়ি শ্রীশ্রীবাবাইদাদার কাছে। সালটা ছিল সম্ভবত ২০১৬। ঠাকুরবাড়ি পৌঁছে জানতে পেরেছিলাম আগের দিন শ্রীশ্রীবাবাইদাদা কলকাতার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন বিশেষ শারীরিক কারণে। মনটা ভেঙে গেল ছেলেমেয়ের। আমাদেরও মনটা বিষন্ন হ'য়ে গেল।
পরদিন ভোরবেলা শীতের ভোর কুয়াশা ঢাকা আকাশ চারপাশ। পুষ্পবৃষ্টির মত হালকা শিশির কণা চোখেমুখে ঝ'রে পড়ছে! প্রার্থনা শেষে আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম যেখানে আচার্যদেব বসতেন সেইখানের উদ্দেশ্যে। স্ত্রী অনেক আগে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল। আমরা ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি। গত রাত থেকে প্রার্থনা করছিলাম আমরা সবাই শ্রীশ্রীবাবাইদাদার দেখা যদি না পাই দয়াল অন্তত যেন শ্রীশ্রীঅবিনদাদার দেখা পাই। কিন্তু অবিনদাদা তখন কোথাও দর্শন দিত না।
তখন আমরা চিড়িয়াখানার পাশ দিয়ে যাচ্ছি। স্নানকুন্ডের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি হঠাৎ মেয়ে আমার বললো, বাবা, বাবা অবিনদাদা যাচ্ছে। চেয়ে দেখলাম সত্যি সত্যিই অবিনদাদা শ্রীশ্রীবড়দা বাড়ির দিক দিয়ে এসে আমাদের পাশ দিয়ে বাইক চালিয়ে স্নানকুন্ডের পিছনে বাইক থামিয়ে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ কোথাও নেই! ফাঁকা চারপাশ। ভোরের কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। ফাঁকা জায়গায় অবিনদাদাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর তখনি মনে হ'লো যেন দয়াল আমাদের গতরাতে এবং সকালের প্রার্থনা শুনেছে! আর কোনও কিছু না ভেবে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঐ ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা অবিনদাদার সামনে হাজির হলাম। হাতজোড় ক'রে প্রণাম ক'রে ঠাকুরবাড়ি আসার কারণ ও শ্রীশ্রীবাবাইদাদার অনুপস্থিতির কথা তুলে ধরলাম। বললাম, আপনি যদি ওদের সমস্যার কথা শোনেন। হাসিমুখে অবিনদাদা ছেলেমেয়ে উভয়ের কাছে সমস্যার কথা জানতে চাইলে দু'জনেই তাদের অন্য কোম্পানিতে চাকরী পাওয়ার কথা জানিয়ে জানতে চাইলো সেখানে জয়েন করবে কিনা।
প্রথমে মেয়ের কথা শুনে তাকে নোতুন কোম্পানী ও বর্তমানে যেখানে কাজ করে সেই কোম্পানি সম্পর্কে, কাজ সম্পর্কে, বেতন সম্পর্কে একের পর এক এত ডিটেইলসে আলোচনা করলেন তা দেখে আমি হতভম্ব হ'য়ে গেলাম! মনে মনে অবাক হ'য়ে ভাবছিলাম অবিনদাদার বয়সের কথা আর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছিলাম, অবিনদাদার মাত্র ১৬বছর বয়স। এই বয়সে কোম্পানী সম্পর্কে, চাকুরী সম্পর্কে এত জ্ঞান!? এত পরিণত? মন বললো, ১৬বছরের একজন পরিণত কিশোর নয়, যুবক নয় একজন লোক! অনেকক্ষণ কথা বলার পর মেয়েকে নোতুন কোম্পানীতে জয়েন করার আশীর্বাদ করলেন। তারপর বাবা যখন আসবে তখন জয়েন ক'রে এসে বাবাকে জানিয়ে আশীর্বাদ নিতে বললেন। তারপর ছেলেকে হেসে জিজ্ঞেস করলেন ওর সমস্যা কি? ছেলেরও ছিল নোতুন কোম্পানিতে চাকরীর অফার। ছেলের কাছে সব শুনে ছেলেকে সরাসরি না ক'রে দিল। বললো, এখন পকেটে যা ঢুকছে তা ভালোলাগছে না? আরো চাই? তারপর টাকার লোভে নোতুন জায়গায় গিয়ে ৬মাস পরে যদি বের ক'রে দেয় তখন কি হবে? জিজ্ঞেস করলো ছেলেকে। তার থেকে বরঞ্চ এখানেই থাক। এখানেই প্রমোশন, বেতন বৃদ্ধি সব হবে। ঠিক আছে? আরো অনেক কথা, অনেক উদাহরণ, অনেক ঘটনা তুলে ধ'রে দীর্ঘ আলোচনার শেষে ছেলেকে বললো, কি কিছু বুঝলি? ছেলে মাথা নেড়ে খুশী মনে সম্মতি জানালো। তারপরে বললো, আর কিছু? তাহ'লে আসি? আমরা খুশী মনে তাঁকে প্রণাম ক'রে সরে দাঁড়ালাম। আর ঠিক তখনি একজন বন্ধু এলে তাকে এনফিল্ড বাইকের পিছনে বসিয়ে চোখের নিমেষে চলে গেলেন। আমরা অবাক বিস্ময়ে তাঁর যাওয়ার পথে দিকে চেয়ে রইলাম।
ছেলেমেয়ের সে কি আনন্দ! যাক আসা বৃথা হয়নি। দয়াল ঠাকুর প্রার্থনা শুনেছেন। একটা দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তির চাপ মাথা থেকে নেবে গেল দু'জনের। মনে পড়ে গেল, দয়াল ঠাকুর প্রায়ই বলতেন, "আজও লীলা ক'রে গৌর চাঁদ রায়, কোনও কোনও ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।" আজ আরো একবার প্রমাণ হ'লো এই বাণীর সত্যতা! প্রমাণ হ'লো সৎসঙ্গে আচার্যদেবের লীলা! ভেসে উঠলো আচার্য পরম্পরার প্রথার মধ্যে দিয়ে পিতাপুত্রের লীলার জ্বলন্ত ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সংকেত!
ছেলেমেয়ের আনন্দে আমারও আনন্দ হ'তে লাগলো। সারাক্ষণ কে যেন মনের মধ্যে এসে ব'লে যেতে লাগলো, আচার্যদেব শ্রীশ্রীদাদা আছেন দেওঘরে কিন্তু বর্তমানে যাকে নিবেদন করা হয় তিনি নেই এখন দেওঘরে, তিনি কলকাতায় অথচ সমাধান দিলেন ১৭বছরের একটি অত্যাশ্চর্য ছেলে, যাকে সৎসঙ্গীরা অবিনদাদা ব'লে ডাকেন। কেন তিনি কুয়াশা ঢাকা অত ভোরে বাইক চালিয়ে ঠিক আমাদের সামনে এলেন!? আর আশেপাশে কেন কেউ ছিল না সেখানে অত ভোরে!? আর কেনই বা কথা শেষ ক'রেই একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে চলে গেলেন আবার যে পথ দিয়ে এসেছিলেন সেই পথ ধ'রে!? কে উত্তর দেবে এর?
যাই হ'ক পরবর্তীতে যা হয়েছিল সেটা ব'লে এই লেখা শেষ করবো। মেয়ের নোতুন কাজের জায়গায় সবকিছু মেয়ের ফেভারে ছিল। ছেলেও তার পুরোনো জায়গায় র'য়ে গেল এবং সেখানেই ধীরে ধীরে নিজের জমি শক্ত হতে লাগলো। আজও ২০২২ সালে এই লেখা পর্যন্ত সে ঐ কোম্পানিতে আছে অবিনদাদার কথামতো 'এইখানেই তোর সব হবে' বাস্তবায়িত হওয়ার মধ্যে দিয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে যেটা আশ্চর্যের, যে কোম্পানিতে যাওয়ার ব্যাপারে অবিনদাদা নিষেধ করেছিলেন সেই কোম্পানিতে যে প্রোজেক্টের জন্য ছেলেকে চাকরী অফার করেছিল সেই প্রোজেক্ট ঠিক ছয় মাস পর কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে চ'লে যায়। ফলে যারা ব্যাঙ্গালোরে যাবার জন্য রাজী তারা যেতে পারে আর যারা যাবে না বা যেতে পারবে না তাদের জন্য কলকাতায় কোনও জায়গা নেই। অতএব পশ্চাদদেশে পদাঘাত। ছেলের ক্ষেত্রে যা হ'য়ে দাঁড়াত সাপের ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। যেটা অবিনদাদা আগেই জানতো। ভাগ্যিস সেদিন ছেলেমেয়ে দৌড়ে চলে গিয়েছিল ঠাকুরবাড়ি নোতুন চাকরীতে জয়েন করবে কিনা তার অনুমতি ও আশীর্বাদ নিতে! ভাগ্যিস সেদিন ঐ প্রচন্ড কুয়াশা ঢাকা শীতের ভোরে বর্তমান আচার্যদেব আশ্রমে নেই জেনেও অজানা এক টানে আমরা স্বামীস্ত্রী, পুত্রকন্যা সহ চারজনে হেঁটে চলেছিলাম নাম করতে করতে আর মনে মনে বলছিলাম, হে দয়াল! তুমি দয়া করো! বাবাইদাদা নেই, দয়া ক'রে তুমি অবিনদাদার সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও।
কোথায় জানি ঠাকুরের কোন গ্রন্থে পড়েছিলাম, বিশ্বাস আর আকুল প্রার্থনা সব অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে। সেদিন দয়াল দয়া ক'রে অবিনদাদার মধ্যে দিয়ে ঐ অতি প্রত্যুষে এসে দেখা দিয়ে সমস্যা সমাধান ক'রে দিয়ে গেলেন। ভাগ্যিস অবিনদাদার আদেশ মতো ছেলে পুরোনো কোম্পানীর চাকরী ছেড়ে নোতুন কোম্পানীর লোভনীয় অফার গ্রহণ করেনি। অবিনদাদার নির্দেশ আদেশ উপেক্ষা ক'রে যদি সেদিন ঐ অফার গ্রহণ করতো তাহ'লে হয় ছেলেকে চাকরী বাঁচাতে বাংলা ছেড়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিবারের সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হ'তো অন্য রাজ্যে; নতুবা, চাকরী ছেড়ে বসে থাকতে হ'তো ঘরে। দয়াল সেদিন পূজনীয় শ্রীশ্রীঅবিনদাদার আচরণের মধ্যে দিয়ে দয়া ক'রে বাঁচিয়ে দিলেন, রক্ষা করলেন পুত্রের বর্তমান চাকরী ও পিতামাতার সঙ্গে পুত্রের বিচ্ছেদ।
কে এই শ্রীশ্রীঅবিনদাদা? শ্রীশ্রীঅবিনদাদা কি অন্তর্যামী!?
জানি না আমি। তবে একটা কথা বলে যাই, যদিও অলৌকিকতা ব'লে কিছু নেই। যতদিন না তুমি ঘটনার কার্যকারণ জানতে পারছো ততদিন তোমার কাছে অলৌকিক। আর যে মুহূর্তে তুমি ঘটনার কার্যকারণ জানতে পারছো তখনি তা হ'য়ে যাচ্ছে লৌকিক। যখনই জানাটা হাতের মুঠোয় এসে যাচ্ছে তখনি সেটা হ'য়ে যাচ্ছে বাস্তব। আর যতক্ষণ জানতে পারছো না ততক্ষণ তা অলৌকিক, অবাস্তব বা কাকতালীয়।
কিন্তু এ ছাড়া এমন এমন ঘটনা আজও ঘটে যার কোনও ব্যাখ্যা নেই। আমার দয়াল ঠাকুরের কয়েকটা পছন্দের কোটেশান আছে যা তিনি প্রায়ই বলতেন। তার মধ্যে একটা শেক্সপিয়ারের 'হ্যামলেট' নাটকের অংশ। ঠাকুর প্রায়ই রহস্য ক'রে বলতেন, " There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosopy." যার অর্থ, স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে আরও বহু জিনিস আছে, হোরাশিও, যা তোমার দর্শনের পাল্লার বাইরে ও স্বপ্নের অতীত।"
আজও আমার ভোরের কথাটা মনে পড়লে (আর মনেও পড়ে সবসময়) কেমন জানি রহস্যময় এক জগতে চলে যায় শরীর মন। এ জোর ক'রে কাউকে বিশ্বাস করানো যায় না। কুয়াশা ঢাকা সেই শীতের ভোর! চারিদিক আবছা আলো আঁধারে ঢাকা প্রকৃতি! মাথার ওপরে বেশ ঝ'রে পড়ছে ঝিরঝিরিয়ে কুয়াশা! চোখেমুখে এসে লাগছে কুয়াশার সেই হালকা জলের ছিটা। এক হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না! চারপাশটা ফাঁকা! নিস্তব্ধ! আর কেনই বা কেউই নেই তাও জানি না। আমরা পরিবারের চারজন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে উদভ্রান্তের মতো হেঁটে চলেছি। কেন চলেছি, কি জন্য চলেছি, কার জন্যে চলেছি এই অতি প্রত্যুষে পাঠক বিশ্বাস করুন আমরা কেউ জানি না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি! মনে হচ্ছিল কে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐ ঠাকুরের সুইমিং পুলের দিকে। আর তারপরেই ঐ অতি প্রত্যুষে আলোআঁধার পরিবেশে ঘটেছিল ঘটনাটা! হঠাৎ কুয়াশার ঘন আচ্ছরণ ভেদ ক'রে সামনে এসে হাজির হয়েছিল সেই বিশাল এনফিল্ড বাইক আর বাইকের ওপর সওয়ারি। একে কি বলবো পাঠক জানি না। বিশ্বাস করা আর না করা আপনাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে আমরা সেদিন দয়াল ঠাকুরের দয়ায় সাক্ষাৎ প্রমাণ পেয়েছিলাম ঠাকুরের প্রায় সময় রহস্য ক'রে বলা শেক্সপিয়ারের সেই 'হ্যামলেট' নাটকের অংশ বিশেষ, " There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy." যার অর্থ, স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে আরও বহু জিনিস আছে, হোরাশিও, যা তোমার দর্শনের পাল্লার বাইরে ও স্বপ্নের অতীত।" যা আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে! যখনই মনে সন্দেহ, অবিশ্বাস মুহূর্তের জন্য বিন্দুমাত্র হানা দেয় তখনি যেন মনে দয়াল মিষ্টি হেসে রহস্য ক'রে বলছেন তাঁর প্রিয় কোটেশানটা।
ক্রমশঃ
( ২৭শে নভেম্বর' ২০২২)
17
Monday, December 5, 2022
আমার দয়াল ঠাকুর ও আমার আচার্যদেব। (১)
আমার অন্যান্য বিপদের কথা এখানে আলোচনা ক'রে লেখাকে দীর্ঘ করতে চাই না। শুধু রোগ নিয়ে যে বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলাম সেই রোগ সংক্রান্ত বিপদ্গুলির কথায় শুধু বলবো এখানে এই প্রবন্ধে।
তার আগে ব'লে রাখি জাগতিক জীবনে আমার শ্রীবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেই ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সুখই আমাকে রাঙাতে পারেনি। জীবন জুড়ে ছোটোকে বড় আর বড়কে আরো বড় করার ঠাকুর দর্শনে বিশ্বাসী আমি শুধু বাড়ির খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অন্যের মই হ'য়েই বেঁচে আছি আজ পর্যন্ত।
সালটা সম্ভবত ২০১৫ হবে। বর্তমান শ্রীশ্রীআচার্যদেব তখন দর্শন দিতেন শ্রীশ্রীবড়দার বাড়ি যাওয়ার পথে ঠাকুর বাংলো থেকে বেরিয়েই পাশে যে গেট সেই গেটের ভিতরের বিশাল যে ফাঁকা জায়গা সেইখানে নির্দিষ্ট বসার জায়গায় এবং আচার্যদেব শ্রীশ্রীদাদার নির্দেশেই তাঁকে নিবেদন করার পরিবর্তে বর্তমান আচার্যদেবকে সব নিবেদন করা হত সেই সময়।
সেইসময় কোনও একদিন সকালে শ্রীশ্রীআচার্যদেবকে আমার স্ত্রী আমার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রসঙ্গে বলেছিল, "আমি অন্যের মই হয়েই কাটিয়ে দিয়েছি আমার রাজনৈতিক সারাটা জীবন। মই হিসেবে সবাই ব্যবহার করে আর কাজ মিটে গেলে কেউ খোঁজ রাখে না।" এ কথার উত্তরে সেদিন আচার্যদেব রাজনীতির সঙ্গে আর যুক্ত না থাকার কথা আমায় বলেছিলেন। বলেছিলেন পুরো সময়টায় ঠাকুরের কাজে যুক্ত থাকতে। আর হাসতে হাসতে বলেছিলেন, "রঙ করেন কেন? রঙ করবেন না। সাদা চুল আর দাঁড়ি দেখে আপনাকে কেউ আর ডাকবে না নতুবা আপনার মুক্তি নেই।" চারপাশে একটা হাসির রোল উঠেছিল।
অনেকদিন পর বেশ ভালো লাগছিল, নিজেকে হালকা বোধ হচ্ছিলো সেই মুহুর্ত থেকে। মুহূর্তে যেন একটা বিরাট অসহ্য চাপ নেবে গেল মাথা থেকে। যে চাপ কোনও ডাক্তার, কোনও ওষুধ, কোনও জাগতিক সুখ এতদিন নাবাতে পারেনি। একটা পাহাড় হ'য়ে চেপে বসেছিল মাথার ওপর। সেদিন বেশ ফুরফুরে পাখির পালকের মতো হালকা বোধ হচ্ছিলো শরীরটা সেই মধুময় আলোময় রূপময় সকালে। অনুভব করলাম একটা দিব্য জ্যোতি যেন সেই দেবোপম শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হ'য়ে আমাকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে! আমি তৃপ্ত হলাম, শান্ত হলাম। তখন আমি তাঁকে হাত জোড় ক'রে প্রণাম ক'রে বললাম, 'আজ্ঞে তাই হবে। আর আজ থেকে নিজের মই নিজে হলাম।'
তখন তিনি শ্রদ্ধেয় শান্তিদাকে ডেকে কিছু নির্দেশ দিয়ে দিলেন আমার জন্য। প্রণাম ক'রে উঠে এলাম সেখান থেকে। সেই থেকে শ্রদ্ধেয় শান্তিদার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা।
প্রথমে স্ত্রীর উপর বিরক্ত হ'লেও পরে বুঝেছিলাম আচার্যদেবকে বলা আমার সম্পর্কে স্ত্রীর সেই কথার আল্টিমেট উপকারিতা। সেই শুরু হ'লো মানসিক নিরাময় প্রক্রিয়া! আমি ধীরেধীরে সম্পূর্ণ রূপে মসৃণ ভাবে রাজনীতি থেকে মুক্ত ক'রে নিলাম নিজেকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে কোনও জটিলতার সৃষ্টি হ'লো না, সৃষ্টি হ'লো না কোনও টানাপোড়েন, হ'লো না কারও সঙ্গে কোনও বিরোধ, মনোমালিন্য। এখনও পুরোনো সবার সঙ্গে সুন্দর মসৃণ সম্পর্ক আমার!
এখানে অলৌকিক রহস্য কোথায় জানি না। তবে দীর্ঘদিন পরে নিজেকে স্বাভাবিক ও হালকা বোধ হ'লো। এটাকে কি বলবো? মানসিক চিকিৎসা? জানি না। তবে তিনি যে বাকসিদ্ধ পুরুষ এবং তাঁর সাক্ষাৎ দর্শন, সঙ্গলাভ, পরামর্শ, উপদেশ, নির্দেশ গ্রহণ ও পালন সমস্যা সমাধানের ও মুক্তির উপায় তা বাস্তবভাবে অনুভূত হ'ওয়া শুরু হ'লো।
কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম পরবর্তী সময়ে, অন্যের মই হওয়া যত সহজ ও সম্ভব নিজের মই নিজে হওয়া ততটাই কঠিন ও অসম্ভব। কখনো কখনো মনে হয় অবাস্তবও!! এখানে দয়ালের দয়া, আচার্যদেবের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদ, পরামর্শ ছাড়া নিজের মই নিজে হওয়া এবং সমস্ত রকম কঠিন ভয়ংকর সমস্যা, রোগ এমনকি নিশ্চিত মৃত্যু থেকে মুক্ত হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। দয়ালের উপর বকলমা দিয়ে নিজের মই নিজে কি ক'রে হ'তে হয় আর বকলমাই বা কি ক'রে দিতে হয় তার আচার আচরণ স্বয়ং আচার্যদেব শিখিয়ে দেন। তাই তিনি আমার ও আমাদের আচার্যদেব।
ক্রমশঃ
Sunday, December 4, 2022
আমার প্রিয়জন!
আহ্বানঃ হে আমার প্রিয়জন,
একমুহুর্ত আর সময় নষ্ট ক'রো না। ভবিষ্যত সময় ভয়ঙ্কর! সমাজের সমস্ত নেতৃবৃন্দ, সমাজের এলিট সম্প্রদায়, সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত ও অর্থবলে বলীয়ান মানুষ নিজেদের ভবিষ্যত ও সন্তানদের ভবিষ্যত গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। নিজেদের দায় ছাড়া সমাজের প্রতি, সমাজের সাধারণ মানুষের প্রতি কোনও দায়, কারও প্রতি কোনও দায় তাদের কারও নেই। ভাঁড় মে যায় সমাজ, সভ্যতা, দেশ, দেশের আর্থিক ব্যবস্থা, শিক্ষা-শিল্প-ক্রীড়া ব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি সব ব্যবস্থা। নিজের আখের গুছিয়ে নাও এই দর্শনে এরা বিশ্বাসী সবাই।
এ অবস্থায় তুমি অসহায়, তোমার সন্তান ভবিষ্যত কঠিন ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে। তুমিও বাঁচবে না, তোমার সন্তানকেও চারপাশের নোংরা পরিবেশ থেকে বাঁচাতে পারবে না। ভবিষ্যত চারপাশের অস্থির পরিবেশে পাগল হ'য়ে যাবে তোমার শিশু। ভবিষ্যতে মৌমাছির মতো মৌ মানুষ হওয়ার পরিবর্তে গু'য়ে মাছির মতো গু'য়ে মানুষ হ'য়ে ঘরে ফিরে আসবে। সমাজের সমস্ত নোংরা ঘরে নিয়ে আসবে। সাবধান! ঘুমিয়ে থেকো না, উদাসীন থেকো না। তুমি ভালোমতোই জানো তোমার চারপাশে পরিবেশ, পরিস্থিতি কি। যদি বিয়ে ক'রে না থাকো তবে তোমার যদি ইচ্ছা হয় তবে তোমার জীবন নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করো কিছু বলার নেই। আর যদি সংসার জীবনে প্রবেশ ক'রে থাকো, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র থেকে থাকে আর পুত্র কন্যার ভবিষ্যতের জন্য একটুও কান্না থেকে থাকে তোমার বুকের মধ্যে তবে থমকে একটু দাঁড়াও। সব ভুলে যাও। নিজেকে পাল্টাও। সন্তানের জন্য, স্ত্রীর জন্য, স্বামীর জন্য সর্বোপরি তোমার ভবিষ্যত নিশ্চিন্ত জীবনের জন্য এক ও একমাত্র ভরসা, আশ্রয়স্থল ঠাকুরের দিকে মুখ ফেরাও। ফুল বেলপাতা ধুপ ধুনো দিয়ে চরণপুজা ভুলে যাও। নিজের ও তোমার সংসারে তোমার স্ত্রী, তোমার শিশু সন্তান প্রিয়জনের জীবনে ঠাকুরকে অভিভাবকের আসনে বসাও। তাঁর চরণপুজার পরিবর্তে তাঁর চলনপুজা করো ও তোমার শিশু সন্তানকে এখন থেকেই চলনপুজায় অভ্যস্ত করাও। জীবনে আদর্শ ধরিয়ে দাও। রক্তমাংস সংকুল জীবন্ত ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁর চরণে সন্তানকে বসাও। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন, "সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ যার উন্নতি হয় অবাধ তার।" আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার কথা স্মরণ করো আর চোখের জলে নিজেকে ভাসিয়ে সন্তানকে বলো, "আমারও অনেক ভুল হয়, তোরও ভুল হয় বাবা। সংসারে ঐ একমাত্র নির্ভুল মানুষ ঠাকুর। আমি তোর অভিভাবক নই। আমারও অভিভাবক, তোরও অভিভাবক দু'জনের অভিভাবক ঐ ঠাকুর।"
শোনো আমার প্রিয়জন, শোনো সন্তানের বাবা-মা!
ঠাকুরকে, ঠাকুরের বিধানকে জীবনে প্রধান ক'রে নাও। আর কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই পারলে অতি প্রত্যুষে প্রথমে নিজে কিছু খাওয়ার আগেই ইষ্টভৃতি করো অর্থাৎ তোমার ইষ্ট অর্থাৎ মঙ্গলকে ভরণ করো অর্থাৎ তাঁকে খেতে দাও। তুমি যা পারো তাই তাঁকে দাও। সন্তানকে পাশে বসিয়ে নিজের হাতে ইষ্টভৃতি করাও। উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে মনে মনে শুধু নাম করো ও সন্তানকে নাম করা শেখাও যে নাম পেয়েছো দীক্ষার সময়। নাম করার ও করাবার অভ্যাস করো ও করাও। ভুলে গেলে মনে পড়লেই করো। 'স্বতঃ অনুজ্ঞা' পাঠ করো ও করাও। স্বতঃ অনুজ্ঞা জানো তো? দীক্ষা নেবার সময় দীক্ষার কাগজে লেখা আছে 'স্বতঃ অনুজ্ঞা'। না জানলে দীক্ষিত কারো কাছ থেকে লেখা কাগজ চেয়ে নিও। আর না পেলে আমাকে ব'লো আমি লিখে দেবো কমেন্টের ঘরে। নিজে প্রতিদিন ভালোবেসে আগ্রহ সহকারে ইষ্টভৃতি করার আগে এবং যখনি সময় পাবে তখন অর্থ বুঝে 'স্বতঃ অনুজ্ঞা' পাঠ করলে, আবৃত্তি করলে দেখবে নিজের অজান্তে একদিন নিজের ভিতরে একটা শক্তি অনুভব করবে আর চরিত্র গড়ে যাবে।
বিশেষ ক'রে ছোটোবেলা থেকে শিশু যদি পাঠ করে 'স্বতঃ অনুজ্ঞা' তাহ'লে আর চিন্তা নেই শিশুর ভবিষ্যত জীবন, ভবিষ্যত চরিত্র গঠন নিয়ে। এক্কেবারে মোক্ষম জীবন তৈরী হ'য়ে যাবে তোমার ও তোমার সন্তানের। সমাজের কোনও শক্তি নেই তোমাকে, তোমার সন্তানকে বিপথে, ভুল পথে চালিত করে। এখন মোবাইলের যুগ, নেটের যুগ। কিছু পারো আর না পারো সকাল হ'লেই ঘরে নেটে চালিয়ে দাও ভোরের প্রার্থনা। আবার বিকেল বেলা চালিয়ে দাও বিকেলের প্রার্থনা। ছুটির দিনে অবশ্য অবশ্যই বাজুক ঠাকুরের প্রার্থনা, ঠাকুরের সুন্দর সুন্দর নোতুন নোতুন গান। বাজুক শ্রীশ্রীদাদার লেখা, আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার লেখা, শ্রীশ্রীঅবিনদাদার লেখা ও ঠাকুরবাড়ির শ্রদ্ধেয় অন্যান্য দাদাদের লেখা দুর্দান্ত দুর্দান্ত সব গান। সময় পেলেই অবসর সময়ে অন্য কিছু মোবাইলে না দেখে সবাই মিলে চা টিফিন খেতে খেতে আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার ভাষণগুলি শোনো। মন দিয়ে একটু ধৈর্য নিয়ে একটু কষ্ট ক'রে শোনো। নির্ঘাত ফল পাবে; গ্যারান্টি। পৃথিবীর কোথাও গেলে ঘরে বসে এমন বিপাক পথে হাত ধ'রে জীবনে চলার কায়দা ফোকটে পাবে না। তাই উদাসীন থেকো না, অবজ্ঞা অবহেলা ক'রো না শিশুর জীবন নিয়ে। তোমরা বাবা-মা ছাড়া এমন আপন, এমন বিশ্বাসযোগ্য, নির্ভরযোগ্য আশ্রয় শিশুর আর কেউ নেই এই বিশ্ব দুনিয়ায়।
আর, সময় পেলেই একটু ঠাকুরের কাছে বসো; ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলো কারণ ঠাকুর যে তোমার ঘরের অভিভাবক। যখনি যা খাবে তাঁকে নিবেদন ক'রে খাও। যেখানেই যাবে তাঁকে ব'লে যাও। যেখানেই সবাই মিলে ঘুরতে যাবে তাঁকে সঙ্গে ক'রে নিয়ে যাও কারণ তাঁরও বেড়াতে যেতে ইচ্ছা করে তোমাদের সঙ্গে। কি ক'রে নিয়ে যাবে? মনে মনে মাথায় ক'রে নিয়ে যাবে তাঁর দেওয়া বীজনাম। জেনে রাখো, নাম আর নামী অভেদ। ব্যস্ দেখবে শয়তানের বাবার ক্ষমতা হবে না তোমাকে, তোমার পরিবারকে স্পর্শ করার, মুখ তুলে তাকাবার। তাঁকে তোমাদের সকলের মাঝে জীবন্ত রাখো।
হে আমার প্রিয়জন। দেখবে তাঁর দয়ায় অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি সব না চাইতেই পাবে। ভুতের মতো কে যেন তোমাকে যুগিয়ে দেবে সব তোমার প্রয়োজনের সময়ে। বিশ্বাস করো আমার কথা। সন্তানের ভবিষ্যত উন্নত সুন্দর নিষ্কণ্টক বিপদমুক্ত জীবন দেখে তোমার চোখ জলে ভরে যাবে। শেষ বয়সে উপলব্ধি হবে দয়ালের উপস্থিতি।




