Powered By Blogger

Thursday, November 30, 2023

চিঠি আমার বন্ধু ...................কে,

কি আর করা যাবে বন্ধু। ভালোবেসে কিই বা আর দিতে পারি বা করতে পারি? আমার ক্ষমতাই বা কতটুকু। তবুও পাশে আছি বন্ধু। শুধু এটুকু বলতে পারি, পদক্ষেপ যখন ভুল হয়েই গেছে, ফিরে আসা যদি আর নাই হয় তখন মাঝপথে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কি লাভ আর কি লাভ মাঝপথে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে? এগিয়ে যাও। পিছন ফিরে আর তাকিয়ো না বন্ধু। কথায় আছে, ‘ভাবিয়া করিয়ো কাজ, করিয়া ভাবিয়ো না’। ভেবে যখন কাজ করা হয়নি তখন ভুল ক'রে ফেলার পর আর সেই ভুল ভেবে ভেবে ক্লান্ত, হতাশ, আর বিধস্ত না হ'য়ে একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে বুক ফাটো ফাটো ক'রে ‘হে ঈশ্বর ক্ষমা করো, বাড়িয়ে দাও তোমার হাত, আর আমায় গ্রহণ করো’ ব'লে দু'হাত বাড়িয়ে দাও তাঁর দিকে আর গভীর বিশ্বাসে শেষবারের মত উঠে দাঁড়াও শরীরে-মনে সর্ব্বশক্তি নিয়ে তাঁকে জীবনে গ্রহণ করার জন্য। তারপর গভীর বিশ্বাসে ঐ দশদিক ঘেরা মোহের ইন্দ্রজালকে ছিঁড়ে ফেল দু'হাত দিয়ে একটানে এক নিশ্বাসে আর এগিয়ে যাও তাঁর নামে ধ্বনি দিতে দিতে সামনের দিকেই। দেখবে সামনের ঐ নরকের পথ তাঁর নামের ইন্দ্রজালে অদৃশ্য হ'য়ে স্বর্গের পথ খুলে গেছে, সামনের ঘোর অন্ধকার কেটে গিয়ে ফুটে উঠেছে ভোরের নরম স্নিগ্ধ আলো কোন জাদুবলে আর সামনের নিশ্চিত শ্মশান ঢেকে গেছে স্বর্গের পারিজাত গাছের ফুলে ফুলে!!!!!!!!!!!!!!!

বন্ধু, পথের আর কি দোষ? কোন দোষ নেই, একথা ঠিক, যেমন ঠিক 'পদক্ষেপ ভুল'। শুধু সাবধান ক'রে দিই বন্ধু, তাঁর দয়ায় নিশ্চিত মৃত্যুকে জয় ক'রে আবার দ্বিতীয়বার যেন ঐ ভুল পথ, সর্বনাশা পথ হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে না যায়; আর যেন পদক্ষেপ ভুল না হয়! পথ পথের কাজ করবেই, তুমি তোমার কাজ কোরো বন্ধু। সেখানে যেন কোনো ভুল না হয় আর। 

এই প্রসঙ্গে The greatest phenomenon of the world Sri Sri Thakur Anukul Chandra-এর একটা কথা মনে পড়ে গেল:

“অনুতাপ কর; কিন্তু স্মরণ রেখো যেন পুনরায় অনুতপ্ত হ’তে না হয়। যখনই তোমার কুকর্ম্মের জন্য তুমি অনুতপ্ত হবে, তখনই পরমপিতা তোমাকে ক্ষমা করবেন; আর, ক্ষমা হ’লেই বুঝতে পারবে, তোমার হৃদয়ে পবিত্র সান্ত্বনা আসছে; আর, তা’ হ’লেই তুমি বিনীত, শান্ত ও আনন্দিত হবে। যে অনুতপ্ত হ’য়েও পুনরায় সেই প্রকার দুষ্কর্মে রত হয়, বুঝতে হবে সে সত্বরই অত্যন্ত দুর্গতিতে পতিত হবে। শুধু মুখে-মুখে অনুতাপ অনুতাপই নয়, ও আরও অন্তরে অনুতাপ আসার অন্তরায়। প্রকৃত অনুতাপ এলে তার সমস্ত লক্ষনই অল্পবিস্তর প্রকাশ পায়।"
(লেখা ৩০শে নভেম্বর'২০১৫)

উপলব্ধিঃ অসহায় আর্তনাদ


ডঃ প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি!
হায়দ্রাবাদ বেঙ্গালুরু জাতীয় সড়কের ধারে তোমার পোড়া শরীর পাওয়া যায়! তন্দুপল্লী টোল প্লাজা এরিয়ায় পার্ক করা ট্রাকের মধ্যে তোমায় রেপ করা হয়। তারপর তোমার শরীরে নির্ম্মম ভাবে আগুন লাগিয়ে তোমায় পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়।

শোনা যায় অপরাধী দরিন্দাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন চলবে বিচার। কতদিন চলবে তার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই।

কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে সূর্য উঠবে, সূর্য অস্ত যাবে। দিন হবে! দিন কেটে রাত হবে, রাত কেটে আবার দিন হবে! সময় এগিয়ে যাবে তার নিয়মে। কারও বাধা, অনুরোধ-উপরোধ সে মানে না, মানবে না। সব চলবে স্বাভাবিক নিয়মে। মাঝে মাঝে অতি বিপ্লবীর স্লোগান উঠবে, একটু-আধটু বিদ্রোহের গান হবে, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হঠাৎ জেগে উঠবে প্রতিবাদের ঝড়! তারপর সব চুপচাপ!

তোমার কি হবে প্রিয়াংকা!? তুমি তো আর ফিরে আসবে না। কেউ তোমার খোঁজ রাখবেও না, নামও মনে রাখবে না। তোমার শরীরের উপর দরিন্দাদের নির্ম্মম ভাবে অত্যাচার, যন্ত্রনায় ক্ষতবিক্ষত শরীর কেউ মনে রাখবে না। মনে রাখবে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার নাম, আলোচিত হবে চ্যানেলে চ্যানেলে তার বিয়ের একবছরের মাথায় সন্তান জন্মের কাহানি! কিন্তু রাস্তায় নেবে কেউ বিস্ফোরক আগুন ঝরা প্রতিবাদ করবে না। যে প্রতিবাদী চরিত্রগুলি দু'দিন আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে তান্ডব চালিয়েছিল তারা সব নীরব! চুপিচুপি দিয়েছে গা ঢাকা!!!!!

তাই বলি প্রিয়াঙ্কা,
তুমি নারী! তুমি পুরুষের ভোগের বস্তু! তুমি সস্তা! তুমি দস্তুর! আবহমানকাল ধ'রে চলে আসা বলাৎকারের প্রথা!!!!!!! তাই সব চুপ! সবাই নিশ্চুপ!! তুমি তো নারী! এই দেশে কত ক্ষমতাধর নারী! রাজনীতির আঙিনায় অগুনতি বিদ্রোহের আগুন ছেটানো আগুন নারী! অথচ তারা সবাই চুপ!!!!!!!!!!!!! এই আমার ভারতবর্ষ! এই আমার ভারতের ক্ষমতাধর যত আগুনখেকো নারী!!!!!!!

এই লেখা লিখতে লিখতে তোমার জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে দু'ফোটা চোখের জল কখন বেরিয়ে চোখ ঝাপসা ক'রে দিয়েছে জানি না, শুধু অসহায় আর্তনাদ ঝড় তুলছে মনের গভীরে চারপাশে সব ঝাপসা হ'য়ে যাচ্ছে দেখে।
---------প্রবি।
(লেখা ৩০শে নভেম্বর'২০১৯)

Monday, November 20, 2023

প্রবন্ধঃ তুমি কি সৎসঙ্গী?

হে আমার প্রিয়,
সৎসঙ্গীর সংজ্ঞা ঠাকুর কি দিয়েছেন তা তুমি জানো তো? ঠাকুরের দীক্ষা নিলেই কি সৎসঙ্গী হ'য়ে যায়? তুমি কি নিজেকে সৎসঙ্গী ব'লে মনে করো? রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণের অনুগামীরা কি সৎসঙ্গী নয়? জীবন্ত ঈশ্বর ছাড়া নিরাকার ঈশ্বর বা মূর্তির একনিষ্ঠ পূজারী যারা তাঁরা কি সৎসঙ্গী নয়? সৎসঙ্গ বা সৎসঙ্গীর ব্যাপক অন্তর্নিহিত অর্থ কি? যদি মনে করো তুমি ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষা নিয়েছো আর সৎসঙ্গী হ'য়ে গেছো তাহ'লে মূর্খের স্বর্গে বাস করছো।

আর, দায়সারা গোছের তাঁর দীক্ষা নিলেই যে তাঁর দয়ার অধিকারী হওয়া যায় তা কিন্তু নয়। বিধি থেকে বিধাতা। তিনি বিধির বাইরে যান না। যদি তাই হ'তো তাহ'লে সৎসঙ্গীদের জীবনে, সৎসঙ্গীদের সংসারে এত দুঃখ, কষ্ট, বিপদ আপদ থাকতো না। তাঁর দয়ার বাতাস সবার জন্য বইছে। যে তার শরীরের, মনের, আত্মার দরজা, জানালা খুলে রাখবে তার জীবনেই তাঁর দয়ার বাতাস ঢুকবে, ব'য়ে যাবে; নতুবা নয়। যে আলোর দিক থেকে অর্থাৎ তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে আর অন্ধকার অন্ধকার অর্থাৎ দুঃখ, কষ্ট, জ্বালা, যন্ত্রণা ব'লে চীৎকার করবে সেক্ষেত্রে দয়ালের চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ছেলে যদি বাপকে না মানে, বাপের অনুশাসন না মানে তাহ'লে বাপের যেমন কিছু করার থাকে না ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও তাই। বাস্তবে আমার তোমার ঘরের পিতামাতার মতো। সেক্ষেত্রে তোমার না বুঝে বলা ঈশ্বর 'স্বার্থপর" কথাই ঠিক। হ্যাঁ! তোমার বোধ অনুযায়ী ক্ষুদ্রতর অর্থে তিনি স্বার্থপর! তিনি বিশেষ কাউকে দয়া করেন আর কাউকে করেন না তা নয়। তিনি দয়ার সাগর! যে ডুব দিয়েছে সেই সাগরে সেই তাঁর দয়ায় স্নান করেছে। তাঁর দয়ার সাগরে অর্থাৎ বিস্তারে তোমার অস্তিত্ব হারাও। সৎ-এর সঙ্গী হও। অর্থাৎ সত্ত্বার সত্ত্বা পরমসত্ত্বায়, অস্তিত্বের অস্তিত্ব পরম অস্তিত্ব, আত্মার আত্মা পরমাত্মায় মিলিত হও, লীন হও তখন আর তোমার আলাদা অস্তিত্ব ব'লে কিছু থাকবে না। নুনের পুতুলের মতো নোনা জলে গলে যাবে। বগবগানি আর থাকবে না। ঈশ্বর আমার বাপের চাকর না। ঈশ্বর আমার জমিদারী নয় যে আমি যা ইচ্ছা তাই তাঁকে ব্যবহার করবো, তাঁকে দিয়ে করাবো। তাই জেনেবুঝেই আমার আগের লেখায় সৎসঙ্গীর আগে 'প্রকৃত' শব্দ ব্যবহার করেছি। বাঁচতে যদি চাও, অস্তিত্বের বিনাশ যদি না চাও, বাড়তে যদি চাও, তাঁর দয়া যদি পেতে চাও, অকাল মৃত্যু যদি না চাও, দীর্ঘায়ু যদি চাও, রোগ, শোক, গ্রহদোষ, বুদ্ধি বিপর্যয়, দারিদ্রতার হাত থেকে যদি নিস্তার পেতে চাও তাহ'লে এই 'প্রকৃত সৎসঙ্গী' হ'য়ে ওঠা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই, পন্থা আমার জানা নেই।

বুক ভরা হিংসা, মানুষকে অপমান, অশ্রদ্ধা করা, কটু কথার আঘাত করা, সহ্য না করা, অন্যের দোষত্রুটি ধরা, নিন্দা, কুৎসা করা, গুরুজনকে, শ্রেষ্ঠকে, বড়কে না মানা, সম্মান, সমীহ না করা, পদে পদে অপদস্ত করা, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা করা, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির, শ্রেষ্ঠজনের বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচার করা, গালাগালি করা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো, ষড় রিপুকে লাগামছাড়া ব্যবহার করা, বৃত্তি-প্রবৃত্তির দাসত্ব করা ইত্যাদি নারকীয় গুণের অধিকারী কি সৎসঙ্গী হ'তে পারে?

হে আমার প্রিয় সৎসঙ্গী, তুমি কি এগুলির একটারও অধিকারী?
(২০শে নভেম্বর/ ২০২২)

Thursday, November 16, 2023

গল্পঃ গ্রিন সিগন্যাল ( সত্য ঘটনা অবলম্বনে )।

আজ একটা অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হ'য়ে রইলাম।

জানি না এই ঘটনাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করবো। সত্যি সত্যিই কি এই ঘটনার পিছনে কোনও অলৌকিকতা লুকিয়ে আছে নাকি সবটাই স্বাভাবিক এক ঘটনা? আমরা যারা ঈশ্বর পূজারী, ঈশ্বরে বিশ্বাসী তারা এই ঘটনার পিছনে ঈশ্বরের অপার করুণা ব'লে মনে করি, অলৌকিক ঘটনা ব'লে ভাবি আর যারা আমরা সাধারণ-অসাধারণ ঈশ্বর অবিশ্বাসী নাস্তিকের পূজারী তারা একে এক স্বাভাবিক ঘটনা বা প্রশাসনিক অব্যবস্থা বা যান্ত্রিক ত্রুটি কিম্বা কাকতালীয় ঘটনা ব'লে বর্ণনা করি।

যাই হ'ক, যে যে রকমভাবে ভাবুক, যে যে দৃষ্টিকোণ দিয়ে ঘটনাকে বিচার ক'রে করুক সেটা তার তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর দাঁড়িয়ে তা করে। আমি শুধু ভাবি সেই শেক্সপিয়ারের 'হ্যামলেট' নাটকের বিখ্যাত উক্তি; যা শ্রীশ্রীঠাকুরের খুবই প্রিয় উক্তি ছিল। তিনি প্রায়ই কথাপ্রসঙ্গে ভাবময় অবস্থায় উদাত্ত কণ্ঠে তা বলতেন, "There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy," যার অর্থ "স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে আরও বহু জিনিস আছে, হোরেশিও, যা তোমার দর্শনের পাল্লার বাইরে ও অতীত।"
ঠিক তেমনি একটা ঘটনার কথা আজ আমি বলবো আমার প্রিয়জনদের কাছে।

কয়েকদিন ধরেই একটা জরুরী কাজে দেওঘরে যাবার একটা কথা চলছিল। মেয়ের সম্প্রতি নোতুন কোম্পানিতে ডিরেক্টর পদে নিয়োগ পত্র পেয়েছে। সেই ব্যাপারে সৎসঙ্গের আচার্যদেব শ্রীশ্রীবাবাইদাদার সম্মতি ও আশীর্বাদ প্রয়োজন। আজ চাকরী জীবনে ১৩বছর অতিক্রম করেছে মেয়ে আমার। প্রায় প্রথম থেকেই আচার্যদেবের নির্দেশমতো ও আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে চাকরী জীবন অতিবাহিত ক'রে চলেছে। আজ পর্যন্ত প্রতিবারই যখনই যতবার চাকরী জীবনে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে ততবারই মেয়ে আমার ছুটে ছূটে চ'লে গিয়েছে শ্রীশ্রীআচার্দেবের কাছে আচার্যদেব আচার্য পদে অভিষিক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই এবং আজ পর্যন্ত। এই একই ব্যাপার আমার ছেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই এবারও আজ ছুটে গিয়েছে মেয়ে। কারণ কোম্পানি থেকে জয়েন করার চাপ দিচ্ছে। এর আগে প্রায় ৮-৯ বছর আগে কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীআচার্যদেব মেয়েকে বলেছিলেন, 'তুই অনেক বড় জায়গায় যাবি।' আজ এই অল্প বয়সে কোম্পানির ডিরেক্টর পদে উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা আচার্যদেবের ভবিষ্যৎ বাণীকে প্রমাণ করে। একবার পরমপুজ্যপাদ শ্রীশ্রীদাদা বলেছিলেন, "বাবাই বাকসিদ্ধ পুরুষ" (শ্রীশ্রীআচার্যদেব বাকসিদ্ধ পুরুষ)। আজ পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীদাদার মুখনিঃসৃত কথা "বাবাই বাকসিদ্ধ পুরুষ" সত্য প্রমাণিত হ'লো।
কয়েকদিন আগে শ্রীশ্রীআচার্যদেব ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে ত্রিপুরা হ'য়ে কুচবিহার যাওয়ার পথে কলকাতায় অমরধামে এসেছিলেন এবং একদিন থেকেই পরদিন চলে গিয়েছিলেন। সেইবার দর্শন হয়নি কলকাতায়। এবার আবার ২০ তারিখের পর বেরিয়ে যাওয়ার কথা। সম্ভবত ত্রিপুরার বরাক ভ্যালিতে আচার্যদেবের দীক্ষাদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।

যাই হ'ক সেইমতো তড়িঘড়ি টিকিট কেটে যাওয়ার দিন স্থির হ'লো আজ (১৪ই জানুয়ারী'২০২৩ শনিবার)। প্রতিবার আমরা যখনই যাই পুরো পরিবার যাই। কিন্তু এবার যেহেতু চটজলদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত হ'লো সেইহেতু আমার স্ত্রী আর মেয়ে রওয়ানা দিল। পেটের ইনফেকশানে কোমরে ব্যথার কারণে এইবার আমার প্রথম যাওয়া হ'লো না। ছেলে-বৌমা ও জামাই চটজলদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় ছুটির ব্যবস্থা করতে পারেনি; তাই এবার যাওয়া হ'লো না।
এবার আসি আসল কথায়। সকালবেলা স্ত্রী ও মেয়ে রেডি হ'য়ে যখন বের হ'লো তখন ১টা ১৫মিঃ। ২টো ৫মিঃ-এ হাওড়া থেকে ছাড়বে হাওড়া-পাটনা জন শতাব্দি এক্সপ্রেস (১২০২৩)। কিন্তু যখন গেট দিয়ে বেরোতে যাবে তখন একজন অপরিচিত মানুষ গেট খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ফ্ল্যাট বাড়ি। ২৪টা ফ্যামিলি থাকে। গেটে প্রত্যেক ফ্ল্যাটের কলিং বেল আছে। আমার স্ত্রী বের হওয়ার সময় সেই যুবককে জিজ্ঞেস করলো আপনি কোথায় যাবেন? উত্তরে সে জানালো সে থার্ড ফ্লোরে যাবে। তখন স্ত্রী সেই অপরিচিত যুবককে বললো আপনি ঐ ফ্লোরের কলিং বেল টিপুন্‌, যখন ফ্ল্যাটের লোক আসবে তখন আপনি ঢুকবেন। এরপরে গেটে তালা দিতে গেল আমার ছেলে। যুবকটি জবরদস্তি করতে লাগলো ভেতরে যাওয়ার জন্য। বললো সে কলিং বেল টিপেছে। সেইকথা শুনে ছেলে তাকে লোক আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললো। কিন্তু সে বললো, সে টিচার, ঐ ফ্ল্যাটের ছেলেকে পড়ায়, প্রতিদিন আসে। যুবকটির কথা বলার ধরণ দেখে ছেলে তাকে বুঝিয়ে বলতে গেল যেহেতু সে তাকে চেনে না সেইহেতু সে অ্যালাও করবে না তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিতে। এই নিয়ে শুরু হ'লো অকারণ তর্কাতর্কি, জেদাজেদি। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে ঐ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ভদ্রলোক এবং ভদ্রলোকের মেয়েরা। ভদ্রলোকের বয়স ৭০বছর উর্ধ্বে। উনি অবাঙালি। এই ফ্ল্যাটের ২৪টা ফ্যামিলির মধ্যে ২২টা ফ্যামিলিই অবাঙালি। ভদ্রলোক এসে ছেলেকে উনার বাড়ির টিচারকে কেন আটকেছে তাই নিয়ে অযৌক্তিকভাবে চার্জ করতে লাগলেন। মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে ছেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো মাষ্টারকে আটকানো আর তাদের বাবাকে অপমান করার জন্য। ব্যাপারটা হ'য়ে গেল চোর কোতোয়ালকে ডাঁটে মতন। ছেলে পরিস্থিতি বোঝাবার চেষ্টা করলো। প্রেস্টিজ, ইগোর থেকে যে ফ্ল্যাটে প্রবেশের নিয়ম ও সিকিউরিটি সিস্টেম অটূট রাখা জরুরী ও বড়ো প্রশ্ন সেই ব্যাপারটা বোঝাতে ব্যর্থ হ'লো। বোঝাতে ব্যর্থ হ'লো ফ্ল্যাটের ইউনিটি আউটসাইডারের জন্য-- সে যেই-ই হ'ক---যেন নষ্ট না হয়, যেন নিজেদের মধ্যে ডিভিশন না হয়। ততক্ষণে সময় গড়িয়ে গেছে। আমি চেঁচামেচি শুনে নীচে নেবে এলাম এবং ব্যাপারটা হাতজোড় ক'রে থামাবার চেষ্টা করলাম আর স্ত্রী-মেয়েকে বললাম, অনেক দেরি হ'য়ে গেছে, টোটো দাঁড়িয়ে আছে, চ'লে যেতে। তখন সময় ১টা ৩০মিঃ মতো আর ট্রেন ছাড়তে ৩৫মিঃ বাকী। এরপরে অনেক ঘটনা আছে। সেগুলি আর বললাম না।

ফাস্ট ফ্লোরে নিজের ফ্ল্যাটে এসে যখন বসলাম তখন একটু পড়েই মেয়ের ফোন এলো স্টেশন থেকে। লোকাল ট্রেনের সময় জানতে চাইলো। আমি ছেলেকে বললাম সার্চ করতে। ট্রেন যখন এলো তখন ঘড়িতে পৌনে দু'টো ( ১টা ৪৫মিঃ)। আর হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়বে ২টো ৫ মিঃ-এ ( তখন হাতে আর ২০মিঃ বাকী) এইকথা জেনে আমি আর ছেলে শঙ্কিত হ'য়ে পড়লাম। কি আর করবো। ঠাকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো নাম করতে লাগলাম। মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছি আবার ঠাকুরের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর ভাবছি, বাড়ি থেকে বেরোবার সময় কেন ওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো? ঐ খানেই সময় নষ্ট হ'য়ে গেল। সঠিক সময়ে লোকাল ট্রেনটা ধরতে পারলে হাওড়ায় সময়ে পৌঁছে যেত আর ট্রেনও মিস হ'তো না।

যাই হ'ক ফোন করলাম মেয়েকে। মেয়ে ফোন ধরলো না। ঘড়িতে যখন ২টো ৫মিঃ হ'য়ে গেছে তখন আবার ফোন করলাম কিন্তু তখনও মেয়ে- বউ কেউ ফোন ধরলো। ঘড়ি এগিয়ে চললো। ১মিঃ ১মিঃ ক'রে সময় এগোতে এগোতে ২টো ২০মিঃ হ'য়ে গেল তবুও ওপ্রান্ত থেকে কোনও ফোন এলো না। ছেলেকে বললাম নেটে দেখতো ট্রেন ছাড়ার সময় ক'টা এবং কি অবস্থায় আছে। ছেলে নেট সার্চ ক'রে বললো ট্রেন ২টো ৬মিঃ-এ ছেড়ে দিয়েছে এখন ট্রেন গোবরা ছাড়িয়ে দুর্গাপুরের এগিয়ে চলেছে। হতাশ হ'য়ে হাত পা ছেড়ে দিয়ে ব'সে পড়লাম সোফায়। ওদিকে ফোনও ধরছে না কেউ। ছেলে বারবার ফোন ক'রে যাচ্ছে কিন্তু ফোন কেউ ধরছে না।

তারপর ঘড়িতে যখন ২টো বেজে ৪০মিঃ তখন হঠাৎ আমার ফোনটা বেজে উঠলো। ও প্রান্ত থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল মেয়ে খুব হাঁপাচ্ছে। বললো, পড়ে ফোন করছি। এইমাত্র ট্রেন ছেড়েছে। আমরা এখনও সিটে বসিনি। সিটে ব'সে, পড়ে ফোন করবো।

এ কথা শুনে ঠাকুরের ফটোর দিকে তাকিয়ে হু হু ক'রে উঠলো বুকের ভেতরটা। চোখ দিয়ে বেরিয়ে এলো জল। মন বললো, এও কি সম্ভব!?
কিছুক্ষণ পর মেয়ে পুনরায় ফোন করলো। এখন মেয়ের স্বাভাবিক গলা। সিটে ব'সে আছে। ট্রেন ছুটে চলেছে দ্রূতগতিতে। তখন তার কাছ থেকে যা জানতে পারলাম তা হ'লো, লোকাল ট্রেন যখন হাওরায় ঢুকেছে তখন সময় ২টো ১৫মিঃ। যেতে হবে ২নম্বর প্ল্যাটফরম থেকে ৯ নম্বর প্ল্যাটফরম। স্ত্রী বললো, ট্রেন তো ছেড়ে দিয়েছে এখন আর গিয়ে কি হবে চল ফিরে যাই। মেয়ে বললো, ফিরে তো যেতে হবেই, চলো একবার প্ল্যাটফর্ম থেকে ঘুরে আসি। ঐ ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি ক'রে মেয়ে আর স্ত্রী যখন ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছল তখন দেখলো একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস ক'রে জানতে পারলো ট্রেনটি জন শতাব্দী এক্সপ্রেস। গ্রিন সিগন্যাল নেই তাই ট্রেন ছাড়েনি। চমকে উঠে দৌড় লাগালো মেয়ে আর বউ। তাদের B14 কম্পার্ট্মেন্ট প্ল্যাটফর্মের একেবারে সামনের দিকে। গোটা প্ল্যাটফর্মটা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেল। ভয়, এই বুঝি ট্রেন ছেড়ে দেয়। এই বুঝি তীরে এসে তরী ডুবে গেল। এই বুঝি চোখের সামনে ট্রেন হাতছাড়া হ'য়ে যাবে। প্রাণপণে ঠাকুরের নাম করতে করতে দৌড়ে এগিয়ে গেল দু'জনে। গোটা প্ল্যাটফর্মে দু'জনে ছুটে চলেছে! তারপর B14 কম্পার্টমেন্টের সামনে এসে পড়িমরি ট্রেনে উঠে গেল আর ঠিক সেইমুহুর্তেই ট্রেন উঠলো দুলে, গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে ট্রেন এগিয়ে চললো ধীরে ধীরে সামনের দিকে। চুপ ক'রে দাঁড়িয়ে রইলো স্ত্রী আর মেয়ে দরজার সামনে। তারপরে ধাতস্থ হ'য়ে নিজেদের সিট খুঁজে নিয়ে সিটে গিয়ে বসলো। জানালার সামনে ব'সে আনমনে চেয়ে রইলো বাইরের দিকে। একে একে সরে যাচ্ছে ঘর বাড়ি, পথঘাট, গাছপালা আর বাতাস কেটে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন ৩০মিনিট পিছনে চলা সময়কে অতিক্রম করার জন্য, ছুটে চলেছে দেওঘরের জসিডি স্টেশনের দিকে। অনেকক্ষণ চুপ ক'রে রইলো দু'জনে। তারপরে ফোন করলো মেয়ে আমাকে। কৃতজ্ঞ চিত্তে দয়ালের দয়ার কথা স্মরণ ক'রে ভেজা গলায় সবিস্তারে বললো উপরের ঘটনাটা।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ছবির দিকে অশ্রুসজল চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে গেল ঠাকুরের কথা।

দয়াল ঠাকুর দুঃখ ক'রে বলেছিলেন, "তোদের আমি প্রতিদিন প্রতিনিয়ত যে ছোটো ছোটো কত রকমভাবে রক্ষা ক'রে চলেছি তার ইয়ত্তা নেই।"
চোখ দিয়ে দু'ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো হাতের তালুতে।
(লেখা ১৪ই জানুয়ারী ২০২৩)

প্রবন্ধঃ স্বপ্নে দীক্ষা ও লৌকিক-অলৌকিক

একটা লেখা পড়লাম। একজন পোষ্ট করেছে এক মা স্বপ্নে দেখেছেন তিনি একটা মন্দিরে গেছেন সেখানে সেই মন্দিরে একজন অপূর্ব সুদর্শন যুবক বসে আছেন। সেই সুদর্শন যুবক তাঁকে ডেকে বলছেন দীক্ষা নিতে। তারপরে তার ঘুম ভেঙে যায়। সকাল হ'লে তিনি সেই কথা স্বামী ও শাশুড়িকে বলেন। কিন্তু তারা এ সম্পর্কে তাকে কিছু বলতে পারেননি। পরে তিনি পথেঘাটে সেই সুন্দর যুবককে অনেক খুঁজেছেন কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাননি। পরে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে প্রকাশিত এক সুন্দর যুবকের ছবি দেখে সেই স্বপ্নে দেখা যুবকের চেহারার সঙ্গে তার হুবহু সাদৃশ্য দেখতে পান। তখন সেই মা প্রোফাইলের ইনবক্সে ও ফোনে পোষ্টদাতার সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করেন এবং পোষ্টদাতা তাকে পোষ্টে প্রকাশিত ছবির যুবকের সঙ্গে যোগাযোগের পথ ব'লে দেন।

পরে অবশ্য কি হ'লো তা আর জানা যায় না ঐ পোষ্ট থেকে।
সেই স্বপ্নে দেখা অপূর্ব সুদর্শন পুরুষ হ'লেন আমাদের কোটি কোটি প্রাণের ভালোবাসার মানুষ শ্রীশ্রীঅবিনদাদা। যাকে দেখলে মনে হয় এতো সুন্দর কেউ হ'তে পারে? এত সহজ সরল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব কারও হ'তে পারে? যত দেখি তত মুগ্ধ হ'য়ে যায়। এই বয়সে চোখে জল এসে যায় যখন তাঁর সামনে বসি। কথা বলবো ব'লে যাই কিন্তু মুখের দিকে তাকিয়ে কথা হারিয়ে যায়। এমন নয়ন ভুলানো প্রাণ জুড়ানো অবয়ব!!!!!! তাঁকে সামনা সামনি যখনি দেখি তখনি খালি মনে হয় এমন মনে প্রাণে সুন্দর যেন হয় আমার সন্তান!!! যে দেখেছে সে জানে।

স্বপ্নে শ্রীশ্রীঠাকুরকে ও ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের কোনও কোনও ভক্তপ্রাণ দেখতেই পারে। আর এ বিষয়ে অবিশ্বাসীরা তর্ক, ঝগড়াও করতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। আর অজ্ঞানতা থেকেই অবিশ্বাসের জন্ম। এই ঘটনাকে অলৌকিক ঘটনা বলা হ'য়ে থাকে। অলৌকিক ব'লে কিছুই নেই, সবই লৌকিক। যতক্ষণ না আমরা ঘটনার কার্যকারণ জানতে পারছি, বুঝতে পারছি ততক্ষণ তা অলৌকিক আর যে মুহূর্তে ঘটনার কারণ হস্তগত হয় তখনি তা হ'য়ে যায় লৌকিক। ঠাকুরের কাছে যা জেনেছি তাই বললাম। অলৌকিক সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর বলতেন,
"জগতে যা কিছু-ঘটে তারই কারণ আছে, আমরা যেখানে কারণটা ধরতে পারি না, সেখানে সেইটাকে বলি অলৌকিক।"
ইংরেজি ভাষার কবি, নাট্যকার ও সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক শেক্সপিয়ারের 'হ্যামলেট' নাটকের একটা লাইন শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই বলতেন, "There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy." যার অর্থ ছিল, স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে আরও বহু জিনিস আছে, হোরাশিও, যা তোমার দর্শনের পাল্লার বাইরে ও স্বপ্নের অতীত।
তবে ঠাকুর এও বলতেন, "অলৌকিকের ওপর দাঁড়ালে টান হয় না, আর টান না হ'লে মানুষের কোনও লাভ হয় না।"

যারা যে বিষয়ে, যার সঙ্গে যত বেশী ঘনিষ্ঠ, যাদের ভালোবাসা যত বেশী গভীর তারা স্বপ্নে সেই বিষয়কে, তাদের ভালোবাসার মানুষকে, প্রিয়জনকে স্বপ্নে দেখতেই পারে। এটাও একটা বিশেষ জ্ঞানের মধ্যে পড়ে যা আমার অজানা। কেউ কেউ একে ইলিউশানও ব'লে থাকে। আমরা যখন যে ভাবের মধ্যে দিয়ে যাই, একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করি তখন সেই ভাব অনুযায়ী স্বপ্ন দেখা যায়। ঘুমের মধ্যে তা ভেসে ওঠে। আমাদের মাথার মধ্যে যে ধরণের চিন্তাভাবনা, ইচ্ছা তীব্রভাবে অহরহ খেলা করে, অবচেতন মনে যা সুপ্ত অবস্থায় থাকে তা হয়তো বা স্বপ্ন আকারে ভেসে ওঠে। এ নিয়ে বিশ্বাসী অবিশ্বাসীর মধ্যে তর্ক ঝগড়া বেঁধে যেতে পারে। স্বপ্নে শুধু অতীত, বর্তমান নয়, ভালো মন্দের ভবিষ্যতও ভেসে ওঠে। স্বপ্নে দেখা বিষয়ের সঙ্গে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত-এর হয়তো বা কোনও যোগসূত্র থাকতেও পারে। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের বাইরেও অনেক কিছু স্বপ্ন হ'য়ে আমাদের সামনে ঘুমের মধ্যে হাজির হয়। আমাদের ইন্দ্রিয় দুর্বল তাই আমারা দুর্বল ইন্দ্রিয় দিয়ে ইন্দ্রিয়ের উপরে অবস্থিত জিনিস দেখতে বা বুঝতে পারি না। আর আমি বুঝতে পারি না, দেখতে পারি না ব'লে যে তা যে সব বোগাস, বুজরুকি তা কিন্তু নয়। এই মাথা এক আজব মাথা। ঠাকুরের কথায় চিত্রগুপ্তের খাতা। চিত্রগুপ্ত মানে চিত্র মানে ছবি আর গুপ্ত মানে লুকোনো অবস্থায় যা আছে। অর্থাৎ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ অনন্ত জীবনের ইতিহাসের ছবিগুলি সব লুকিয়ে আছে আমার এই মস্তিষ্কের মধ্যে।

যাই হ'ক উপরিউক্ত বিষয়ে ঠাকুরের কাছ থেকে যা জেনেছি তাই চেষ্টা করলাম নিজের মতো ক'রে তুলে ধরতে। ভুল হ'তে পারে। নিজ গুণে ক্ষমা ক'রে দেবেন। এ বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ ন'ই। স্বপ্ন বিশেষজ্ঞেরা এই বিষয়ে বলতে পারবেন। কিন্তু আমার এই পোষ্টে আলোচনার বিষয় সম্পূর্ণ অন্য।

এবার বলি, ঐ যে বললাম স্বপ্নে দীক্ষা নেবার কথা বলছে শ্রীশ্রীঅবিনদাদা; এই ধরণের পোষ্টে হয়তো কতিপয় সৎসঙ্গী বিশ্বাসীর মন আশ্বস্ত হয়, ঠাকুরের প্রতি নির্ভরতা বাড়ে। হু হু ক'রে প্রচার ছড়িয়ে পড়ে। তার উপর আবার প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তা'তে হয়তো বা অবিশ্বাসীরও মনে দোলা লাগতে পারে।
কিন্তু আমরা প্রতি মুহূর্তে অবিশ্বাসের গোলামি ক'রে চলেছি। বিশেষ ক'রে আমরা যারা সৎসঙ্গী তাদেরই বিশ্বাস কম, নেই বললেই চলে। ঘরে ঘরে দুঃখ দুর্দশা তার প্রমাণ। আর আমরা তাবিজ, মাদুলি, তুকতাক, নানা দেবদেবী, অলৌকিক ঘটনা ইত্যাদিতে বিশ্বাসী। আমি অনেক সৎসঙ্গী দাদা ও মায়েদের মা কালীর কাছে ভক্তিভরে প্রার্থনা পূরণের জন্য জীব বলি দেবার মানত করতে ও ভক্তি গদগদ চিত্তে বলি দিতেও দেখেছি। আর প্রশ্ন করলে অশ্রদ্ধা, অসম্মান পেয়েছি। আর বেশী পেয়েছি ভক্তিমতি সৎসঙ্গী মায়েদের কাছে, কখনো কখনো উগ্রতার সঙ্গে। আর, 'যদি ভালো কিছু ফল পেতে চান এক্ষুনি মা কালীর ছবিতে লাইক দিন আর শেয়ার করুন কিম্বা এই পোষ্টকার্ড বা লিফলেট পাওয়ার সাথে সাথে পোষ্টকার্ডে বা লিফলেটে যা লেখা আছে তা লিখে বা ছাপিয়ে ১০০ জনের মধ্যে ছড়িয়ে দিন নতুবা বিপদ আসন্ন'----এই সমস্ত ধরণের ভয়জনিত ঈশ্বর ভক্তির প্রচারে আমরা সৎসঙ্গীরাই বিশ্বাসী; অদীক্ষিতদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।
আর যারা ঠাকুর বিরোধী ও ঠাকুর অবিশ্বাসী যারা তাদের কাছে এমন ঘটনা প্রচারসর্ব্বস্ব হাস্যকর গল্প ও খিল্লি মাত্র। যা অতিমাত্রায় ভীষণভাবে অহেতুক বিতর্কের, খিল্লির রসদ যোগায় ঠাকুর ও ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঠাকুর বিরোধীদের কাছে। নিজের জীবনের ওপর ঘটা অলৌকিক (?) বাস্তব ঘটনা যা পরীক্ষিত সত্য তা যতটা দৃঢ়তার সঙ্গে বলিষ্ঠ প্রভাব ফেলে ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনের ওপর তার কানাকড়িও প্রভাব ফেলে না অন্যের জীবনের অপরীক্ষিত শোনা গল্পে এবং তা পরিবেশনে। এমনই আমাদের বাস্তব, কঠিন, রূঢ়, তিক্ত, মিথ্যেতে ভরা চারপাশের পরিবেশ ও মানুষজন। তার ওপর স্বপ্নে পাওয়া ওষুধের মতো স্বপ্নে পাওয়া দীক্ষার গল্প হ'লে তো অবিশ্বাসী বিরোধীদের কথায় নেই। রে রে ক'রে নেবে পড়বে ময়দানে। এমনিতেই পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীঅবিনদাদা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত খিল্লির শিকার 'সৎসঙ্গ' বিরোধীদের কাছে। তাদের কাছে এইধরণের গল্প আজগুবি, গাঁজাখুরি গল্প; যা মেঘ না চাইতেই জল-এর মতো ব্যাপার। আর সুযোগ সন্ধানী যারা এগুলিকে নিয়ে দূর্বলদের ওপর ব্যবসা করার সুযোগ পায় তাদের কাছে এই গল্পগুলি মোক্ষম পাওনা। আর মনে রাখতে হবে আমাদের, এটা ঘোর কলির সময়। এটাই স্বাভাবিক। তাই প্রচার সম্পর্কে সাবধান হ'য়েই আমাদের প্রচার করতে হবে। যাতে প্রচারের ঠেলায় শিব গড়তে বাঁদর না গড়ে বসে। ঠাকুরের স্বপ্ন দেখা ও অলৌকিক ঘটনা প্রসংগে বলাগুলি মাথায় রেখে সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে যেন আমরা সৎসঙ্গীরা চলি। ঠাকুর সমস্ত কিছুকে বাস্তবে রূপ দিতে পছন্দ করতেন।

এ প্রসঙ্গে বলি, একবার ঠাকুরকে প্রফুল্লদা বলেছিলেন, "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের মৃত্যুর পর স্বামীজী তো তাঁকে বহুবার দেখেছেন।
তার উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন, "স্বামিজী হয়তো দেখতে পারেন, কি আর একজন হয়তো দেখতে পারে---কিন্তু environment-এর (পরিবেশের) সকলে যদি স্বাভাবিকভাবে না দেখতে পারে---তাহ'লে কী হ'লো? আমার রকমটাই এইরকম যে concrete (বাস্তব) না হ'লে আমার কিচ্ছু ভাল লাগে না। যদি কোন instrument-এর মধ্যে দিয়ে কিংবা অন্য কোনভাবে environment-এর সকলে মিলে বোধ করতে না পারি---তাহ'লে খুশী হ'ই না। তাই, আমার কথাগুলির মধ্যে বোধহয় Philosophy, Art, Religion--সবকিছু Science-এ merge ক'রে গেছে।"
(১লা জানুয়ারী'২০৩২৩)

অনু কবিতাঃ পাবি-যাবি।

জীবন মাঝে তুই
জীবন খুঁজে পাবি
তখন জীবন জুড়ে
আনন্দেতে রবি।
আর যাবার বেলায়
যেতেই যখন হবে
হাসি মুখে যাবি! ----প্রবি।
(লেখা ১৬ই নভেম্বর; ২০১৫)

কবিতাঃ অনুকূল

বহু দিন মাস বছর পিছনে ফেলে ছুটেছি ক্রমাগত,
যৌবনের পাগলা ঘোড়ায় চেপে প্রৌঢ়ত্বের আঙিনায়
ছুটেছি অলিম্পিয়াস তনয় রূপে; রাজনীতির যত
ঘোর অন্ধকার গোলকধাঁধায় ঘুরেছি আমি, আরো গভীর
অন্ধকার ঘিঞ্জি ধর্মের পাংশুল প্রাঙ্গণে হায়! আমি হতভম্ব
জড়ভরত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র প্রতিকূল,
আমারে অজড় অমর প্রাণ দিয়েছিল নব বৃন্দাবনের অনুকূল।
আঁখি তাঁর কবেকার হারিয়ে যাওয়া সেই আলোর পর্বত,
হাসি তাঁর সৌদামিনীর রুপোলী ঝলক, নির্মল
সমুদ্র সফেন, যেন মৃতসঞ্জীবনী শীতল সরবৎ;
মাঝিহীন যে জীবনখেয়া হারিয়ে দিশা
খাদের কিনারায় ফেলে নোঙর,
ভেসে ওঠে শেষের সেদিনের ভয়ংকর ছবি;
বেঁচে ফেরার পথ আর অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোর
যখন সে চোখে দেখে বিধাতার-বিধির ভিতর,
তেমনি দেখেছি আমি তাঁরে জীবনের ঘোর অন্ধকারে;
বলেছে সে, ‘জীবন খুঁজে পাবে হেথায়,
ছুটে এসো, চলে এসো, পিছনে ফেলে যত প্রতিকূল’
বরাভয় হাতে হাসির ফোয়ারা তুলে দেবঘরের অনুকূল।
সমস্ত দিনের শেষে বিকেলের ফুলের মতন
বিষন্নতা আসে; মধ্যাহ্নের সূর্যের মত রক্তের উষ্ণতা
শেষ বেলার ম্লান আলোয় ঝিম মেরে হতে চায় ছন্দপতন।
তখন আবার তাঁর ডাকে_________
বাধভাঙ্গা জলের স্রোতের তীব্রতার মত জাগে বাঁচার মত্ততা;
সব আলো ফিরে আসে, ফিরে আসে স্নিগ্ধ মলয়ানিল
পেলব স্পর্শে কেটে যায় শেষ বিকেলের ক্লান্তি ঘুম
জেগে ওঠে সুপ্তোত্থিত হৃদয়ের উষ্ণতা
আর ফিরে যায়, সরে যায় সব যত প্রতিকূল;
থাকে শুধু তাঁর নাম পেয়ালা, আর নাম মদ অনুকূল।
(লেখা ১৬ই নভেম্বর'২০১৬)