Powered By Blogger

Friday, September 23, 2022

প্রবন্ধঃ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর: ৭

জানা, লেখনী শক্তি ও সত্য!

আমাকে প্রশ্নকর্তারা লিখেছেন, "আমি কত জানি! প্রবল লেখনী শক্তি! অথচ প্রকৃত সত্য স্বীকার করতে পারছি না।" 

এর উত্তরে তাদের জানাই যে, আপনি/আপনারা আমার জানা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে পারেন, প্রবল লেখনী শক্তিকে হিংসা করতে পারেন কিন্তু প্রকৃত সত্যের কথা স্বীকার করার কথা বলেছেন সেই প্রশ্ন আপনাদেরও আমি করছি,

১) আপনি/আপনারা প্রকৃত সত্য জানেন? 

২) কত সালে আপনার/ আপনাদের জন্ম হ'য়েছিল?

৩) জন্মাবার পর কত সালে কত বছর বয়সে আপনাদের দীক্ষা হয়েছিল?

৪) আপনারা ঠাকুরকে দেখেছেন?

৫) আপনারা শ্রীশ্রীবড়দাকে দেখেছেন?

৬) আপনারা শ্রীশ্রীকাজল দাদাকে দেখেছেন?

৭) শ্রীশ্রীকাজল দাদার সঙ্গে কথা বলেছেন কখনো? 

৮) আপনি/আপনারা কি জানেন শ্রীশ্রীঠাকুর দেহ রাখার পর কে বা কারা শ্রীশ্রীবড়দার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যে ও অপরিপক্ক অদূরদর্শী দৃষ্টি নিয়ে অভিযোগের লিফলেট ছেপে বিলি করেছিল?

৯) কি ছিল সেই লিফলেটে তা কি আপনি/আপনারা জানেন?

১০) আপনারা আদৌ কি জানেন শ্রীশ্রীবড়দার বিরুদ্ধে অন্যায় লিফলেট ছেপে বিলি হয়েছিল সৎসঙ্গ জগতে সৎসঙ্গীদের কাছে?

১১) সৎসঙ্গ জগতে এমন কাজ ঠাকুর কোনোদিন কল্পনাতেও ভেবেছিলেন?

১২) প্রকাশ্যে পরম প্রেমময়ের পতাকার তলায় এমন ঘৃণ্য কাজ, ঠাকুরের অপছন্দ যা সেই পদক্ষেপ গ্রহণের বিরুদ্ধে শ্রীশ্রীবড়দা কি কোনও ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কোনও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

তারা কবিগুরুর কথা টেনে এনেছেন! লিখেছেন সত্য স্বীকার করার জন্য চাই সাহস ও অনাসক্তি।

আমার প্রশ্ন তাদের:

১) কবিগুরুর কথামত আপনার/আপনাদের আছে তো প্রকৃত সত্যকে জানার ও স্বীকার করার মত সাহস ও অনাসক্তি?

২) মিথ্যেকে সত্য ব'লে জেনে প্রকৃত সত্য থেকে এতদিন বঞ্চিত হননি তো?

৩) প্রকৃত সত্য জানার পর মাথা ঠিক রাখতে পারবেন তো? অন্যদের মত পাগল হ'য়ে যাবেন নাতো?

এর থেকে না জানাই ভালো। আপনারা যা জানেন তাই-ই নিয়েই থাকুন! সুখে থাকুন, ভালো থাকুন! অহেতুক চুলকে ঘা করবেন না! বরং নিজের বিবেকের আয়নায় দেখুন সাহস ও অনাসক্তি কোনটা আপনাদের আছে! নইলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে! আর যে বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে ঠাকুর আত্মজদের বিরুদ্ধে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে অন্যের মুখে ঝাল খেয়ে বিরোধীতার পাপ কাজ করেছেন সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হ'য়ে গিয়ে মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটতে পারে! সাধু সাবধান! ইচ্ছে করলেই ঠাকুর বাড়ি তা করতে পারতো! সেই শিক্ষা শ্রীশ্রীবড়দা দেননি, দেন না আচার্যদেব শ্রীশ্রীদাদা, কোটিকোটি সৎসঙ্গীদের প্রেরণাদাতা শ্রীশ্রীবাবাইদাদা, লক্ষ লক্ষ ইয়ং জেনারেশনের আইডল শ্রীশ্রীঅবিনদাদা ও অন্যান্য পূজনীয় দাদারা!

ক্রমশ: 

এরপরে পরবর্তী প্রশ্ন।

(লেখা ২৩শে সেপ্টেম্বর'২০১৯)


প্রবন্ধঃ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর।

কয়েকজন অজানা ছদ্মনামধারী ও নাম-পরিচয় ও ছবিহীন মানুষ আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন! তাদের করা প্রশ্নগুলি পড়লাম। প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার আগে তাদের কয়েকটা প্রশ্ন করে নিয়ে তারপরে প্রশ্নগুলির উত্তর দেবো। 

হে ছদ্মনামধারী! হে নাম-পরিচয় ও ছবিহীন জীব! 

আপনি কে? আপনারা কারা?  আপনাদের কারও অদ্ভুত নাম, কারও বা নাম আছে অথচ ছবি নেই এইরকম অদ্ভুত কিছু মানুষ আমার সঙ্গে কথা বলছেন!? আপনার/ আপনাদের পরিচয় কি!? বিনা পরিচিত রহস্যময় আনজান কারও সঙ্গে কোনও ভদ্রলোক কথা বলে!? না বলবে!? নাম লুকিয়ে কথা বলছেন কেন!? আপনি/আপনারা কে তা না আপনার/আপনাদের ছবি আছে, না নাম আছে; কোনও কিছু দিয়েই আপনাকে/আপনাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না! তা কিসের ভয়ে মুখ লুকিয়ে, নাম লুকিয়ে সত্য রক্ষার লড়াইয়ে নেবেছেন!? কিসের ভয়ে নাম উহ্য রেখে একটা অদ্ভুত হাস্যকর বিকৃত নাম ব্যবহার করে শ্রীশ্রীঠাকুরকে অবিকৃত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন আমাকে!? আপনারা যারা মূল কেন্দ্র বিরোধী লড়াইয়ে নেবেছেন, আপনারা যারা শ্রীশ্রীবড়দাকে, শ্রীশ্রীবড়দা পরিবারকে কলঙ্কিত করার মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, আপনারা যারা মানুষ নামের কলঙ্ক একশ্রেণীর অদিক্ষিতদের মাঝে ঠাকুরকে কলঙ্কিত করার জন্য ঘৃণ্য, নোংরা, অশ্লীল শব্দাবলীর হাতিয়ার তুলে দিচ্ছেন, ঠাকুরকে ও ঠাকুরের জীবন দর্শনকে, ঠাকুরের মিশনকে বলাৎকার করার জন্য তাদের জন্য ফুলের বিছানা বিছিয়ে দিয়েছেন ও দিচ্ছেন আপনাদের পূর্বপুরুষদের হাত ধ'রে ৫০বছর ধ'রে ঠাকুরের দেহ রাখার কিছুদিন আগে থেকে ও দেহ রাখার অব্যবহৃত পরে পরেই আর ফেসবুককে করেছেন এর জন্য হাতিয়ার তা সেই আপনারা শ্রীশ্রীঠাকুরকে অবিকৃত রাখার লড়াইয়ে নামা বীরপুঙ্গবরা  নারীপুরুষ সবাই মুখ লুকিয়ে রাখেন কেন!? কিসের ভয়ে এমন করেন!? কি সেই দুঃস্বপ্ন যার জন্য আপনারা সবাই এমন আচরণ করেন!? এটা কি আপনাদের পথপ্রদর্শকদের নির্দেশ, স্ট্র্যাটেজি!? এই স্ট্র্যাটেজি, এই নির্দেশ কার বা কাদের!? আপনাদের পথপ্রদর্শক শ্রদ্ধেয় দাদারা নাকি তাদের পরবর্তী শ্রদ্ধেয় বংশধরদের!? তাঁরা কি আদৌ জানেন আপনাদের এই কুকর্ম, কুকীর্তি!? তাঁদের চোখে কি পড়ে এই পাপ প্রবৃত্তি, ঘৃণ্য পদক্ষেপ!? 

এর পরে আপনার/আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেবো। একটু অপেক্ষা করুন।

ক্রমশ:

(লেখা ২৩শে সেপ্টেম্বর' ২০১৯)

কবিতাঃ কষ্ট পাচ্ছো মনে।

বন্ধু! কষ্ট পাচ্ছো মনে।
রণে, বনে, জলে জঙ্গলে যেথায় যাচ্ছো
সেথায় পড়ছো মারা ধনে প্রাণে জনে!
তবুও দেখছো না ভেবে একবারও
ঘটছে কেন এমন এবং কি কারণে!?
বন্ধু! কষ্ট পাচ্ছো মনে।
বন্ধু! যা করছো তুমি আর ভাবছো মনে মনে
সকাল থেকে রাত আর রাত থেকে সকাল
জীবন মাঝে সংসার কিম্বা নিজের তরে
দেখেছো কি তলিয়ে তাতে পাপপুণ্য
কতটা আছে ভরে? বন্ধু! কষ্ট পাচ্ছো মনে।
বন্ধু! সকাল হ'লেই চোখ খুলেই করছো আঘাত
আর দিচ্ছো ব্যাঘাত সবার সব কাজে
জনে জনে প্রতিক্ষণে পিছন থেকে
মারছো কাঁচি মরি বাঁচি কাঁকড়া চরিত্র হ'য়ে!
দিন শেষে রাত্রি হ'লে পরে ঘরের কোণে
বালিশে মুখ গুঁজে থাকো বিছানায় প'ড়ে
ঘুম আসে না চোখে কাঁপছ শুধু ভয়ে!
কেন? কেন বন্ধু ভিতরে ভিতরে যাচ্ছো শুধু ক্ষয়ে!?
বন্ধু! এর পরেও তোমায় বন্ধু ভেবে চলছে যে
তোমায় সয়ে বয়ে মাথায় তোমায় নিয়ে
তার বুকেতে মারছো লাথি যে করেছে তোমায় সাথী
চলার পথে ভুলে গিয়ে তোমার করা অপমানকে!
ভেবে দেখেছো কি আর কি রইলো বাকী?
চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ শেষে মানুষ হ'য়ে এসে
বেলা শেষে জমার ঘরে রইলো 
শুধু ফাঁকি, ফাঁকি আর ফাঁকি!
কি নিয়ে আর কাটাবে বাকি জীবন তোমার বন্ধু!?
অস্তাচলে যাচ্ছে জীবন সূর্য 
তবুও নেপোয় মারে দই-এর মত বন্ধু 
চার্বাক তত্ত্বে হ'য়ে মত্ত
খাচ্ছো ঘি ক'রে এন্তার কর্জ!
চোখ বুঝে আছো সদাই পাপের ঘড়া হচ্ছে ভারী
তবুও হচ্ছে না হুঁশ এমন বেহুশ বোধহীন তুমি আনাড়ি!
তাই তো বলি বন্ধু! কষ্ট পেও না মনে
আর থেকো না অসুস্থ মনের স্যাঁতসেঁতে ঘরের কোণে।
এসো, এসো বন্ধু কুয়োর আকাশ ছেড়ে
দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ তলে!
যেথা পেঁজা তুলোর মত স্বপ্নের মেঘেরা যায় উড়ে উড়ে
দয়াল ধামের বার্তা নিয়ে তোমার তরে আসে ফিরে ফিরে!!
এসো বন্ধু! এসো ফিরে! আপন নীড়ে!

(লেখা ২৩শে সেপ্টেম্বর '২০২১)

Saturday, September 17, 2022

প্রবন্ধঃ কয়েকটি জিজ্ঞাস্যর উত্তর।

ক'দিন ধ'রে অনেকেই জানতে চাইছে ফোনে, ওয়াটস আপে একটা বিষয়। বিষয়টা ফেসবুক ঘিরে। ফেসবুকে কিছুদিন ধ'রেই সৎসঙ্গীদের একাংশ পোষ্ট ক'রে চলেছে এমন কিছু কিছু বিষয় যা নিয়ে নতুন ক'রে শুরু হয়েছে বিতর্ক। 

বিষয় আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদা ও পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীঅবিনদাদাকে নিয়ে। 

পোষ্টগুলিতে আচার্যদেবের ফটো দিয়ে ক্যাপশনে বলা হচ্ছে "পরম পুরুষোত্তম নররূপী নারায়ণ, জীব উদ্ধারে দয়া ক'রে প্রভু দেন দরশন" ইত্যাদি। আর এগুলি যারা করছে তাদের মধ্যে অনেক পাঞ্জাধারী ও স্বস্ত্যয়নীধারী গুরুভাইও আছেন। আর এগুলোর প্রভাব পড়ছে ইয়ং জেনারেশনের ওপর। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই ধরণের পোষ্ট যারা করছে বা যারা শ্রদ্ধেয় দাদাদের নিয়ে ঠাকুর সমকক্ষ ধারণা পোষণ করেন এবং তা প্রচার ক'রে বেড়ান তারাও আবার সবাই ইয়ং জেনারেশন অন্তর্ভুক্ত। ফলে বিতর্ক তুঙ্গে ও ইয়ং জেনারেশন দ্বিধাবিভক্ত। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ঠাকুরবাড়ি ও পূজনীয় দাদাদের থেকে অনেক দূরে অবস্থানরত। ফলে আজকের যারা ফাস্ট জেনারেশন তারা বিশেষ ক'রে যারা নবাগত ও ইষ্টপ্রাণ তারা প্রবীণ সৎসঙ্গীদের বিশেষ ক'রে পাঞ্জাধারী ও স্বস্ত্যয়নীধারী সৎসঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হন এবং তাদের প্রায় দেবতার আসনে বসিয়ে তাদের কথার স্রোতে ভেসে গিয়ে পক্ষ বিপক্ষ রঙে রাঙিয়ে উঠছে আর তার ফলে যা ক্ষতি হওয়ার হ'য়ে যাচ্ছে। আর এ হ'য়ে এসেছে শ্রীশ্রীবড়দা আমল থেকে। 

আমাকে যারা বিভিন্ন সময় এই সম্পর্কে জানতে চেয়ে মেসেজ করে বা ফোন করে তাদের চেষ্টা করি আমার বোধ অনুযায়ী বোঝাবার যা আজ আর্টিকেল হিসেবে এখানে তুলে ধরলাম তাদেরই অনুরোধে যাতে আরও অনেকের এই সম্পর্কে ধারণা ক্লিয়ার হয়। তাদের যা বলেছি তা হ'লো, 

'তোমার বা তোমাদের কি মনে হয় স্বস্ত্যয়নী নিলেই সে কেউকেটা হ'য়ে গেছে? তুমি বা তোমরা কি মনে করো আমরা যারা স্বস্ত্যয়নীধারী তারা সবাই নিখুঁত স্বস্ত্যয়নী পালন করি? তোমার কি মনে হয় আমরা সবাই স্বস্ত্যয়নীর পাঁচটি নীতি পালন করি? আমাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখো তো আমাদের চেহারায় স্বস্ত্যয়নীর প্রথম নীতি ফুটে ওঠে কিনা! অন্য চারটি নীতি বাদ দিলাম। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।  আর ব্যতিক্রম অবশ্যই ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম আছে বলেই সৎসঙ্গ জগৎ আজ ফুলে ফুলে বিকশিত।  আবার চেহারায় সৌন্দর্য প্রকাশ পেলেও আচরণ ১৮০ ডিগ্রী উল্টো।  আর ঋত্বিক, যাজক, অধ্ব্যর্যু সম্পর্কে যা বলা আছে ঋত্বিক বইয়ে তার সঙ্গে কি এদের জীবনের মিল খায়? এখনও পর্যন্ত সৎসঙ্গীরা তো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে এবং নেয়। এমনকি বহু ঋত্বিক পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম নেয়; তাও আবার সৎসঙ্গে ব'সে ঠাকুরের সামনে! এবারের রাজ্য ভিত্তিক দেওঘরে যে কর্মী সম্মেলন হ'লো ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত সেখানে প্রতিদিন সকাল ৯টায় আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার সামনে রাজ্যের ঋত্বিক, যাজক ইত্যাদি কর্মীদের জমায়েত হ'তো। আচার্যদেব তাদের সামনে বক্তব্য রাখতেন। তারপর আনন্দবাজারের বিল্ডিংয়ে হ'তো মেইন মিটিং তিনটের সময়। সেখানে শ্রীশ্রীঅবিনদাদা উপস্থিত থাকতেন। ১২ তারিখ সম্ভবত ছিল আসামের দিন। পরদিন ছিল বিহারের। সেখানে কর্মীদের উদ্দেশ্যে আচার্যদেবের বক্তব্য উপস্থিত যেসব কর্মীরা শুনেছে তারা সম্ভবত আর মুখ খুলতে সাহস পাবে না। প্রতিদিনই আচার্যদেব কর্মীদের সামনে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করতেন। 

যাই হ'ক, এবার আসি অন্য কথায়। পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীঅবিনদাদার ফটো সৎসঙ্গে রাখা বা আসনে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ও উঠতেই পারে। আচার্যদেব শ্রীশ্রীদাদার সময়ও সৎসঙ্গে শ্রীশ্রীবাবাইদাদার ফটো রাখা নিয়ে বিতর্ক তৈরী হয়েছিল। এমনকি কোনও কোনও সৎসঙ্গে শ্রীশ্রীবাবাইদাদার ফটো সৎসঙ্গে সাজানো আসন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং দৃষ্টিকটুভাবে তা করেছিল ঋত্বিক, যাজক মিলিতভাবে।  এই তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমার আছে। আর আজ তারাই আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার সামনে ভক্তিতে গদগদ!!!!! তাই ঋত্বিক ব'লে আলাদা ভাবার কিছু নেই। তাদের আলাদা ট্রিটমেন্ট দেওয়ার কিছু নেই। তাদের আর সাধারণ সৎসঙ্গীদের মধ্যে ছোটো বড়োর বিভাজনের রেখা টানার কিছু নেই। সম্মান শ্রদ্ধা আলাদা বিষয় আর ঠাকুরের দরবারে দীক্ষিতদের মধ্যে কাউকে ছোটো আর কাউকে বড়ো ভাবা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাদের সম্মান করবো, শ্রদ্ধা করবো, প্রয়োজন হ'লে সামর্থানুযায়ী তাদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নেব কিন্তু সৎসঙ্গে কেউই বড় নয়, কেউ ছোটো নয়। সম্ভবত যারা ১২ তারিখ উপস্থিত ছিলেন সেদিন আচার্যদেবের বলা "ঠাকুরের সামনে আমরা ঋত্বিক, যাজক, অধ্ব্যর্যু ও সাধারণ সৎসঙ্গী সবাই এক এবং একসঙ্গে ওঠা, বসা, খাওয়া ইত্যাদি পালনে একত্ববোধ জেগে ওঠে" ইত্যাদি এই এক ও একত্ববোধ সম্পর্কে তার বলা প্রতিদিনই যারা শুনেছে তারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি।

যারা দীক্ষিত গুরুভাইবোনেদের মধ্যে ছোটো বড় বিশেষ বিভাজনের রেখা টানেন এবং যারা পাঞ্জাধারী ও স্বস্ত্যয়নীধারী হওয়ার কারণে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসতে চান সাধারণ সৎসঙ্গীদের মাঝে, বাড়িতে, মন্দিরে তারা কেউই পাকা সৎসঙ্গী নয়। এমনও দেখেছি মন্দিরে এবং বহু বাড়িতে সৎসঙ্গে ভান্ডারার প্রসাদ গ্রহণে স্বস্ত্যয়নী যারা তাদের আলাদা প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থা আর সাধারণ দীক্ষিতদের আলাদা ব্যবস্থা। এরা সবাই কার্বাইড পাকা। গাছ পাকা নয়। গাছ পাকা ফলের আলাদা রঙ, আলাদা স্বাদ, আলাদা মিষ্টি, আলাদা গন্ধ, আলাদা রূপ!!!!  আর কার্বাইড পাকা ফল দেখলেই বোঝা যায়, চেনা যায়। উপলব্ধিবান, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জ্ঞানী মানুষ মাত্রেই এই তফাৎ ধরতে পারে। হয়তো সাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় কার্বাইড পাকারা কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না; ডাষ্টবিনই হয় এদের শেষ আশ্রয়। এদের শেষের সেদিন ভয়ংকর। 

ঠাকুর বলেছেন, "যেভাবে জীবন বলী দেবে তেমনই জীবন লাভ করবে।" যার যেমন করা, যতটুকু করা ঠাকুরের বলা অনুযায়ী নিখুঁতভাবে তার ততটুকুই অনুভূতি, ততটুকুই জ্ঞান। এদের ভক্তি অতিভক্তি, আবেগতাড়িত লাগামছাড়া বেসামাল ভক্তি। ভক্তির আতিশয্যে এরা মূলের সঙ্গে অন্যের তফাৎ হারিয়ে ফেলে। একধরনের ভক্তি আছে তা হ'লো ব্যাভিচারী ভক্তি। এরা ভারসাম্যহীন। এরা প্রকৃতপক্ষে কাউকেই ভালোবাসে না। না মূলকে ভালোবাসে, না ডালপালাকে ভালোবাসে। এরা নিজের বৃত্তি-প্রবৃত্তিকে ভালোবাসে। যেখানে যে কথায় এদের বৃত্তি প্রবৃত্তি পোষণ পায় সেখানে এরা ভক্তি শ্রদ্ধা ভালোবাসার ব্যাপারে একেবারে পাকা সোনা যেখানে বৃত্তি প্রবৃত্তি পোষণ পায় না সেখানে এরা খড়্গহস্ত।  তখন তারা ঠাকুরের কথাতেও পালটা যুক্তি দেখায়। এটা আর কিছুই নয় প্রকৃত সাধনার অভাব। যদি এরা ঠাকুরের গ্রন্থ পড়ে থাকে তাহ'লে হয় এরা বই পড়া সাধু। বই পড়ে বই হ'য়ে গেছে; বইয়ের মূল এসেন্সকে এরা গ্রহণ করতে পারেনি। নয়তো কয়েকটা বই পড়ে কিম্বা অন্যের মুখে ঝাল খেয়ে খেয়ে পরোক্ষ আধা জ্ঞানের অধিকারী হ'য়ে অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী হ'য়ে বসেছে সৎসঙ্গ জগতে। কিচ্ছু করার নেই। ঠিক তেমনি প্রকৃত ভক্তের বিভ্রান্ত হওয়ারও কিচ্ছু নেই। মাথায় রেখো এটা ঘোর কলি যুগ। সামনে আরও আরও ভয়ঙ্কর দিন আসছে। সেদিন তুমি আমি থাকবো না কিম্বা নতুনভাবে জন্ম নিয়ে আসবো ঐ ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে জ্বলেপুড়ে মরার জন্য। তাই সাবধান!  যা তৈরী হওয়ার নীরবে তৈরী হও পরবর্তী দিনগুলো ও পরবর্তী জন্মের জন্য। 

আর, প্রকৃত ভক্ত মাত্রেই ভগবান। যার ভজনা করা যায় সেই ভগবান। তুমি আমিও ভগবান হ'তে পারি। সাধনার উচ্চমার্গে পৌঁছে যদি যেতে পারো তাহ'লে তোমার মধ্যে যে ভগবানত্ব প্রকাশ পাবে তাতে তোমারও ভজনা করা যেতে পারে। বৃদ্ধির রাস্তা সবার জন্য খোলা আছে। তবে উত্তরণের জন্য, উন্নয়নের জন্য একটু পূর্ব সংস্কার কাজ করে, সাহায্য করে। যেমন শ্রীশ্রীবাবাইদাদা, শ্রীশ্রীঅবিনদাদা এরা জন্মগতভাবে উচ্চমার্গের পুরুষ, ঈশ্বরকোটি পুরুষ। তাই সেই অর্থে এরা ভগবান।

পুরুষোত্তম আর ভগবান শব্দের মধ্যে আসমানজমিন ফারাক আছে, যেমন ফারাক আছে সর্বজ্ঞ আর অন্তর্যামী শব্দের মধ্যে। যেমন পরমপিতা আর পিতা শব্দের মধ্যে তফাৎ পায় আমরা। যেমন স্পষ্ট তফাৎ বোঝা যায় স্রষ্টা আর আবিষ্কর্তার মধ্যে। যেমন আমরা তফাৎ পায় সদগুরু আর গুরুর মধ্যে। 

যাই হ'ক পাঠক এবার তুমি নিজেই বুঝে নাও কে পুরুষোত্তম আর কেইবা ভগবান। কে সর্বজ্ঞ আর কে অন্তর্যামী তাও বুঝতে পারবে সহজেই। সর্ব্বজ্ঞ অর্থাৎ যিনি সব জানেন আর অন্তর্যামী অর্থাৎ যিনি অন্তরের কথা জানেন। অন্যের অন্তরের কথা তুমি একটু যত্নশীল হ'লেই জানতে পারবে। মা যেমন সন্তানের অন্তরের কথা বুঝতে পারে মাতৃত্বের স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু এই জগতের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-এর ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান সব জানেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা পুরুষোত্তম আর তিনিই তাই সর্বজ্ঞ। এছাড়া আর কেউই সর্ব্বজ্ঞ হ'তে পারে না, অন্তর্যামী হ'তে পারে। ঠিক তেমনি আমরা জাগতিক সবাই পিতা, পরমপিতা ন'ই। আবার আমরা আবিষ্কর্তা হ'তে পারি কিন্তু স্রষ্টা ন'ই। যেমন গুরু হ'তে পারি কিন্তু সদগুরু ন'ই। যদিও ঠাকুর গুরু হ'তেও বারণ করেছেন; বলেছেন গুরুমুখ হও। 

আবার ভালোবাসা এমন জিনিস অনেক সময় নিজের অজান্তে ভারসাম্য হারিয়ে যায়। যারা ঠাকুরকে দেখেনি, ঠাকুরের  ভালোবাসার কথা, দয়ার কথা, অন্তহীন অফুরন্ত জ্ঞানের কথা জেনেছে, পড়েছে, পড়ার মধ্যে দিয়ে ঠাকুরের প্রতিটি মুহূর্তের চলা, বলা, ওঠা, বসা, হাসি, কথা, চাউনি, হাত ও হাতের আঙুল নাড়ানোর ভঙ্গি ইত্যাদি অনুভব ক'রে মনের মণিকোঠায় সযত্নে আগলে রেখেছে তারা দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটাবার মতো ঠাকুরের বংশধরদের মধ্যে ঠাকুরের সেই ঝলক দেখতে পায়! আবার ঠাকুর ধরাও দেন বংশধরদের মধ্যে। যেমন সূর্য আর সূর্যের কিরণ! আমরা বর্ষার সময় গাছপালার দিকে তাকালেই ব্যাপারটা পরিস্কার বুঝতে পারবো। গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়ি বা মন্দিরে বৃষ্টি হ'য়ে যাওয়ার পরে যদি ঘুরে দেখি কি দেখতে পাবো? দেখতে পাবো, বৃষ্টি থেমে গেছে। বৃষ্টির জলে স্নান ক'রে আনন্দে হাসছে চারপাশের গাছগাছালি। বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে সর্বাঙ্গের ধুলিকনা। পরিস্কার চকচক করছে গাছের ছোটোবড় পাতা। বৃষ্টিস্নাত পাতার উপরে এসে পড়েছে সূর্যের আলো। বৃষ্টিস্নাত আলো ঝলমলে গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়ি বা মন্দির সংলগ্ন বাগানকে যেন মনে হয় এক মায়াময় স্বপ্নপুরী। বৃষ্টির জলে ভেজা চারিদিকের গাছগাছালিতে ঘেরা আলোছায়াময় পরিবেশে ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়বে গাছের পাতা থেকে ঝ'রে পড়ছে টুপটুপ ক'রে জলের ফোটা। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টি  পড়ছে। না, তা নয়; আসলে গাছের নীচে বৃষ্টি পরে পড়ে। সেইখানে হঠাৎ যদি চোখে পড়ে দেখতে পাবে গাছগাছালির পাতার ভিড়ে কোথা থেকে যেন ছিটকে আসছে সূর্যের তীক্ষ্ণ আলো! এগিয়ে গিয়ে দেখো দেখতে পাবে চিকচিক করছে হাজারো পাতার ভিড়ে একটা পাতা! কি আছে সে পাতায়!? গাছের হাজারো ডালপালার মাঝে মাথা গলিয়ে যদি আলোয় ঝিলমিল সেই পাতার কাছে যাও দেখবে, সেই আলো ঝলমলে পরিষ্কার পাতার ওপর রয়েছে একফোঁটা জল আর সেই জলকণার ওপর এসে পড়েছে ডালপালার হাজারো পাতার  ফাঁক দিয়ে গলে আসা সূর্যের তীক্ষ্ণ আলো! কি অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য!  মাথার ওপরে আকাশের সূর্যটা গোটা নেবে এসেছে তার সমস্ত ঐশ্বর্য, সমস্ত শক্তি নিয়ে ঐ ছোট্ট জলকণার ওপর!! আর সেখান থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে আলোর জ্যোতি!!!!! ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশের হাজারো পাতার ওপর! কি অপূর্ব দৃশ্য! হাতের মুঠোয় সূর্য!? চোখের সামনে সূর্য!? এও কি সম্ভব!? ইচ্ছে করলেই ধরতে পারি! কিন্তু না বন্ধু! এ ধরার নয়। এ যে চেয়ে চেয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখার বিষয়! নিবিষ্ট মনে অনুভবের বিষয়! ভালো ক'রে যদি দেখো বন্ধু দেখতে পাবে ঐ ছোট্ট জলকণার মধ্যে যে সূর্য দেখতে পাচ্ছো তার মধ্যে দেখো সূর্যের সাত সাতটা রঙের কি অদ্ভুত মনোরম খেলা! ছিটকে আসছে সাত সাতটা রঙ! ঐ ছোট্ট পাতা তার ছোট্ট শরীর দিয়ে ধ'রে রেখেছে আকাশের ঐ বিশাল সূর্যকে! কে বলে সূর্য মর্ত্যে নেবে আসে না? যে দেখার দেখতে পায়। যার নির্মল স্বচ্ছ চোখ আছে, আছে নোংরা মুক্ত পরিস্কার ঝকঝকে মন, আছে পবিত্র হৃদয় সে পাবে দেখতে ঐ ছোট্ট জলকণার মধ্যে সূর্যের জীবন্ত উপস্থিতি, দেখতে পাবে সূর্য অবস্থান করছে তার সম্পূর্ণতা নিয়ে ঐ ছোট্ট জলকণার মধ্যে! ঐ যে ঠাকুর বলতেন, "আজও লীলা করে গৌড়চাঁদ রায়, কোনও কোনও ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।" 

গাছগাছালির মনোরম পরিবেশে আলোছায়াময় হাজারো পাতার ভিড়ে ঐ বৃষ্টিস্নাত ঝলমলে পাতার ওপর আলোময়, রূপময় ছোট্ট ঐ জলকণা হ'লো সৎসঙ্গের বর্তমান আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদা!!!!শ্রীশ্রীআচার্যদেবের মুখের দিকে তাকালেই দেখতে পাবে এর সত্যতা! শ্রীশ্রীঠাকুর অবস্থান করছেন আচার্যদেবের সর্বাঙ্গে! কথায়, বার্তায়, চলনে, বলনে, চাউনিতে, শরীরী ভাষায়, অঙ্গুলি হেলনে ইত্যাদি প্রতি মুহূর্তে! সূর্য আর সূর্যের যেমন কিরণ! ঠিক তেমনি শ্রীশ্রীঠাকুর আর আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদা!  শ্রীশ্রীঠাকুর পূর্ণমাত্রায় পূর্ণশক্তি নিয়ে অবস্থান করছেন আচার্যদেবের ভিতর কিন্তু আচার্যদেব জানেন তিনি শ্রীশ্রীঠাকুর নন। আমরা যে যাই ভাবি না কেন তাকে নিয়ের তিনি কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অটল, অচ্যুত এবং তা প্রতি মুহূর্তে প্রকাশিত হয় তার প্রতিদিনের কথায়। কিন্তু আমরা যারা শ্রীশ্রীঠাকুরকে দেখিনি বা যারা শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গ করেছি তারাও ঠাকুরকে পূর্ণমাত্রায় অনুভব করি আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার ভিতর। সেইজন্যই আচার্য পরম্পরা!!!!!!

যাই হ'ক বন্ধু আমার! পাঠক আমার! এদের কথায় যারা উপরিউক্তভাবে আচার্দেবকে সম্বোধন করে বা প্রচার করে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। বিরক্ত হ'তে পারো বন্ধু কিন্তু রাগারাগি ক'রো না। পারলে বিরক্তও হ'য়ো না। কারণ রাগ, বিরক্তি সাধনার অন্তরায়। তোমারি ক্ষতি।

আজ এই পর্যন্ত।  আবার পরে কথা হবে।

প্রবি।

Monday, September 12, 2022

প্রবন্ধঃ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর!। প্রশ্ন (৬)

স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার!

ফেসবুকের বিভিন্ন পোষ্টে যখন মানুষ নামের একশ্রেণীর অদ্ভুত জীব The greatest phenomenon of the world SriSri Thakur Anukul Chandra-এর নামে কুৎসার অভিধান খুলে বসেছে ঠাকুরকে বাজারী ক'রে ছেড়ে দেবার জন্যে তখন অবাক লাগে, ভেবে কষ্ট হয় এরা সবাই বাঙালি! আবার এদের মধ্যে স্বঘোষিত সৎসঙ্গীও আছে যারা শ্রীশ্রীঠাকুরকে রক্ষা করার নামে শ্রীশ্রীঠাকুরের পরম ভক্ত সেজে শ্রীশ্রীঠাকুরের পরমপ্রিয়, তাঁর আদরের প্রথম সন্তান বড়খোকা, এ যুগের হনুমান, অর্জুন, নিত্যানন্দ, বিবেকানন্দ এবং সৎসঙ্গ জগতের কোটি কোটি সৎসঙ্গীদের চোখের মণি শ্রীশ্রীবড়দা ও তাঁর পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন অন্তহীন গালাগালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে! আর  এরাও সবাই বাঙালী!!!!!!!! আর এই সুযোগে হা রে রে ক'রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সুযোগসন্ধানী ওই মানুষ নামের একশ্রেণীর অদিক্ষিত অদ্ভুত বাঙালি জনসমাজ সুসজ্জিত ধারালো গালাগালির অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে! 

এখন এইসমস্ত স্বঘোষিত মূল কেন্দ্র বিরোধী সৎসঙ্গীদের কুৎসার জবাবে কলম ধরলেই কিছু বিকেন্দ্রিক সৎসঙ্গী (?) ক্ষিপ্ত হ'য়ে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলছে, আপনার কলমের শক্তি আছে ব'লে সেই প্রবল শক্তি দিয়ে আমাদের স্বাধীন মত প্রকাশ করা থেকে দাবিয়ে রাখবেন? ভুলে যাবেন না ভারতবর্ষে সব মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের সমান অধিকার আছে।

আমি বললাম, ভারতবর্ষে সব মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের সমান অধিকার আছে ব'লে বুক বাজিয়ে লিখেছেন! তা সেই স্বাধীন মত প্রকাশের সমান অধিকারটা কি বলতে পারেন!? কি সেই স্বাধীনতা? কিসের স্বাধীনতা? মত প্রকাশের নামে কুৎসিত ভাষায় ব্যক্তিবিশেষের উদ্দেশ্যে গালাগাল স্বাধীনতা!? অশ্লীল অশ্রাব্য কুশ্রাব্য ভাষায়, ভাগারের মরা পচা গলা  দুর্গন্ধযুক্ত বাতাসে ভেসে বেড়ানো মারণ জীবাণুর মত নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার স্বাধীনতা!? পায়খানার ডাব্বার ভোটকা গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার মত নরককুলের ভাষা প্রয়োগের নাম মত প্রকাশের স্বাধীনতা!? হ্যাঁ সেই স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আছে বলেই আজ কথার আতংকবাদীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে! মত প্রকাশের অধিকার আছে ব'লেই সেই মত লাগামছাড়া উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল হ'য়ে জীবন বিধ্বংসী কামান হ'য়ে উঠবে!? মারণ বোম হ'য়ে তা হামলে পড়বে সমাজ-সভ্যতার উপর!? মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে বলেই এক সম্প্রদায় আর এক সম্প্রদায়ের ধর্ম, বিশ্বাস, ভাবাবেগের উপর খুল্লমখুল্লা সমাজ সভ্যতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অশ্লীল কথার আক্রমণ চালাবে!? স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আছে বলেই পরস্পর পরস্পরকে প্রকাশ্যে কানে গরম তরল সীসা ঢেলে দেওয়ার মত নোংরা ভাষায় কথা বলবে, নারীদের নিয়ে নোংরা কথার লোফালুপি খেলবে!? মত প্রকাশের স্বাধীনতার নাম কি আকাশে বাতাসে শীৎকার ছড়িয়ে কথার বলাৎকার!? আপনি এমনই ঠাকুরের শিষ্য!? এমনই অনুগামী!? ঠাকুর এমন কথা বলেছেন নাকি!? ঠাকুরের মানসিকতা, ঠাকুরের দর্শন, ঠাকুরের বোধ-বুদ্ধি, ঠাকুরের অনুভূতি, ঠাকুরের চিন্তা-ভাবনা, ঠাকুরের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ঠাকুরের দীর্ঘ ৮২বছরের বর্ণময় জীবন কি এতই সস্তা!? ঠুনকো!? ভঙ্গুর!? এতই অপরিপক্ক!!!!!? পরমপ্রেমময়ের পতাকার তলায় আপনি/আপনারা এমন ঘৃণাময় অনুগামী!?

যাক, আপনার/আপনাদের যা মনে হয়েছে, যা বুঝেছেন, যা দেখেছেন, যা শিখেছেন, যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি হয়েছে আপনি/আপনারা আমায় তাই লিখেছেন আর তাই-ই লিখবেন! এটা আপনার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আপনি/আপনারা তাই আপনার/আপনাদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আছে! আপনারা মত প্রকাশ করুন! ঠাকুর বিরোধী জনসমাজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কথার এসিড ঢেলে জ্বালিয়ে দিন ঠাকুরের বুকটা, জ্বালিয়ে দিন ঠাকুরের ভালোবাসার ধন তাঁর পরমপ্রিয় আত্মজদের!! 


আর একটা কথা বলি, ঠাকুরের কাছে আপনি/আপনারা আমার মঙ্গল চেয়েছেন! আপনার/আপনাদের মঙ্গল কে করে তার ঠিকানা জানা নেই আপনাদের আর আমার মঙ্গল চাইছেন! মঙ্গল চাইলেই বা কি আর না চাইলেই বা কি!!!!! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ঠাকুরের ওই সাবধান বাণী "তুমি যা করছো বা ক'রে রেখেছো ভগবান তাই-ই গ্রাহ্য করবেন আর সেগুলির ফলও পাবে ঠিক তেমনি।"  আর এই বাণী আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য! কেউ ছাড় পাবে না! তা সে আপনি হ'ন, আমি হ'ই আর ঠাকুরের সন্তান-ই হ'ক! ঠাকুরের বলা কথা তুলে লেখা শেষ করলাম: "যা ইচ্ছা তাই করবে তুমি, তা করলে রে চলবে না, ভালো ছাড়া মন্দ করলে পরিস্থিতি ছাড়বে না।"

আসুন নিজ নিজ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রাখি।

(১৩ই সেপ্টেম্বর'১৯ লেখা)।

প্রবন্ধঃ কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর। প্রশ্ন (৫)

লেখায় ও পরিবারে বিশেষণ ব্যবহার।

প্রায়শঃই দেখা যায় আমার লেখা বিভিন্ন আর্টিকেলের উপর বিরূপ মন্তব্য ভেসে আসে! ভেসে আসে আমি কেন আমার লেখায় ঠাকুরবাড়ির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী ও মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে নানা বিশেষণ ব্যবহার করি? কেন কঠিন কঠোর বিশেষণ প্রয়োগে মন্তব্যকারী ব্যক্তিকে, প্রবন্ধের লেখককে আখ্যায়িত করি!? যদিও যে বিরূপ মন্তব্য ভেসে আসে সংখ্যায় তা সামান্য কিন্তু বাঁদরামিতে অসামান্য! আর এই বাঁদরামিপনা তাদের জিনগত! যে বাঁদরগুলি বাঁদরামি করে তাদের মধ্যে একটা ছেলেমানুষী ভাব আছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, ছেলেমানুষের মত ছেলেবাঁদর বাঁদরামি করে তার একটা ক্ষমার যোগ্য গ্রহণযোগ্যতা আছে কিন্তু বুড়ো বাঁদর যদি বুড়ো বয়সে বাঁদরামি করে তাহ'লে বোধহয় বয়সের আর খাতির তখন চলে না, তার মর্যাদা হারায়! 

মানুষের চালচলনকে কেন্দ্র ক'রে বহু উপমার জন্ম হয়েছে, প্রবাদের সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষণ ব্যবহার হয়েছে আর তা কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, ছড়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহৃত বা প্রয়োগ হয়েছে, হচ্ছে ও হবে! আর কবিতায়, গল্পে ইত্যাদিতে ব্যবহার হওয়ার কারণে যদি তা ব্যক্তি নিজের ওপর টেনে নেয়, ব্যক্তি আক্রমণের তকমা লাগিয়ে দেয় আর লেখকের পরিবারের সদস্যদের উপর সেই বিশেষণ ব্যবহৃত হয় কিনা সেই প্রশ্ন তুলে খোঁচা মারে, ব্যঙ্গ করে তাহ'লে তার মানসিক অপরিপক্কতাকে স্বীকার ক'রে নিয়ে তাকে মানসিক পরিপক্ক ও সন্তুলন ঠিক হওয়ার সুযোগ দিতে হয়। 

আর সেই কারণেই তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই,

আমি আমার পরিবারে কি বিশেষণ ব্যবহার করি তা জানতে গেলে তো আমার পরিবারে আসতে হবে, তাই না? আর, আমার পরিবারের সদস্যরা কি সমাজের বাইরে? সমাজের অবস্থান, সমাজের বাস্তবতা, সমাজের সত্যতা নিয়ে যারা লেখালেখি করেন তারা লেখক ব'লে কি সমাজের সেই অবস্থান, বাস্তবতা, সত্যতা তার পরিবারকে রেহাই দেয়? মানুষের চালচলন, কথাবার্তা, আচার-ব্যবহারকে কেন্দ্র ক'রে যে যে উপমা, প্রবাদ বা বিশেষণের জন্ম হয়েছে তা কি লেখকের পরিবার বহির্ভূত বিষয়!?

এ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কি বলা আছে জানেন তো আমার প্রতি কটূক্তিকারী, বোকার গু তিন জায়গায় লাগা আশ্চর্য জীবগণ? নিশ্চয়ই জানেন। তবুও বলি, ঠাকুর বললেন,

"তুমি যা করছো বা ক'রে রেখেছো ভগবান তাই-ই গ্রাহ্য করবেন, আর সেগুলির ফলও পাবে ঠিক তেমনি!" 

এই কথা বলার পর তিনি বললেন, 

"এই কথা আমার জীবনে আগে প্রযোজ্য তারপর আপনাদের।" 

এইখানে শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তদের সঙ্গে কোনও মিথ্যাচার করেননি, চিটিংগবাজী দু'ম্বরী কথাবার্তা বলেননি, বলেননি, যা ইচ্ছা তাই তুমি করো, রিপুতাড়িত হ'য়ে ছুটে চলো, বৃত্তি-প্রবৃত্তির ফাঁসে ফাঁসি লাগাও নিজেকে আর ঠিক সেইমুহূর্তে আমায় স্মরণ করো আমি রক্ষা করবো!!!!. না, তিনি তা বলেননি! তিনি সবাইকে সাবধান ক'রে দিয়ে বললেন, "যা ইচ্ছা তাই করবে তুমি তা করলে রে চলবে না, ভালো ছাড়া মন্দ করলে পরিস্থিতি কিন্তু ছাড়বে না"।

যাই হ'ক,  শ্রীশ্রীঠাকুরের এই কথা বলার মানে কি জানেন তো? এই কথার মানে হ'লো, যা খুশী ওরা বলে বলুক ওদের কথায় কি আসে যায়, দয়াল আমার দেখছে যে সব ফলটি পাবে দেখতে পায়ে পায়!!!!!!

তাই বলি বন্ধু, এই যে ঠাকুরকে নিয়ে ও ঠাকুর পরিবার নিয়ে যে বা যারা নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত কথার পাঁক নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করছে আর তাদের এই কাজে যারা মদদ দিচ্ছে তাদের সবার ক্ষেত্রে ঠাকুরের ওই বাণী প্রযোজ্য এবং ভবিষৎ ভয়ঙ্কর!

(১২সেপ্টেম্বর২০১৯ লেখা)

Saturday, September 10, 2022

গল্পঃ ত্রিফলার ত্রিবর্ণ!!!!!!!! (৩)

ট্রেন থেকে নেমে ভিড় এড়িয়ে উত্তরপাড়া প্ল্যাটফর্মের একধারে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। স্ত্রী ট্রেনের পিছনদিকে লেডিস কম্পার্ট্মেন্টে উঠেছিল। যাত্রীরা একে একে সবাই দ্রুত পা চালিয়ে চলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ভিড় কমে এলো। মেয়েটিও ফোনে মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে দ্রুত পা চালিয়ে ক্রমশঃ দূর থেকে দূরে  ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। সকালের অল্প বয়সী স্কুল ছেলেটির অসম্মানজনক আচরণের যে প্রলেপটা মাথার মধ্যে দম বন্ধ করা এক অস্বস্তির ছাপ ফেলেছিল সেই ছাপের ওপর যেন তীরের ওপর আছড়ে পড়া সমুদ্রের জলরাশির ছোঁয়ায় বালির বিচিত্র নানা আঁকিবুঁকি যেমন মুছে যায় ঠিক তেমনি মেয়েটির আন্তরিকতাপূর্ণ মধুর ব্যবহার প্রলেপ এঁকে দিয়ে যেন ব'লে গেল 'মেয়েই তো মা'!!!!!!! এক ঝলক দখিনা বাতাস যেন মনের মধ্যে আছড়ে পড়ে মনের গুমোট অবস্থাটা কাটিয়ে দিয়ে গেল। একটা আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি, হঠাৎ স্ত্রীর ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। স্ত্রীকে বললাম, বাসের মেয়েটা উত্তরপাড়া স্টেশনেই নেবেছে। সামনে দূরের দিকে হাত দেখিয়ে দেখালাম। মেয়েটি ওই ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। স্ত্রীও আফসোস করলো মেয়েটিকে মিস করার জন্য। 

যাই হ'ক আমরা ধীরে ধীরে হাঁটতে  লাগলাম স্টেশনের সামনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালাম কাঁঠাল বাগান রিক্সা স্ট্যান্ডে। দেখলাম অনেক রিক্সা নেই, ভাড়ায় চলে গেছে। যে কটা আছে সেগুলিতে হয় লোক নেই,নয়তো একজন দুজ্ন বসে আছে সীটের ওপর পায়ের ওপর পা তুলে! যাত্রী এলো কি গেল তা'তে কোনো হেলদোল নেই, বসে আছে সিটের ওপর মাথা নিচু ক'রে। এদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে আছে রিক্সা ধ'রে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যাবে? সে না শোনার ভান ক'রে রইলো। আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কিগো যাবে? কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ কাটার পর রিক্সাওয়ালা নিজেই  মুখ  খুললো। বলল, কোথায় যাবেন? বলাটার মাঝে যেন একটা ঔদ্ধত্ব ঝ'ড়ে পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম ভাড়া কাটার ইচ্ছে নেই। পছন্দের জায়গা হ'লে আর দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার পরিমাণ মন মত হ'লে গেলেও যেতে পারে। আমি এই স্ট্যান্ড থেকে সবসময় যাতায়াত করি; যখনই যাই ভাড়া নিয়ে কখনোই ঝামেলা হয় না, যা ভাড়া তার থেকে অনেক বেশী পরিমানেই দিয়ে থাকি। এইখানে অনেক রিক্সা আছে যারা নিজেরাই এগিয়ে আসে যাবার জন্য। আজ একজন দু'জন ছাড়া রিক্সাস্ট্যান্ড ফাঁকা। আমি শান্ত ভাবে বললাম, তুমি কি যাবে? তোমার যাওয়ার ইচ্ছে আছে? যদি যাও তো এসো। নিজে তো বুঝি না তবুও কথাটায় মনে হ'ল যেন যাদু ছিল। আর কোনো কথা না ব'লে রিক্সা নিয়ে কাছে এলো। কাছে এসেই একটু ঝাঁঝালো স্বরে আবার কথাটা উগরে দিল, কোথায় যাবেন সেটা বলবেন তো। ঝাঁঝালো স্বরটাকে হজম ক'রে রিক্সায় উঠতে উঠতে বললাম, কোথায় আর যাবো ভাই; আর যেখানেই নিয়ে যাই তোমায়, রিষড়া, শ্রীরামপুর নিয়ে যাবো না। তারপরে বললাম, ড্রাগল্যান্ড ওষুধের দোকানের পাশ দিয়ে গিয়ে একটু এগিয়ে নামবো। গম্ভীরভাবে মুখের দিকে তাকিয়ে 'ভাড়া বেশী লাগবে' বলেই রিক্সা চালাতে লাগলো। রিক্সা এগিয়ে চলেছে, আমরা স্বামী স্ত্রী দু'জনে বসে আছি চুপ ক'রে; একটু এগিয়ে যেতেই স্ত্রী  নাকে হাত দিয়ে ইশারা ক'রে যা বলল তার মানে হচ্ছে, রিক্সাচালক ড্রিঙ্ক ক'রে আছে আর বাতাসে তার গন্ধ নাকে এসে লাগছে। আমি প্রথমে ব্যাপারটা লক্ষ্য না করলেও পরে দেখলাম কথাটা ঠিকই। রিক্সার বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার বেগও বেড়ে গেল আর গন্ধটা এসে লাগছে চোখেমুখে তীব্রভাবে। স্ত্রীর মুখচোখ দেখে বুঝলাম ভীষণ বিরক্ত বোধ করছে। চাপা স্বরে বলল, না দেখে যার তার রিক্সায় উঠে পড়, এখন দুর্গন্ধ ভোগ কর'। যাই হ'ক রিক্সা এসে থামলো বাড়ির সামনে। রিক্সাচালককে বললাম, কত দেব ভাই? ৩০টাকা দিন। গম্ভীর একটা স্বর ভেসে এলো রিক্সাচালকের গলা দিয়ে। রিক্সাচালকের অকারণ রুক্ষ ব্যবহার মনটাকে অস্থির ক'রে তুলছে ক্রমশঃ। আমি বললাম, ভাই ৩০টাকা কি ভাড়া? ভাড়া তো ২০টাকা। আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, মোরের মাথা পর্যন্ত ২০টাকা,  ভিতরে এলে আরও ১০টাকা বেশী দিতে হবে। আমি বললাম, ভাই আমি কি নতুন লোক যে তুমি আমাকে কত ভাড়া সেটা শেখাচ্ছো? এখানে ভাড়া ২০টাকা আর তুমি চাইছো ৩০টাকা, তাও ভালো মুখে নয়; পরিস্কার তুমি দাবড়ে বেশী টাকা নিতে চাইছো, এটা ঠিক নয়। রিক্সাচালক চোখ পাকিয়ে বিকৃত মুখ ভঙ্গী ক’রে বলল, ঠিক বেঠিক বুঝি না, ৩০টাকা ভাড়া দিয়ে দিন চলে যাই। কথাটা বেশ জোরের সঙ্গে ব’লে কি যেন বিড়বিড় ক’রল। স্ত্রী বলল, ৩০টাকা দিয়ে দাও। এদের সঙ্গে কথা বললে মান সম্মান আর থাকবে না, কেননা দেখে বোঝাই যাচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আমি আর কথা না বাড়িয়ে ৩০টাকা দিয়ে দিলাম। টাকাটা হাতে নিয়ে সে চোখ পাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, যা ভাড়া তাই নিয়েছি, আপনি বেশী দিয়েছেন নাকি? তার লাল চোখ পাকানো বাঁকানো মুখের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধ’রে সহ্য করা ভিতরের চাপা রাগটা বেরিয়ে আসতে চাইলো। মনে হ'ল ভিতর থেকে যেন বাঁধ ভাঙ্গা জলের স্রোতের মত একটা রাগের স্রোত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে আছড়ে পড়তে চাইছে দুর্বিনীত উদ্ধত রিক্সাচালকের ওপর। রাগে সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগলো।  নিজেকে সংযত ক'রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলাম। জোর ক'রে ১০টাকা তো বেশী নিলই তার উপরে এমন বর্বর আচরণে নিজেকে অসহায় মনে হ'ল। নিজের প্রতি যখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে চলেছি ঠিক তখনই মনে পড়ল ঠাকুরের বাণীটাঃ

"তোমার কোন কু-অভ্যাস
কিংবা কাম, ক্রোধ ইত্যাদী --------
যাহা তোমাকে দুর্ব্বল ও খিন্ন করিতে চায়
তাহা যদি ত্যাগ করিতেই চাও ----
যখনই তাহার সম্বেগ যে-মহূর্ত্তে
কার্য্যে রত করাইতে যাইতেছে
সেই মুহূর্ত্তেই
তাহা হইতে বিরত হইও ,
কিংবা সেই মুহূর্ত্তে বিরত হইয়াই
ঐ সম্বেগকে
এমন কোন চিন্তা ও কর্ম্মে
নিয়োজিত করিও
যাহা তোমার পক্ষে মঙ্গলপ্রদ -----
আর , ইহা ততদিন পর্য্যন্ত চালাইও
যতদিন ইহা তোমার সম্যক
আয়ত্তের ভিতর না আসে ;----
দেখিও কিছুদিন অভ্যাস করিলেই
অভ্যাস বা রিপুদিগকে
এমনতর আয়ত্ত করিতে পারিবে যে
তাহারা ক্রীতদাসের মত
নতজানু হইয়া
তোমার উপাসনায় মুগ্ধ থাকিবে ; ------
ইহা না করিয়া শুধু ত্যাগের চিন্তায়
ত্যাগ তো করিতে পারিবেই না
বরং আরো আবিষ্ট হইয়া পড়িবে।"

মনটা খানিকটা শান্ত হ'ল। মনকে অন্যত্র সরিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম আগামী ৩০শে ভাদ্র (১৫ই সেপ্টেম্বর'১৬) ভদ্রকালী সৎসঙ্গ কেন্দ্রে ঠাকুরের জন্মদিবসের অনুষ্ঠানের কথাটা। আর কিছু না ব'লে রিক্সা থেকে নাবতে যাবার মুহুর্তে তার শরীরের আর মুখের ভাষা লাগামছাড়া হ'তে চাইলো। মনে হ'ল যেন বিশ্ব জয়  ক'রে ফেলেছে। আলেকজান্ডারিয় মেজাজে টাকাটা গুনতে গুনতে বলল, যা ভাড়া তাই নিয়েছি এতে এত কথার কি আছে? তাড়াতাড়ি নাবুন। নাবার মুখে তার মুখের মদের তীব্র দুর্গন্ধে মেজাজটা নড়ে গেল। মেজাজটা ধ'রে রাখার চেষ্টা ক'রেও আর ধ'রে রাখতে পারলাম না। রিক্সা থেকে নেবে তার বাঁ হাতের কব্জিটা চেপে ধরলাম। হাতে ধরা ৩০টা টাকা।  টাকাটা সে কিছুতেই দেবে না। মনে হ'ল একটা বিরাশী সিক্কার থাপ্পর মারি। মারবার জন্য হাত তুললাম কিন্তু ভেতর থেকে সায় পেলাম না। মন বলল এক কিন্তু বিবেক সাড়া দিল না। রাগে সর্বাঙ্গ কাঁপছে কিন্তু কেমন জানি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে না। সে হাত ছাড়াতে চাইলো কিন্তু আমার হাতের মুঠিটা যেন তার কব্জির ওপর বজ্র আঁটুনির মত চেপে বসেছে কিন্তু মাথার মধ্যে কে যেন বলছে, সাবধান! কব্জি যেন ভেঙ্গে বা মুচড়ে না যায়। অনেক কথা বললাম বেআদবকে আদব শেখাবার জন্য। ততক্ষণে তার মদের নেশা ভয়ে অনেকটা কেটে গেছে। সে তখন কাঁচুমাচু হ'য়ে ক্ষমা চেয়ে নিয় বলল, আপনি টাকা নিয়ে নিন, আমার লাগবে না। আমাকে যেতে দিন। আমার ভুল হ'য়ে গেছে। আমি বললাম, আমি তোর টাকা নেব কেন? তুই যদি আমার কাছ হাসি মুখে ৫০টাকা চাইতি আমি তোকে ৫০টাকা দিতাম। তো স্ট্যান্ডে গিয়ে জিজ্ঞেস করবি আমি কত ভাড়া দিই। তুই নতুন? মদ খেয়ে রিক্সা চালাচ্ছিস? যাত্রীদের কুকুর ছাগল মনে করিস? মদ খেয়ে চোখ পাকিয়ে ভয় দেখিয়ে ডবল ভাড়া নিস? যা আজ তোকে ছেড়ে দিলাম।  আমার এখনও মুখ কথা বলছে; হাত কথা বলার আগে এখান থেকে এই মুহুর্তে চলে যাবি।  এই কথা ব'লে ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম। ও হাত ছাড়া পেয়ে রিক্সা নিয়ে চলে যেতে চাইলো। আমি বললাম, না না! ওটা হচ্ছে না। তোকে ছেড়ে দিয়েছি এমনি চলে যাবার জন্য, রিক্সা নিয়ে যাবার জন্য নয়। রিক্সা পাবি না। যে গাড়ি দিয়ে তুই রোজগার করিস সেই গাড়ি ছাড়া তুই রোজগার কর দেখি। কথাটা বলেই তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যেতে বললাম। সে তখন মুখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, আমি তো বললাম আমার ভুল হ'য়ে গেছে। আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। ক্ষমা চাওয়ার পরেও আপনি মাপ করবেন না? রিক্সা ছাড়া আমি খাবো কি? আমি তখন তাকে বললাম, এই কথাটাই ভুলে গেছিলি আর যাত্রীকে মনে করেছিলি কুকুর ছাগল। কোনোদিন মিষ্টি ক'রে হাসি মুখে কারো কাছে সত্যি ভাড়ার কথা ব'লে বেশী ভাড়া চেয়ে দেখেছিস? সবাইকে একই রকম মনে করিস? এখন বিপদে পড়ে ভোল পাল্টাচ্ছিস। এই ভোলটাই বরাবরের জন্য ব্যবহারের মধ্যে ফুটিয়ে তোল। দেখবি লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। বিশ্বাস না হয় রিক্সাস্ট্যান্ডে গিয়ে আমার পরিচিত অন্য রিক্সাচালকদের গিয়ে জিজ্ঞেস ক'রে দেখতে পারিস। একবার পরীক্ষা করেই দ্যাখ না।

রিক্সাচালক চুপ ক'রে আমার কথা গুলি শুনলো। আমি বললাম, যা রিক্সা নিয়ে চলে যা। সে মাথা নিচু ক'রে ধীরে ধীরে রিক্সা নিয়ে এগিয়ে গেল। দেখলাম একটু আগে যাকে নেশাগ্রস্থ, দুর্বিনীত ব'লে মনে হচ্ছিল এখন তাকে কত ধীরস্থির শান্ত লাগছে। পেছন থেকে ডেকে দাঁড় করালাম। বললাম, একটা কথা বলি, যদি পারো মনে রেখো। আর মদ খেয়ো না। মদ বড় বদ, মদে সব নষ্ট। আর সব নষ্ট হ'লেই জীবনে, সংসারে নেবে আসে সীমাহীন কষ্ট, যার শেষ মৃত্যুতে, শ্মশানে। 

কথাগুলি দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শুনলো তারপর ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আমি ওর চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রিক্সাটা রাস্তার বাঁক ঘুরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত আর মোহগ্রস্থ হ;য়ে ফিরে চললাম বাড়ির দিকে আর মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানালাম, ঠাকুর ওর মঙ্গল ক'র।

(লেখা ১০ই সেপ্টেম্বর'২০১৬)