অর্থাৎ তিনি সমগ্র জীবনে, তাঁর ৮১ বছর চলনে, বলনে, চিন্তায়, সেবায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এবং পরদিন সূর্যোদয় পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্তে তাঁর শারিরিক-মানসিক-আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থান এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে সবকিছুই Automatically generated অর্থাৎ জন্ম থেকে দেহ ত্যাগ করা পর্যন্ত সব কিছুই স্বতঃ উৎসারিত ছিল তাঁর সমগ্র জীবনে, কোনো কিছুই তাঁকে বিন্দুমাত্র কষ্ট ক'রে বা চেষ্টা ক'রে করতে হ'তো না, যা পৃথিবীতে আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না, যা কিনা অস্বাভাবিক মনে হ'তো।
শ্রীশ্রীঠাকুর যখন কথা বলতেন তাঁর কথা বলার ধরণের মধ্যে শিশুর সারল্য ছিল, যখন তিনি বাণী দিতেন তখন ছড়া, বাণীগুলি পাহাড়ি ঝর্ণার মত অনবরত বাধাহীন ঝমঝম শব্দে স্বাভাবিক ছন্দে ঝ'রে পড়তো আর চারপাশ মোহিত হ'য়ে যেত। যখন তিনি হাসতেন সেই হাসিতে শিশুর হাসির ঝিলিক দেখা যেত, সেই হাসিতে থাকতো সরলতা, বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা। আর সেই হাসির মধ্যে দিয়ে আলোর ঝরণাধারার মত সহজতা তাঁর সারা শরীর ছাপিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তো উপস্থিত মানুষের মধ্যে।
তাই, তাঁকে Abnormally normal অর্থাৎ অস্বাভাবিক ভাবে স্বাভাবিক মানুষ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এই অবস্থা একমাত্র তাঁর হয় যিনি ইষ্টের সঙ্গে In tune ( একতান) থাকেন। আর, শ্রীশ্রীঠাকুর স্বয়ং নামের নামী পুরুষ ছিলেন আর ছিলেন তাঁতে অর্থাৎ নিজের সঙ্গে In tune (একতান). তিনি নিজেই ছিলেন সৃষ্টির Central point অর্থাৎ কেন্দ্রবিন্দু, যখন 'ছিল না'-র অস্তিত্ব ছিল অর্থাৎ যখন কিছুই ছিল না, তখনও শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন অর্থাৎ সময়, স্থান, বা সৃষ্টির পূর্বে তখনও শ্রীশ্রীঠাকুর একজন অনির্বচনীয় সত্তা বা শক্তি হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন, পরম সত্তা হিসেবে ছিলেন, অনন্ত সম্ভাবনার মধ্যে সুপ্ত ছিলেন।
বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছুই ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। তিনিই ছিলেন স্রষ্টা। যখন কিছুই ছিল না তখনো তিনি ছিলেন, যখন একে একে সব সৃষ্টি হ'লো তখনো তিনি ছিলেন এবং যখন কিছুই থাকবে না তখনও তিনি থাকবেন। সমাধি অবস্থায় শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, "যখন 'ছিল না'-র সত্ত্বা ছিল, যখন কাল আসেনি, যখন শব্দ ছিল, যখন সূর্যের-চাঁদের সৃষ্টি হয় নাই, যখন বিরাট গগনের সৃষ্টি হয় নাই, তখন এক বিরাট ধ্বনি সোহহং পুরুষ ভেদ ক'রে সৃষ্টি করতে চলে এল---সেই ওম।" সেই 'ওম' বিরাট ধ্বনি-ই হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, আর যে সোহহং পুরুষ ভেদ ক'রে বিরাট ধ্বনি 'ওম' সৃষ্টি করতে চলে এলো সেই সোহহং পুরুষও হলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এবং তাঁর পূর্ব রূপেরা। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর সমাধি অবস্থায় পরিষ্কার বললেন, "I was the sound, Sound is my creation; therefore you are created by me." আমি ছিলাম শব্দ, শব্দ আমার সৃষ্টি; তাই তুমি আমার দ্বারা সৃষ্ট।"
আবার আমরা বাইবেলেও দেখতে পাই সেই একই কথার প্রতিধ্বনি, "In the beginning was the Word, and the Word was with God, and the Word is God".অর্থাৎ আদিতে বাক্য ছিলেন, বাক্য ঈশ্বরের সঙ্গে ছিলেন, এবং বাক্যই ঈশ্বর”।
তাই, তাঁর সমগ্র জীবনটাই, জীবনের সবকিছুই ছিল Gorgeously simple অর্থাৎ জাঁকজমকপূর্ণ অথচ সহজ সরল, ছিল Abnormally normal মানুষ অর্থাৎ অস্বাভাবিক ভাবে স্বাভাবিক মানুষ এবং তিনি অদ্ভুত এক বুদ্ধিমান বোকা মানুষ ছিলেন অর্থাৎ ইংরেজিতে তাকে বলা হ'তো Wisely foolish!!!! জাগতিক ও মহাজাগতিক এমন কোনও বিষয় ছিল না যা তিনি জানতেন না। তাঁর সমগ্র জীবনে ৮১বছর ধ'রে ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প, বিবাহ, প্রজনন, সাহিত্য, নাটক, গান, অভিনয়, চিকিৎসা, আইন ইত্যাদি ইত্যাদি জগতের সমস্ত বিষয়ের ওপর ব'লে যাওয়া তাঁর ২৪ হাজার বাণী, অজস্র প্রশ্নোত্তর পর্ব ও কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে জগতের সমস্ত সমস্যার নিখুঁত চিরকালীন সমাধান প্রমাণ করে তিনি ছিলেন সর্ব্বজ্ঞ। আর যখন বলতেন, তখন তাঁর ভঙ্গী ছিল, একজন লেখাপড়া না জানা অজ্ঞ মানুষের মতন। উচ্চশিক্ষিত পন্ডিত বিদ্বান, জ্ঞানী মানুষের সামনে তিনি অসহায় বোধ করতেন। আলাপ আলোচনার সময় বিশিষ্ট জ্ঞানী, পন্ডিত, বিদ্ধান, বুদ্ধিমান, শিক্ষিত মানুষদের সামনে বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, আমি মুখ্যু মানুষ, লেখাপড়া শিখিনি, পুঁথিগত বিদ্যা আমার নেই, আপনারা জ্ঞানী মানুষ, পন্ডিত মানুষ, আমি কি বলতে কি বলেছি, কিছু মনে করবেন না। তারপর বিশিষ্ট জ্ঞানী, পন্ডিত, বিদ্ধান, বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ব্যক্তিরা চলে যাবার পর তিনি উপস্থিত কেষ্টদা ও অন্যান্য বিশিষ্ট ভক্তদের বারবার জিজ্ঞেস করতেন, 'তিনি কিছু ভুল বলেছেন কিনা। অতিথিরা যাবার সময় কোনও ভুল ধারণা নিয়ে গেল কিনা।' সেইসময় ঠাকুরকে একেবারে অসহায় শিশুর মত লাগতো।
তাই তাঁকে Abnormally normal মানুষ বলা ছাড়াও Gorgeously simple, ও Wisely foolish বলা হ'তো।
আমার উপলব্ধি জানালাম, অন্য কারও অন্যরকম হ'তে পারে।

No comments:
Post a Comment