Powered By Blogger

Tuesday, August 18, 2026

প্রবন্ধঃ নেতাজীকে অপমান এবং প্রতিবাদ আন্দোলন ও অনশন।

সম্প্রতি নেতাজীকে অপমান, অসম্মান করা ও এই অপমান, অসম্মান করার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিবাদ, আন্দোলন নিয়ে বাংলার আকাশে আবার ঝড়ের কালো মেঘ জমা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অনশন ইস্যু। নেতাজীকে অপমান, অসম্মান করার জন্য কেউ কেউ অনশনে বসার কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেছে। কিছুদিন আগে দেখেছি দিল্লীর যন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুর অনশন। তারও আগে লাদাখের পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিয়ে সোনম ওয়াংচুর অনেকবার অনশন দেখেছি। এছাড়াও ভারতে নানা ঐতিহাসিক ও উল্লেখযোগ্য অনশনও আমরা দেখেছি। কথায় কথায় দেশের নেতা, মহাপুরুষ য় মনিষীদের অপমান অসম্মান করা, প্রতিবাদে প্রতিবাদ আন্দোলন ও অনশন ফোবিয়ায় আক্রান্ত আমার ভারত।

ভারতে অনশন আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা হলেনঃ
১) মহাত্মা গান্ধী:
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এবং বিভিন্ন সামাজিক দাবিতে গান্ধীজি একাধিকবার আমরণ অনশন করেছিলেন।
২) যতীন দাস:
লাহোর জেলে বন্দী অবস্থায় রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকারের দাবিতে ৬৩ দিন অনশন করে ঐতিহাসিক শহীদ হন।
৩) পোট্টি শ্রীরামুলু:
অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠনের দাবিতে ১৯৫২ সালে ৫২ দিন অনশন করে প্রাণত্যাগ করেন।
৪) ইরম শর্মিলা:
মণিপুরে আফস্পা (AFSPA) আইনের বাতিলের দাবিতে দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন চালিয়েছিলেন।
৫) আন্না হাজারে:
২০১১ সালে জন লোকপাল বিলের দাবিতে দিল্লিতে বড় ধরনের অনশন আন্দোলন গড়ে তোলেন।

এসব ইতিহাস অনশনকারী ও আন্দোলনকারীদের জানা।

এর আগেও বলেছি আবারও বলছি, যারা অনশন করেন, অনশনকে হাতিয়ার ক'রে দাবী আদায়ের আন্দোলন করেন তাদের মানসিকতাকে সম্মান ও স্যালুট জানিয়েই বলছি, তাদের ডিমোটিভেট করছি না, কোনোরকম অসম্মান করছি না, অপ্রিয় সত্যটা শুধু তুলে ধরছি।
হয়তো যারা অনশন করেন বা তাদের সমর্থনকারী ও গুণগ্রাহীদের ভালো লাগবে না এই অপ্রিয় সত্য কথা। কিন্তু সত্য সত্যই আর তা' অপ্রিয়, এটা সকলেই জানে। হয়তো তর্কের খাতিরে উদারতার ভঙ্গিতে যুক্তির পর যুক্তি খাড়া করবে তারা অনশনকারীদের লড়াইকে সমর্থন জানানোর জন্য ও আমার বিরুদ্ধতা করার জন্য। আর, অনশনকারীকে সেই সমর্থনও গোড়া কেটে আগায় জল দেবার মত। যেমন, অনশন দাবী পূরণের এক কৌশল বা পদ্ধতি, তাও গোড়া কেটে আগায় জল দেবার মত। অনশন ক'রে সমস্যার সমাধান হয় না। সাময়িক হয়তো তার প্রভাব পড়ে, চিরস্থায়ী হয় না। হয়তো অনশনকারীর আত্মত্যাগকে নিয়ে নেপোয় মারে দইয়েরা এসে প্ল্যাটফর্ম হাইজ্যাক ক'রে নেবে, রাজনীতি যুক্ত হ'য়ে যাবে। অনশনকারীরা প্রায় সময়ই দেখা যায় তারা বলেন, তারা যে উদ্দেশ্যে অনশন করেন সেই উদ্দেশ্যের প্রতি প্রেম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা থেকেই অনশন করেন তাদের কোনও সংগঠন নেই, তারা কোনও দলের না। অথচ সংগঠন না থাকলেও তারা কারও না কারও সাহায্যে এই অনশনে বসার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শরীর-মন স্থির করেছেন, সময়, স্থান ঠিক করেছেন আর এটাই সংগঠনের প্রথম ধাপ এবং তারপর অনশনের মধ্যে দিয়ে হয় জমায়েত আর তা' ধীরে ধীরে সংগঠনে রূপ নেয়।

আর, অবশেষে দিনের শেষে আসল মুখের আবির্ভাব হয়।
এছাড়া, অনশনকারী বলছেন অনশনকারীর সঙ্গে অসংখ্য নেতাজীপ্রেমী দাদা, ভাই ও বোনেরা আছে। হ্যাঁ আছে, দেশ জুড়ে অসংখ্য নেতাজী প্রেমী আছে, তাদের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ আছে। কিন্তু এই অসংখ্য নেতাজী প্রেমীদের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পাড়ে দাঁড়িয়ে জলে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে সাহস ও পরামর্শ দেওয়ার মত। জলে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচাবার মত নয়। আর, আশীর্বাদ গাছের ঝড়া ফুল বা আকাশের বুক থেকে ঝ'রে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা নয়। আশীর্বাদ মানে অনুশাসনবাদ। যে অনুশাসন মানলে কাজে সফল হওয়া যায়, ফল লাভ হয়, মানুষের ও সমাজের মঙ্গল হয়, তাই-ই আশীর্বাদ। অনুশাসন না মেনে শুধু মাথায় হাত ছুঁইয়ে দিলে কিংবা আমার মত বালখিল্য লোকের 'আপনার লড়াইয়ে আমার সমর্থন ও আশীর্বাদ রইলো’ বলা এই কথা শুধু কথার কথা, আর সেই আশীর্বাদ প্রাণহীন। আশীর্বাদ রাস্তার বটতলার কোনও ঠুনকো খেলনা নয়। প্রচন্ড গরম, আকাশে কালো মেঘ করেছে কিন্ত বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই; যদি সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি না ঝ’রে দিন শেষে আরও প্রচন্ড গুমোট ছেড়ে দিয়ে মেঘ উড়ে যায় দূরে আরও দূরে আর অবশেষে মেঘের কোলে কোথায় হারিয়ে যায় তবে সেই কালো মেঘের কি মূল্য, কি প্রয়োজন,? অনশনও ঠিক তেমনি। যারা অনশবকারীকে আশীর্বাদ করছে, সমর্থন করছে তারা যদি সত্যি সত্যিই নেতাজীর অপমানের বদলা চায়, প্রতিকার চায় তাহ'লে তারা সবাই একইসঙ্গে অনশনকারীর সঙ্গে মঞ্চ ভাগ ক'রে নিক, একসঙ্গে সবাই অনশনে বসুক। আমার এ কথায় অনশনকারী বলতে পারেন বা তার গুণগ্রাহীরা বলতে পারে অপমানের বদলা চাই না, বদল চাই। কিন্তু দিন শেষে গিরগিটির রঙ বদলের চেয়েও দ্রুত রঙ বদলে অন্তসারশূন্য 'বদলা নয়, বদল চাই' পরিণত হয় 'বদল নয়, বদলা চাই'-এ । এটাই বাস্তব সমাজ কাঠামো, এর উল্টোটা ইউটোপিয়া। যার খপ্পরে প’ড়ে "পড়ি গেল কাড়াকাড়ি, আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান তারি লাগি তাড়াতাড়ি" প্রতিযোগিতা লেগে যায়। ফলে অনশনের উদ্দেশ্য গৌণ হ'য়ে যায় ও আন্দোলন ডিরেইল হ'য়ে পড়ে এবং পাওয়া গোল্লায় যায়।

এক অনশনকারী তাঁর অনশনের আগে বলছেন, আজ তাঁর সামনে এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার, কঠিন এক লড়াই, তিনি জানেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে, জানেন না কে পাশে থাকবেন, কে বাড়িয়ে দেবেন সাহায্যের হাত। এই অনশন তাঁর সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায়।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে কেন অনশনকারী এই কথা বলছেন? এ তো ভাবাবেগের কথা। যেখানে আবেগের চোটে ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বেগে বইছে। এসব ভাবনা তো নেগেটিভ ভাবনা, যার ফলে মানুষ নিজের অজান্তে ভেতরে ভেতরে দুর্বল হ’য়ে পড়ে। অনশনকারী তো জেনেশুনে এই ‘অনশন’ বিষ অমৃত ভেবেই পান করেছেন। তাই না? তাহ’লে কে পাশে থাকলো আর না-থাকলো, কে বাড়িয়ে দিল হাত আর কে দিল না তা জানার কি দরকার? সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায় তো অনশনকারী নিজে বেছে নিয়েছেন, তাই নয় কি? নাকি কেউ পিছনে জোর ক’রে বা মগজ ধোলাই ক’রে অনশনকারীকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে? অনশনকারী এই নতুন অধ্যায়ে আসার আগে এই অনশন বিষয়ে স্টাডি করেননি নাকি ভাবের আবেগে নেতাজী ব’লে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পরিবার পরিজন থাকা সত্ত্বেও? অনশনকারীর পরিবার যখন আছে, অনশনকারী পরিবার যখন করেছেন তখন পরিবারের প্রতি তো তাঁর দায়বদ্ধতা আছে নাকি? ছেলেমেয়ের প্রতি, স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি, বাবা-মায়ের প্রতি বা পরিবারের অন্যান্যদের প্রতি পারিবারিক অভিভাবক বা অভিভাবিকা হিসেবে একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে অনশনকারীর। তাই না? এর দায় দায়িত্বের পরেও ক্ষুদ্র গন্ডী থেকে বেড়িয়ে এসে সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে এসেছেন অনশনকারী আত্মত্যাগের মাধ্যমে নেতাজীর সম্মান রক্ষা করতে। তাহ’লে এসব কথা এখন অনশনকারী ভাবছেন কেন? এতে তো মন মুষড়ে পড়বে, ছেলে মেয়ে, স্বামীস্ত্রী, বাবা-মা, পরিবার, অনিশ্চয়তার অন্ধকার, অজানা ভবিষ্যৎ, একাকীত্ব বোধ, নতুন অধ্যায়ের পথে অজানা, অচেনার ভয় ইত্যাদি ভাবনা অনশনকারীকে গ্রাস করবে, অনশনকারী মানসিক দুর্বল হ’য়ে পড়বেন, শরীর আর সাপোর্ট করবে না।

তাই, অনশনের সময় যত এগিয়ে আসবে বা অনশনের দিনগুলিতে আর এসব ভাবা উচিত নয় অনশনকারীর। এর থেকে প্রতিবাদের জন্য অন্য রাস্তা বেছে নিতে পারতেন অনশুনকারী। আরও অনেক রাস্তা আছে প্রতিবাদের। অনশন একটা গিমিক, একটা প্রচার কৌশল, এর প্রভাব অস্থায়ী। অনশন ক’রে কারও চরিত্র বা মানসিকতা পাল্টানো যায় না। অনশন ক’রে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বা বিপ্লব সংগঠিত হয়না। কাউকে অপমান, অসম্মান, অশ্রদ্ধা, নিন্দা, গালিগালাজ, কুৎসা, কলঙ্ক লেপন করার শিক্ষা, রুচি, মানসিকতার পরিবর্তন কারও অনশন করা না-করার ওপর নির্ভর করে না। তারা এইসব অনশনকে গিমিক ভাবে আর এই গিমিককে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। সেটাই তাদের বৈশিষ্ট্য। এই সমস্ত অশিক্ষা ও কুশিক্ষাগুলির পরিবর্তন বা সুশিক্ষা সব একেবারে শৈশব অবস্থা থেকে সঠিক ও নিখুঁত পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, স্কুল শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, রাজনৈতিক শিক্ষা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। নির্ভর করে প্রথম ও প্রধান বায়োলজিক্যাল মেক আপ-এর ওপর।

আচ্ছা অনশনকারী কি মনে করেন, অনশনকারী অনশনে বসলেই নেতাজীর প্রতি অসম্মান বন্ধ হ’য়ে যাবে? আর কেউ কোনওদিনও নেতাজিকে অপমান অসম্মান, গালিগালাজ করবে না? মানুষের মানসিকতা বদল হ’য়ে যাবে, শুভবুদ্ধির উদয় হবে? দেশজুড়ে সম্মান, শ্রদ্ধা, প্রেম ভালোবাসা, প্রশংসার ঝড় ব’য়ে যাবে? মানবতার জন্ম হবে ও মানবিকতার প্রকাশ ঘটবে?

আর শুধু নেতাজীর প্রতি অসম্মান নিয়ে কেন অনশন ও আন্দোলন? নেতাজীর প্রতি এখন এই প্রথম অপমান, অসম্মান হয়েছে? এর আগে কোনওদিনও হয়নি? স্বাধীনতার সময়ে ও তার পর থেকে নেতাজীর প্রতি অসম্মান, অপমান হয়নি? বাংলায় বাংলার আর কোনও বরেণ্য নেতার প্রতি, মহাপুরুষের প্রতি অপমান, অসম্মান হয়নি? হচ্ছে না প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত? কে বা কারা করেছে? কে বা কারা করছে? নেতাজীকে যারা অপমান, অসম্মান করেছে ও করছে তারা বাংলার মনিষীদের অপমান অসম্মান করেনি, করছে না? বর্তমানে দেশজুড়ে বাংলা তথা ভারতের নেতানেত্রীদের, মহাপুরুষদের অপমান, অসম্মান, কুৎসা, নিন্দা, অশ্লীল গালাগালি, বদনাম, কলঙ্ক লেপন করা হচ্ছে না? এটা কি বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি? ভারতের কৃষ্টি, সংস্ক্ররতি? এই অপসংস্কৃতিকে সামগ্রিকভাবে কেন দেখা হয় না, ভাবা হয় না? কেন এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে দল মত নির্ব্বিশেষে সামগ্রিকভাবে আন্দোলন সংগঠিত হয় না? কোথায় অসুবিধা? কোথায় ফাঁক?
যাই হ’ক, শুধু বলি, অনশন করলে যা হবার তাই হয়। শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়, পেশী ক্ষয় হতে শুরু করে, রক্তচাপ কমে যায় এবং তীব্র দুর্বলতা, মাথা ঘোরানো ও অঙ্গহানি বা অর্গান ফেইলিওর হতে পারে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হয়।

তাই, কথায় কথায় অনশন করার মধ্যে দিয়ে শুধু সাময়িক দাবী আদায় হয় বা প্রতিশ্রুতি আদায় হয়, কোনও শুভবুদ্ধির উদয় হয় না, মানবতার জন্ম হয় না ও মানবিকতার প্রকাশ ঘটে না, যার দ্বারা সমাজে চিরস্থায়ী কোনও কিছুর সমাধান হয় না এবং শুধু রাজনৈতিক লাভ ও নিজের ভাবমূর্তির জন্য ব্যবহার হয়, এই ধরণের একটা গিমিক, একটা প্রচার কৌশল যার প্রভাব অস্থায়ী, তেমন কিছু পথের প্রতি আমি আকৃষ্ট ন’ই। এতে অনশনের গুরুত্বটাই জোলো হ'য়ে যায়, যেটা আমরা সোনম ওয়াংচুর ক্ষেত্রে দেখেছি। অনশন যেন একটা গুরুত্বহীন সস্তা ব্যাপার, হাতের ময়লা।

মৃত্যুকে হাতিয়ার ক’রে কোনও কিছু অর্জনে আমার অনীহা, কারণ আমি কারও জীবন ফিরিয়ে দিতে পারি না, ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি নিজে যেমন বাঁচতে চাই, তেমনি একইভাবে অন্যকেও বাঁচাতে চাই।

পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বললেন,
“মরো না, মেরো না, পারো তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত করো।“
প্রকাশ বিশ্বাস।
ভদ্রকালী, উত্তরপাড়া।
( লেখা ১২ই আগষ্ট'২৬ বুধবার)


 


No comments:

Post a Comment