Powered By Blogger

Monday, August 17, 2026

প্রবন্ধঃ শত্রুতার ডিম ফুটে চলা স্বাধীনতার ৮০ বছর।

আজ ১৫ই আগস্ট' ২০২৬ বৃহস্পতিবার ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র ক'রে ও দেশনায়কদের নিয়ে নানা বিতর্ক ও অশ্লীল কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হ'য়ে চলেছে আজও ৮০বছর ধ'রে। গতকাল ১৪ই আগস্ট ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা সম্পর্কে কংগ্রেসের বক্তব্য ছিল, এই স্বাধীনতার অর্থ "নতুন ভোরের সূচনা", আর, মুসলিম লীগের কাছে তা ছিল "নতুন দেশের জন্ম", এবং ডানপন্থী ও চরম বামপন্থীদের কাছে তা ছিল যথাক্রমে "দেশভাগের ট্র্যাজেডি" এবং "বুর্জোয়াদের আপস"।

এই নিয়ে আজও ৮০ বছর পরেও চলেছে আমার দেশের অভ্যন্তরে সব দলেদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই ও হিন্দু-মুসলমানের লড়াই এবং হিন্দু-হিন্দুর লড়াই।

কেউ বলছে মুসলমানদের যখন আলাদা দেশ হ'লো, মুসলমানেরা যখন তাদের জাতের বা তাদের ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য একটা আলাদা দেশ দাবী ক'রে লড়াই ক'রে আলাদা ভূখন্ড আদায় ক'রে নিল তখন কেন হিন্দুরা হিন্দুদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ভূখন্ড করলো না? কেন ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হ'লো না, কেন হিন্দুদের নিজস্ব স্বাধীন দেশ হ'লো না? তাদের যুক্তি, অখন্ড ভারতবর্ষ ভাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন মুসলমানদের জন্য যে আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হ'লো, মুসলমানদের কাছে এই স্বাধীনতার অর্থ ছিল, "একটি নতুন মুসলিম রাষ্ট্র—পাকিস্তান অর্জন"। ঠিক তেমনি এই ভারত ভাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার অর্থ একটি নতুন হিন্দু রাষ্ট্র------হিন্দুস্তান অর্জন কেন হ'লো না সেটাও হিন্দুদের প্রশ্ন। যদিও এর তীব্র বিরোধীতা করেছে ও ক'রে চলেছে ভারতের হিন্দুরা।

আবার কেউ বলছে, দেশভাগের মধ্যে দিয়ে ভারত যদি 'হিন্দুস্তান রাষ্ট্র' না হ'য়ে থাকে তাহ'লে তাকে সংবিধান রচনার ২৬ বছর পরে কেন সংবিধান পরিবর্তন ক'রে 'ধর্ম নিরপেক্ষতার' তকমা জুড়ে দেয়া হ'লো? কেন ও কিসের উদ্দেশ্যে এটা করা হ'লো? কেউ কেউ বলছে, সংবিধান রচয়িতা ড আম্বেদকর এই ''ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র' কথার কেন তীব্র বিরোধী ছিলেন। কেন তিনি ১৯৪৮ সালের ১৫ই নভেম্বর গণপরিষদের বিতর্কে অধ্যাপক কে. টি. শাহের "ভারতকে "Secular, Federal, Socialist Union of States" হিসেবে ঘোষণা করা হোক" এই প্রস্তাব খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ড. আম্বেদকর কেন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?

এইভাবে নানা ভাবনার আলোয় আলোকিত ভারতের কিশোর থেকে বৃদ্ধ সব মানুষ আজ মনের দিক থেকে সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন। বিশেষত দেশের ইয়ং জেনারেশন অর্থাৎ দেশের তরুণতরুণী, যুবকযুবতী, যাদের আজ বালখিল্য আধুনিকতার মোড়কে বেঁধে ফেলা হয়েছে জেন জি নামে তাদের সামনে আজ কোনও নির্দিষ্ট উপযুক্ত 'আদর্শ' নেই। নানারকম কপট ছদ্ম আদর্শ, নেতা, শিক্ষক, ধর্মগুরুদের ও তাদের ছদ্ম দর্শন, ছদ্ম নীতি ও আন্দোলন, ছদ্ম শিক্ষা ও কথন শুনে শুনে আজ নানারকম রঙে রাঙিয়ে গিয়ে একেবারে Mental identity হ'য়ে পড়েছে ও পড়ছে ক্রমশ। আর জড়িয়ে পড়ছে নানারকম জটিলতায় আর চরম এলোমেলো হ'য়ে যাচ্ছে জীবন।

যাই হ'ক, ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে আজ এটাই সত্য যে, কংগ্রেসের "নতুন ভোরের সূচনা", মুসলিম লীগের "নতুন দেশের জন্ম", এবং ডানপন্থী ও চরম বামপন্থীদের কাছে "দেশভাগের ট্র্যাজেডি" এবং "বুর্জোয়াদের আপস" ইত্যাদি যে যাই বলুক না কেন, আসল সত্য হ'লো বিশাল দেশ ভারতকে টুকরো টুকরো করাই ছিল বৃটিশের আসল এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সঙ্গে তৎকালীন বিশ্বের অন্যান্য বৃটিশের মিত্র শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোরও তাই ইচ্ছা ছিল। যাতে ভবিষ্যতে কোনোদিন তাদের সমকক্ষ হ'তে না পারে ও তাদের কাছে চ্যালেঞ্জ হ'য়ে দাঁড়াতে না পারে। এ কথা বোঝার ক্ষমতা মেন্টাল আইডেন্টিটিহীন তরুণতরুণী, যুবকযুবতীদের নেই।

তাই, সেইসময়ে অর্থাৎ ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামে দু'টুকরো হ'লেও বৃটিশদের দূরদর্শী পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭১-এ হয়েছে তিন টুকরো। জন্ম হয়েছে ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ আজ ভারতের ঘরে ও ভারতের বাইরে চলেছে ভারতকে ভয়ঙ্করভাবে আরও টুকরো করার ঘৃণ্য, বিষাক্ত ষড়যন্ত্র। এছাড়া আমরা দেখতে পেয়েছি ও পাচ্ছি ভারত থেকে একসময়ে আলাদা হওয়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বর্তমান ভয়ংকর নারকীয় আভ্যন্তরীণ অবস্থা। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিন দেশের অভ্যন্তরে চলছে বীভৎস শত্রুতার ও ভাঙ্গনের খেলা। এ খেলার খেলোয়াড় সব তিন দেশের হৃষ্টপুষ্ট নাগরিক আর কোচ ও রেফারি বৃহৎ কোনও শক্তিধর রাষ্ট্র।

পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভারতের তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশের পাবনা জেলার হিয়াইতপুর গ্রামে থাকতেন। ১৮৮৮ সালে তাঁর সেখানে জন্ম। তখন তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত দেশের হিন্দু মুসলিম সমস্ত দেশনেতাদের উদ্দেশ্যে বারবার ভারত ভাগ না করার কাতর আবেদন করেছিলেন এবং পাঞ্জাব ও বাংলাদেশ যাতে ভাগ না হয় তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর কথা কোনও দেশনেতা শোনেননি। তখন দ্রষ্টাপুরুষ ব্যথাতুর শ্রীশ্রীঠাকুর ভবিষ্যৎ ভয়ংকর ভারতের করুণ নির্ম্মম নারকীয় অবস্থা আগাম দেখতে পেয়ে বলেছিলেন,

"Dividing compromise is the hatch of animosity." যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, "দেশ ভাগ ক'রে সমস্যার সমাধান করার অর্থ 'তা' দিয়ে দিয়ে শত্রুতার ডিম ফোটানো।"

আজ স্বাধীনতার ৮০বছর ধ'রে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বলে যাওয়া নির্ম্মম সত্য 'শত্রুতার ডিম' তিন দেশের অভ্যন্তরে অনবরত ফুটে চলেছে। এই ডিম ফোটার ট্রাডিশান হয়তো ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে।

যাই হ'ক, সবাই সবার মনের কথা বলুক, এটা প্রত্যেকের বাক স্বাধীনতা। আর তা' আগামীতে ধ্বংস ডেকে আনুক কিংবা সৃষ্টির উল্লাস সৃষ্টি করুক। সবাই সবার মনের কথা ভাল মন্দ যা ইচ্ছা তাই বলবে, এ তো ভালো কথা কিন্তু কেউ কারও মনের মত হবে না। আসলে সবার মনের মত হওয়ার চেষ্টা করাটাই ভুল। কারণ, কেউ মানুক না-মানুক এখন বর্তমান সময় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘোর কলি যুগ। তাই এখন মনের জগতে সবাই অস্থির ও নেগেটিভ। তাই কেউ কারও মনের মত হ'তে পারবে না। আমিও হ'তে পারবো না, কেউ আমারও মনের মত হবে না।

তাই, আমি নিজেকে নিজে বলি, তুমি একমাত্র ঈশ্বরের আর কারও না, আর তাই তুমি ঈশ্বরের মনের মত হওয়ার চেষ্টা করো, তা'হ'লে হয়তো সবার মন জয় করলেও করতে পারবে, না করতে পারলেও কোনও দুঃখ নেই। আর এর ফলে পৃথিবী একদিন হয়তো হ'লেও সুন্দর হ'তে পারে।
প্রকাশ বিশ্বাস,
ভদ্রকালী, উত্তরপাড়া।


No comments:

Post a Comment