Powered By Blogger

Wednesday, February 22, 2017

স্মৃতি তর্পণ ২


'তেলেপ্পো ঝাঁই'!!!!!!!!!!!!!

পাপড়ি দাসের লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। মনে পড়ে গেলো অনেক কিছু। কলকাত্তাইয়া চট্টগ্রামের ভাষা এখনও কিছু কিছু বুঝি এত বছর পড়েও। ছোটবেলায় মা-বাবা-জ্যাঠা-মামা-আত্মীয়স্বজনের প্রচুর ভিড় লেগে থাকতো। চট্টগ্রাম ভাষার কাকলিতে মুখর 'য়ে থাকতো ঘর। আমরা ভাইবোনেরা শুধু নিজেদের মধ্যে কলকাত্তইয়া বাংলা ভাষায় কথা বলতাম। কিছু কিছু চট্টগ্রামের ভাষাও বলতাম আমরা। তবে খুবই সামান্য। আমাদের মধ্যে আমার ছোড়দা ভালো কলকাত্তাইয়া চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলতে পারতো। আমাদের সবার জন্ম কলকাতায়। বাবা-মা-আত্মীয়স্বজনের মুখে মুখে শুনে শুনে শেখা কিন্তু ভাঙ্গা ভাঙ্গা। কলকাত্তাইয়া চট্টগ্রামের ভাষা বললাম এইজন্য, খাস চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে বহুদিন কলকাতার বুকে থাকা চট্টগ্রামীদের ভাষার তফাৎ পরিলক্ষিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার জটিলতা সরলতায় পর্যবসিত হয়। খাস চট্টগ্রামের ভাষা বোঝা কোনও কোনও জায়গায় কঠিন। আজ থেকে বহুদিন আগে প্রায় ৪০-৪৫বছর আগের একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। স্বাধীনোত্তর দেশভাগের সময় পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিমবাংলায় চলে আসে বাবা-মা। তারপর অনেক কষ্টে বাংলায় হুগলী জেলার উত্তরপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি তৈরী রে বসবাস শুরু করেন। তখন লোকবসতি প্রায় ছিল না বললেই চলে। যাই আমাদের যেখানে বাড়ি তার আশেপাশে কয়েক ঘর সবাই আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পড়ে। সবাই চট্টগ্রামের মানুষ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে শুনতাম। বাবা-মা নিজেদের মধ্যে ভাষায় কথা বলতো। আর আমাদের সঙ্গে কলকাত্তাইয়া বাংলা ভাষায় কথা বলতো। একদিন আমাদের পাশের বাড়িতে খুব চেঁচামেচি হচ্ছে শুনলাম। বাড়ির গৃহকর্তা আমাদের সম্পর্কে দাদু হতেন। তিনি বাড়িতে ছেলেদের উপরে বকাবকি করছেন। বকাবকি করছেন খাস চাঁটগাঁইয়া ভাষায়। আমাদের বাপ-দাদাদের, মা-মাসিদের দেখেছি ২৪ঘন্টার প্রায় পুরো সময়টাই চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে। যাই , বাড়িতে তো খুব চেঁচামেচি হচ্ছে জটিল দুর্বোধ্য চাঁটগাঁইয়া ভাষায়। বাপ চেঁচাচ্ছে দ্রুত তাঁর জন্মগত মাতৃভাষায়। আচ্ছা কথা প্রসঙ্গে বলি, এক্ষেত্রে মাতৃভাষা কোনটা? বাংলা না চট্টগ্রামের চাঁটগাঁইয়া ভাষা? এই জায়গায় আমার একটু গোলমাল 'য়ে যায়। যাই ' বাপের চেঁচানোর উত্তরে ছেলেও মাঝে মাঝে উত্তর দিচ্ছে চট্টগ্রামের ভাষায়। ঠিক ওই সময় বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে একদল পাড়ার ছেলে যাচ্ছে। তারা যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়লো বাড়ির পাশে রাস্তায়। এক মানুষ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি। বাড়ির ভেতর থেকে আশ্চর্য কিছু জটিল খটমট শব্দ-----অনেকটা দক্ষিণ ভারতের ভাষার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে--------বেরিয়ে আসছে বাইরে। বড় শ্রুতিমধুর, মনোরম শব্দগুচ্ছ! পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু রে পাঁচিলের ভেতরের সেই চীৎকার চেঁচামেচির দৃশ্য দেখতে আশ্চর্য ভাষা শুনতে উৎসুক জনতা। যাই অবশেষে সেদিনের মত সমাপ্ত হয়েছিল বাপ ছেলের বকাঝকার নাটক। কিন্তু যেটা এরপরে ঘটেছিল সেটা ছিল দারুণ এক উপভোগ্য বিষয়। দিন দুয়েক পরে রাস্তায় একদিন মুখোমুখি হয়েছিলাম সেই জনতার মধ্যে কয়েকজনের। তারা সবাই জানে আমিও ওই বিদঘুটে আশ্চর্য ভাষাভাষীর অন্তর্ভুক্ত একজন মানুষ। তাদের মধ্যে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা তেলেপ্পো ঝাঁইমানে কি? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! চট্টগ্রামী ভাষায় তেলেপ্পো ঝাঁইমানে তো আমি জানি না আর কোনোদিন বাবা-মার মুখে শুনিওনি এত বছর বয়স পর্যন্ত। কি উত্তর দেবো! যাই এই নিয়ে তাদের সঙ্গে অনেক কথা য়েছিল। পরে এই বিষয়ে কৌতূহলবশতঃ পাশের বাড়ির আমার বয়সী বন্ধুর সঙ্গে আলাপচারিতায় ছানবিন রে যা জেনেছিলাম তাতে হাসতে হাসতে এই ভাষার প্রতি ভালোবাসায় আরও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছিলাম। ঘটনাটা , সেই সময় কেরোসিন তেলের ব্যবহার ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে কেরোসিন তেল শেষ য়ে যাওয়ায় বাপ ছেলেদের বলেছিল সময়মত কেরোসিন তেল নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু ছেলেরা সময়মত সেই কাজ না করায় বাড়িতে রান্নার কাজে অসুবিধা প্রকট য়ে উঠেছিল। তাই বাবা রেগে অগ্নিশর্মা য়ে ছেলেদের বকছিল। ভাষার মাধ্যম ছিল সেই চাঁটিগাঁই ভাষা। ছেলেদের বকাবকির অনেক কথার ভিড়ে একটা লাইন ছিল লক্ষ্মীছাড়া মতর্গ্যা গউড়, তর তেলের কওয়ালে ঝাঁটা’ (ভাষাটা যতটুকু পারলাম লিখলাম) অর্থাৎ তোর তেলের কপালে ঝাঁটা মারি আর এই কথাটায় বক্তার দ্রুত বলার ভঙ্গীতে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে পাঁচিলের ওপারে গিয়েই য়ে গেছে তেলেপ্পো ঝাঁই সেই থেকেই আমাদের চট্টগ্রামের লোকেদের দেখলেই অচট্টগ্রামীরা বলতো, ‘তেলেপ্পো ঝাঁই’!!!!! এই কথায় আমরা কিছু মনে করতাম না। উভয় পক্ষই হাসতাম আর এই আশ্চর্য ভাষার মজা নিতাম।
আমরা গর্ব রে বলতাম, অ্যাই এই ভাষায় কত ভাষা জড়িয়ে আছে জানিস? যেমন, ‘অ্যাঁই খায়ম অ্যাঁই= হিন্দি, ইংরেজি , = ইংরেজি , খায়ম=সংস্কৃত!!!!!!!!!!!!!! হা, হা, হা.....................
বন্ধুদের বলতাম, আমরা কত ধনী জাত বুঝলি ছাগল!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!! তবে সবাই এই ভাষা শুনতে চাইতো, শুনতে ভালোবাসতো। আমরাও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাবে যতটা পারতাম বলতাম। তবে এখন আর আমরা এই বাংলায় যারা চট্টগ্রামের মানুষ বাস করি সেই দেশভাগের সময় থেকে তারা অর্থাৎ আমাদের পূর্ব পুরুষরা চলে যাবার পর উত্তরপুরুষরা ভাষা চর্চার অভাবে ভুলে গেছি সেই মাতৃভাষা!!!!!!! এখন এই ভাষা এখানকার বেশীরভাগ চট্টগ্রামীদের কাছে পূর্ব পুরুষদের অতীত স্মৃতি বিজরিত ভাষা। অনেকটা 'সেই রাজাও নেই, নেই রাজ্য'-এর মত। মায়ের আমলের সেই কত অনুষ্ঠান আজ আর হয় না। ভুলে গেছি চট্টগ্রামের লইট্যা মাছ, শুঁটকি মাছ, লতি, কচু, পুলি, পিঠা, ভাঙ্গা খই-এর মোয়া (কি জানি বলে, মনে নেই এখন আর), তারপর 'বতের ভাত' ইত্যাদি ইত্যাদি কত রকমের খাওয়া দাওয়া। মাকে দেখতাম কি একটা 'কালকুমার আর বেলকুমার' ব্রত করতো! আজ আর ঠিক মনে নেই। ব্রতের আগের ব্রতের দিন বাবাকে দেখতাম কত রকমের খাবার বাজার থেকে নিয়ে আসতো মায়ের ব্রত পালনের জন্য। নানারকম খাবার রান্না 'রে চাটনি, পায়েস, দই, মিষ্টি, ফল সহযোগে দু'টো কলাপাতায় সেই খাবার সমান সমান সাজানো 'ত। তারপর নানা পূজার অনুষ্ঠান শেষে সেই দু'টো থালার একটা থালা ছাদের একটা জায়গা জল দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার 'রে সেইখানে প্রদীপ, ধূপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দেওয়া 'ত। তারপর সবাই ঘরে চলে আসতাম। ঘর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম কি হচ্ছে। ছাদে কাকেদের ভিড় লেগে যেত কিন্তু কেউ সেই থালায় মুখ দিত না; কখনো বা একটা কাকও আসতো না। আমরা অধীর 'য়ে পড়তাম। কখন কাক খাবে তারপর আর একটা যে থালা সাজানো আছে সেটা আমরা খাবো। আজও অবাক হয়ে ভাবি কত কাক এলেও কেউ মুখে দিত না আবার অনেক সময় একটা কাকও আসতো না দীর্ঘ সময় 'রে। হয়তো কোনও ত্রুটি 'য়ে থাকবে পুজায়। মাকে দেখতাম বিষন্ন মুখে বসে থাকতে। অনেকক্ষণ দেরী 'লে মা বলতো তোরা খেয়ে নে। মা এতটাই বাস্তববাদী মহিলা ছিলেন। কিন্তু আমরা খেতাম না। তারপর হঠাৎ দেখতাম কোথা থেকে একটা মোটাসোটা কালো কুচকুচে কাক এসে এক ঠোক্কর দিয়ে ঠোঁট দিয়ে খাবার তুলে নিয়ে উড়ে চলে যেত। আর তারপরই ঝাঁপিয়ে পড়তো -নে- কাক কা কা রবে! আমরা জানালা দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতাম সেই দৃশ্য অসীম ধৈর্য্য নিয়ে। তারপরই লাফ দিয়ে নেবে বসে যেতাম সেই খাবার খেতে। আমার সঙ্গে আমার বোনের সেই খাওয়া নিয়ে ঝগড়া আজও মনে আছে। বড় মধুর সেই স্মৃতি! আজ বোন আছে কিন্তু অন্য সংসারে ব্যস্ত ক্লান্ত এক নারী 'য়ে। সেই দিনের মত খাবার নিয়ে ঝগড়া করার আজ আর অবকাশ নেই। সময় বড় নিঠুর! আজ আর মা- নেই, নেই বাবা, নেই সেই দিন! নেই সেই সব ব্রত আর নানারকম চট্রগামী খাবার দাবার! তবে মাঝে মাঝে শুনতাম বছরে একবার চট্টগ্রাম পরিষদ কি একটা উৎসবের আয়োজন করে। সেখানে চট্টগ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা জড়ো 'য়ে খাওয়া দাওয়ার উৎসব করে। সম্ভবত সেই উৎসবকে 'মেজবানি উৎসব' বলে। নানারকমের মাছ, সবজী, প্রধানত শুঁটকি মাছের এলাহি আয়োজন হয়। কিন্তু কোনোবারই সেখানে যাওয়া হয়নি। যাওয়া হয়নি কারণ কোনো যোগাযোগ নেই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কারও সঙ্গে। আর পরিচিত জনেরা জানলেও কেউ দাওয়াতও দেয় না অনুষ্ঠানে যোগদান করার। তাই স্মৃতিই একমাত্র সম্বল বেঁচে থাকার আর পূর্ব পুরুষ, অতীতের ঘটনাকে স্মরণ করার! স্মৃতি সতত সুখের হলেও, স্মৃতি বড় বেদনার। এই বেদনা নিয়েই আজও বেঁচে আছি।




প্রেমময় নবী!

বন্ধু! বৃথা কেন ভাবো, ভবে অনাথ হ’ল সময়!
থাকে যদি সাথে প্রাণনাথ তবে কিসের আমার ভয়?
সময়ের আরেক নাম যদি হয় বহতা নদী
জীবন তরী চলে ভেসে সেথায়, ভেসে চলে বিন্দাস
খেয়াতে যদি থাকে মাঝি তোমার প্রেমময় নবী!
নবীময় তোর ভাসান তরী যায় যদি বন্ধু ডুবে
বিশ্বাস, নির্ভরতা, আত্মত্যাগ এ তিন শব্দের
জেনো বন্ধু নিশ্চিত সলিল সমাধি হবে।
প্রাণনাথে ধরি ভবসাগর দাও পাড়ি,
পার হও তমসাচ্ছন্ন ঘোর আঁধার
নাথ হ’য়ে সময় দেবে অভয়

কেটে যাবে জীবনের যত ভয় অসার!!!!!!

Sunday, February 12, 2017

. কবিতাঃ হাসি মিষ্টি!

বন্ধ হ’ক কলমের নীল মূত্রপাত, 
বন্ধ হ’ক যত কটু মুখের বিষ বর্ষণ;
বন্ধ হ’ক ‘না’-এর ধারাপাত,
বন্ধ হ’ক যত অশ্রদ্ধার ভুমি কর্ষণ।
বন্ধ হ’ক যত ব্যক্তি স্বার্থে
বিভাজনের ইতর দৃষ্টি;
বন্ধ হ’ক গরিবির নামে
উদারতার ভঙ্গী নিয়ে
নেবে আসা দয়ার অম্ল বৃষ্টি।
কেন এই অনাসৃষ্টি?
কেন এই কৃষ্টি?
কারণ শয়তানের হাসি ভগবানের চেয়েও মিষ্টি!

স্মৃতি তর্পণ! ১




আজ টিভিতে হঠাৎ চোখ পড়ল। দেখলাম সিরিয়ালের সেরা ভিলেনের রোলের বিজ্ঞাপন চলছে। এক একটা সিরিয়ালের এক একজন তাদের সেরা ডায়লগ বলে যাচ্ছে। একটা সিরিয়ালের একজন ভিলেনের একটা ডায়লগ শুনলাম; বলছে, ‘ভাত ছেটালে কাকের অভাব হয় না।‘ কথাটা মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৩০-৩৫ বছর পিছনে নিয়ে গেল। একটু নস্টালজিক হ’য়ে পড়লাম। 

তখন ভরা যৌবন। মাথা ভর্তি লম্বা চুল, মুখে চাপ দাঁড়ি, হাতে মোটা ষ্টীলের বালা, লোহা পেটানো চেহারা। ব্যায়াম, ক্যারাটে-কুম্ফু, ক্রিকেট, নাটক, গান, লেখালেখি, রাজনীতি, বক্তৃতা ইত্যাদি সবেতেই ফুলে ফুলে প্রজাপতির উড়ে উড়ে মধু খাওয়ার মতন যৌবনের পাগলা ঘোড়ায় চেপে ছুটে বেড়াচ্ছি এ মাথা থেকে ও মাথা, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, এ মেরু থেকে ও মেরু, এ কূল থেকে ও কূল, এ ঘাট থেকে ও ঘাট, এ জীবন থেকে ও জীবন। সর্বঘটে কাঁটালি কলা হ’য়ে বহাল তবিয়তে বিরাজ করছি। এর সঙ্গে রয়েছে চাকরী জীবন। হু হু ক’রে কেটে যাচ্ছে সময়। এত ব্যস্ত যে শয়তান তার কারখানা বানাতে সুযোগই পায়নি এই মস্তকে। তাই একটাই কি দুঃখ রয়ে গেল?

প্রেমহীন যৌবন উদ্দাম গতিতে ছুটে গেল বিনা বাধায়, বিনা দ্বিধায়! কিন্তু কিসের টানে? কেন এই উপেক্ষা? প্রেম কি আসেনি কখনও জীবনে? প্রেমে অনীহা? অর্থ, মান, যশ ও ক্ষমতার লোভ? সেখানেও উপেক্ষা! ক্ষমতাধর প্রভাবশালীর সঙ্গ লাভে খুব বেশী কোনও আগ্রহ ছিল না।  সবেতেই ছিল উপেক্ষা, অনিচ্ছা ও অরুচি।   

এমনটা কেন? জানি না। প্রেম, ক্ষমতা, অর্থ ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে কেন উপেক্ষার জবাবে উপেক্ষা না হ’য়ে গালির গালিচা? উত্তর কি এখন? জানি না, জানার চেষ্টাও করিনি কোনোদিন। তবে ঐ ৩০-৩৫ বছর পিছনের অনেক বিচিত্র ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনা আজ বলতে পারি। 
একদিন অফিস ছুটির দিন শীতকালের সকাল। সময় সকাল ১০টা সাড়ে দশটা হবে। বন্ধু-বান্ধব অনেকে মিলে বসে আছি। সামনে সম্ভবত ক্লাবের কোনো অনুষ্ঠান আছে। তারই প্রস্তুতি চলছে। এলাকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব ক্লাবের প্রধান শক্তি এলেন। ছোটবড় সবাই তাঁকে ঘিরে বসে আছে। তিনি বলছেন আমরা সবাই শুনছি। সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ ক’রে যাচ্ছে। এদের মুশকিল হ’ল এরা দাদা যা বলেন সবেতেই হ্যাঁ হ্যাঁ ক’রে যান। সূর্য পশ্চিমে উঠে পূবে অস্ত যায় বললেও সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ ক’রে ওঠে। এতে যে তিনি সবসময় খুশী হন তা' কিন্তু নয়। মাঝে মাঝেই বুকের ভেতরে থাকা একটা চাপা রাগ এদের ওপর বেড়িয়ে আসে।

যাই হ’ক, কথার পর কথা এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ তিনি রেগে গিয়ে বিরক্তির সুরে বললেন, ‘ ভাত ছেটালে কাকের অভাব হয় না, বুঝলি।‘ আসরে যেন বজ্রপাত হ’ল। সবাই চুপ ক’রে আছে। আমি ঘুরে ঘুরে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। দেখছি সবার মুখে যেন মুহুর্মুহু রঙ পাল্টাচ্ছে। কেউ মাথা নিচু ক’রে বসে আছে তো কেউ কেউ অন্যের মাথার পিছনে নিজের মুখ লুকাতে ব্যস্ত হ’য়ে পড়েছে। ‘কি হ’ল চুপ ক’রে আছিস কেন? কি, ভুল বললাম? ভাত ছেটালে কাকের অভাব হয়?’ সামনে বসে থাকা কয়েকজনের দিকে তাকিয়ে আবার কথাটা ছুঁড়ে দিলেন তিনি। আমি আমার মত চুপ ক’রে বসে আছি। তিনি জানেন আমি বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে থাকি আর সময় পেলেই আসি। রোজ আমার আসা হয় না। তাই আমাকে একটু প্রশ্রয়ের চোখেই দেখতেন তিনি। তবে সবার সামনে আমাকে যতটা না মান্যতা দিতেন তার থেকে হাজার গুণ বেশী মান্যতা দিতেন যখন দুইজনে একা থাকতাম। অনেকক্ষণ কথা বলতেন। তখন নানা ব্যক্তিগত কথা হ'তো, কখনও কখনও কোনও কোনও বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইতেন। কিন্তু সবার সামনে একেবারে ১৮০ডিগ্রি উল্টে যেত। আমি বুঝতাম, এইটা স্বাভাবিক, তাই মনে কোনও প্রতিক্রিয়া হ'তো না। শুধু ভাবতাম, কি অদ্ভুত অসহায় নকল জীবন, অভিনয় পূর্ণ জীবন তাঁর। 

যাই হ’ক, হঠাৎ তিনি আমাকে উদ্দেশ্য ক’রে বললেন, ‘কিরে তুই চুপ ক’রে আছিস কেন? তুই তো কিছু বল?’ আমি আমতা আমতা ক’রে বললাম, ‘ন-ন-না, আমি কি বলবো?’ তিনি বললেন, ‘কেন? তুই তো পড়াশুনা করা ভালো ছেলে! তুই তো কিছু বল!’ আমি তখন কিছুটা ভয়ে, কিছুটা প্রশ্রয়ে বললাম, ‘না, মানে আপনি কথাটা ঠিক বলেছেন। ভাত ছেটালে কাকের অভাব হয় না। তু নেহি তো আউড় সহি! আউড় নেহী তো আউড় সহি!! তবে কি জানেন, কাকেদের চরিত্রটা অদ্ভুত! ভাত ছেটাবার সঙ্গে সঙ্গে তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে একথা যেমন ঠিক, সত্য তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ঠিক ও সত্যি হ’ল ভাত খাওয়া শেষ হ’লেই কাকেরা দলবেঁধে উড়ে যায়। আর, দাদা, উড়ে যায় যায়, যাবার বেলায় আরও কর্কষ স্বরে ‘কা কা’ রবে উড়ে যায়।‘ 
আমার বলা শেষ হ’তেই কিছুক্ষণের জন্য ‘পিন অফ সাইলেন্ট’ হ’য়ে গেল পরিবেশ। তারপরই হঠাৎ দুম ক’রে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। পা দিয়ে সজোরে লাথি মেরে পিছন দিকে ঠেলে ফেলে দিলেন চেয়ারটা। টেবিলটাকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে গটগট ক’রে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন এলাকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা আমাদের এলাকার সবার প্রিয় দাদা। আমরা সবাই তখনও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হ’য়ে চুপ ক’রে বসে আছি। সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তারপর দেখলাম সবাই যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে একবুক রাগ আর বিরক্তি নিয়ে। যদিও কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি, তবুও আমার মনে হ’ল আমি এই অবস্থার জন্য দায়ী। আমিও আর কালবিলম্ব না ক’রে একা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে সোজা চলে এলাম বাড়িতে। সেদিন সারাদিন ভেবেছিলাম কথাটা। হঠাৎ কি যে বললাম! কেন যে বললাম!

যাই হ’ক, আজ অনেক বছর পর টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা দৃশ্যটা আমাকে নিয়ে গেল সেই ফেলে আসা দিনগুলিতে। দাদার ‘ভাত ছেটালে কাকের অভাব হয় না’ কথাটা সিরিয়ালের দাদার ডায়লগ হ’য়ে ফিরে এল এতবছর পরে। মনে হ’ল পৃথিবীটা সত্যিই গোল!
তবে অনেকদিন পর রাস্তায় দাদার সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছিল নিভৃতে। 

আজও মনে পড়ে সেদিনটার কথা। রাস্তায় আসতে আসতে কাঁধে হাত রেখে খুব বিষন্ন স্বরে বলেছিল, ‘কে জানে ক’ ঘন্টা, রবে রে জীবনটা’; তোর সেদিনের কথাগুলি অপ্রিয় হ’লেও বড় সত্যি। বাস্তব বড় নির্মম, রুঢ়, কঠিন! জীবনকে চেনাতে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।‘আজ তাঁর কথাগুলি মনে পড়ে গেল। আজ আর তিনি নেই আমাদের মাঝে। কিন্তু কথা গুলি ফিরে ফিরে আসে বারে বারে!!!!!!

এই ছবিটা সেই সময়ের।