Powered By Blogger

Thursday, November 16, 2023

প্রবন্ধঃ স্বপ্নে দীক্ষা ও লৌকিক-অলৌকিক

একটা লেখা পড়লাম। একজন পোষ্ট করেছে এক মা স্বপ্নে দেখেছেন তিনি একটা মন্দিরে গেছেন সেখানে সেই মন্দিরে একজন অপূর্ব সুদর্শন যুবক বসে আছেন। সেই সুদর্শন যুবক তাঁকে ডেকে বলছেন দীক্ষা নিতে। তারপরে তার ঘুম ভেঙে যায়। সকাল হ'লে তিনি সেই কথা স্বামী ও শাশুড়িকে বলেন। কিন্তু তারা এ সম্পর্কে তাকে কিছু বলতে পারেননি। পরে তিনি পথেঘাটে সেই সুন্দর যুবককে অনেক খুঁজেছেন কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাননি। পরে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে প্রকাশিত এক সুন্দর যুবকের ছবি দেখে সেই স্বপ্নে দেখা যুবকের চেহারার সঙ্গে তার হুবহু সাদৃশ্য দেখতে পান। তখন সেই মা প্রোফাইলের ইনবক্সে ও ফোনে পোষ্টদাতার সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করেন এবং পোষ্টদাতা তাকে পোষ্টে প্রকাশিত ছবির যুবকের সঙ্গে যোগাযোগের পথ ব'লে দেন।

পরে অবশ্য কি হ'লো তা আর জানা যায় না ঐ পোষ্ট থেকে।
সেই স্বপ্নে দেখা অপূর্ব সুদর্শন পুরুষ হ'লেন আমাদের কোটি কোটি প্রাণের ভালোবাসার মানুষ শ্রীশ্রীঅবিনদাদা। যাকে দেখলে মনে হয় এতো সুন্দর কেউ হ'তে পারে? এত সহজ সরল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব কারও হ'তে পারে? যত দেখি তত মুগ্ধ হ'য়ে যায়। এই বয়সে চোখে জল এসে যায় যখন তাঁর সামনে বসি। কথা বলবো ব'লে যাই কিন্তু মুখের দিকে তাকিয়ে কথা হারিয়ে যায়। এমন নয়ন ভুলানো প্রাণ জুড়ানো অবয়ব!!!!!! তাঁকে সামনা সামনি যখনি দেখি তখনি খালি মনে হয় এমন মনে প্রাণে সুন্দর যেন হয় আমার সন্তান!!! যে দেখেছে সে জানে।

স্বপ্নে শ্রীশ্রীঠাকুরকে ও ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের কোনও কোনও ভক্তপ্রাণ দেখতেই পারে। আর এ বিষয়ে অবিশ্বাসীরা তর্ক, ঝগড়াও করতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। আর অজ্ঞানতা থেকেই অবিশ্বাসের জন্ম। এই ঘটনাকে অলৌকিক ঘটনা বলা হ'য়ে থাকে। অলৌকিক ব'লে কিছুই নেই, সবই লৌকিক। যতক্ষণ না আমরা ঘটনার কার্যকারণ জানতে পারছি, বুঝতে পারছি ততক্ষণ তা অলৌকিক আর যে মুহূর্তে ঘটনার কারণ হস্তগত হয় তখনি তা হ'য়ে যায় লৌকিক। ঠাকুরের কাছে যা জেনেছি তাই বললাম। অলৌকিক সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর বলতেন,
"জগতে যা কিছু-ঘটে তারই কারণ আছে, আমরা যেখানে কারণটা ধরতে পারি না, সেখানে সেইটাকে বলি অলৌকিক।"
ইংরেজি ভাষার কবি, নাট্যকার ও সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক শেক্সপিয়ারের 'হ্যামলেট' নাটকের একটা লাইন শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই বলতেন, "There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy." যার অর্থ ছিল, স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে আরও বহু জিনিস আছে, হোরাশিও, যা তোমার দর্শনের পাল্লার বাইরে ও স্বপ্নের অতীত।
তবে ঠাকুর এও বলতেন, "অলৌকিকের ওপর দাঁড়ালে টান হয় না, আর টান না হ'লে মানুষের কোনও লাভ হয় না।"

যারা যে বিষয়ে, যার সঙ্গে যত বেশী ঘনিষ্ঠ, যাদের ভালোবাসা যত বেশী গভীর তারা স্বপ্নে সেই বিষয়কে, তাদের ভালোবাসার মানুষকে, প্রিয়জনকে স্বপ্নে দেখতেই পারে। এটাও একটা বিশেষ জ্ঞানের মধ্যে পড়ে যা আমার অজানা। কেউ কেউ একে ইলিউশানও ব'লে থাকে। আমরা যখন যে ভাবের মধ্যে দিয়ে যাই, একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করি তখন সেই ভাব অনুযায়ী স্বপ্ন দেখা যায়। ঘুমের মধ্যে তা ভেসে ওঠে। আমাদের মাথার মধ্যে যে ধরণের চিন্তাভাবনা, ইচ্ছা তীব্রভাবে অহরহ খেলা করে, অবচেতন মনে যা সুপ্ত অবস্থায় থাকে তা হয়তো বা স্বপ্ন আকারে ভেসে ওঠে। এ নিয়ে বিশ্বাসী অবিশ্বাসীর মধ্যে তর্ক ঝগড়া বেঁধে যেতে পারে। স্বপ্নে শুধু অতীত, বর্তমান নয়, ভালো মন্দের ভবিষ্যতও ভেসে ওঠে। স্বপ্নে দেখা বিষয়ের সঙ্গে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত-এর হয়তো বা কোনও যোগসূত্র থাকতেও পারে। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের বাইরেও অনেক কিছু স্বপ্ন হ'য়ে আমাদের সামনে ঘুমের মধ্যে হাজির হয়। আমাদের ইন্দ্রিয় দুর্বল তাই আমারা দুর্বল ইন্দ্রিয় দিয়ে ইন্দ্রিয়ের উপরে অবস্থিত জিনিস দেখতে বা বুঝতে পারি না। আর আমি বুঝতে পারি না, দেখতে পারি না ব'লে যে তা যে সব বোগাস, বুজরুকি তা কিন্তু নয়। এই মাথা এক আজব মাথা। ঠাকুরের কথায় চিত্রগুপ্তের খাতা। চিত্রগুপ্ত মানে চিত্র মানে ছবি আর গুপ্ত মানে লুকোনো অবস্থায় যা আছে। অর্থাৎ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ অনন্ত জীবনের ইতিহাসের ছবিগুলি সব লুকিয়ে আছে আমার এই মস্তিষ্কের মধ্যে।

যাই হ'ক উপরিউক্ত বিষয়ে ঠাকুরের কাছ থেকে যা জেনেছি তাই চেষ্টা করলাম নিজের মতো ক'রে তুলে ধরতে। ভুল হ'তে পারে। নিজ গুণে ক্ষমা ক'রে দেবেন। এ বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ ন'ই। স্বপ্ন বিশেষজ্ঞেরা এই বিষয়ে বলতে পারবেন। কিন্তু আমার এই পোষ্টে আলোচনার বিষয় সম্পূর্ণ অন্য।

এবার বলি, ঐ যে বললাম স্বপ্নে দীক্ষা নেবার কথা বলছে শ্রীশ্রীঅবিনদাদা; এই ধরণের পোষ্টে হয়তো কতিপয় সৎসঙ্গী বিশ্বাসীর মন আশ্বস্ত হয়, ঠাকুরের প্রতি নির্ভরতা বাড়ে। হু হু ক'রে প্রচার ছড়িয়ে পড়ে। তার উপর আবার প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তা'তে হয়তো বা অবিশ্বাসীরও মনে দোলা লাগতে পারে।
কিন্তু আমরা প্রতি মুহূর্তে অবিশ্বাসের গোলামি ক'রে চলেছি। বিশেষ ক'রে আমরা যারা সৎসঙ্গী তাদেরই বিশ্বাস কম, নেই বললেই চলে। ঘরে ঘরে দুঃখ দুর্দশা তার প্রমাণ। আর আমরা তাবিজ, মাদুলি, তুকতাক, নানা দেবদেবী, অলৌকিক ঘটনা ইত্যাদিতে বিশ্বাসী। আমি অনেক সৎসঙ্গী দাদা ও মায়েদের মা কালীর কাছে ভক্তিভরে প্রার্থনা পূরণের জন্য জীব বলি দেবার মানত করতে ও ভক্তি গদগদ চিত্তে বলি দিতেও দেখেছি। আর প্রশ্ন করলে অশ্রদ্ধা, অসম্মান পেয়েছি। আর বেশী পেয়েছি ভক্তিমতি সৎসঙ্গী মায়েদের কাছে, কখনো কখনো উগ্রতার সঙ্গে। আর, 'যদি ভালো কিছু ফল পেতে চান এক্ষুনি মা কালীর ছবিতে লাইক দিন আর শেয়ার করুন কিম্বা এই পোষ্টকার্ড বা লিফলেট পাওয়ার সাথে সাথে পোষ্টকার্ডে বা লিফলেটে যা লেখা আছে তা লিখে বা ছাপিয়ে ১০০ জনের মধ্যে ছড়িয়ে দিন নতুবা বিপদ আসন্ন'----এই সমস্ত ধরণের ভয়জনিত ঈশ্বর ভক্তির প্রচারে আমরা সৎসঙ্গীরাই বিশ্বাসী; অদীক্ষিতদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।
আর যারা ঠাকুর বিরোধী ও ঠাকুর অবিশ্বাসী যারা তাদের কাছে এমন ঘটনা প্রচারসর্ব্বস্ব হাস্যকর গল্প ও খিল্লি মাত্র। যা অতিমাত্রায় ভীষণভাবে অহেতুক বিতর্কের, খিল্লির রসদ যোগায় ঠাকুর ও ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঠাকুর বিরোধীদের কাছে। নিজের জীবনের ওপর ঘটা অলৌকিক (?) বাস্তব ঘটনা যা পরীক্ষিত সত্য তা যতটা দৃঢ়তার সঙ্গে বলিষ্ঠ প্রভাব ফেলে ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনের ওপর তার কানাকড়িও প্রভাব ফেলে না অন্যের জীবনের অপরীক্ষিত শোনা গল্পে এবং তা পরিবেশনে। এমনই আমাদের বাস্তব, কঠিন, রূঢ়, তিক্ত, মিথ্যেতে ভরা চারপাশের পরিবেশ ও মানুষজন। তার ওপর স্বপ্নে পাওয়া ওষুধের মতো স্বপ্নে পাওয়া দীক্ষার গল্প হ'লে তো অবিশ্বাসী বিরোধীদের কথায় নেই। রে রে ক'রে নেবে পড়বে ময়দানে। এমনিতেই পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীঅবিনদাদা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত খিল্লির শিকার 'সৎসঙ্গ' বিরোধীদের কাছে। তাদের কাছে এইধরণের গল্প আজগুবি, গাঁজাখুরি গল্প; যা মেঘ না চাইতেই জল-এর মতো ব্যাপার। আর সুযোগ সন্ধানী যারা এগুলিকে নিয়ে দূর্বলদের ওপর ব্যবসা করার সুযোগ পায় তাদের কাছে এই গল্পগুলি মোক্ষম পাওনা। আর মনে রাখতে হবে আমাদের, এটা ঘোর কলির সময়। এটাই স্বাভাবিক। তাই প্রচার সম্পর্কে সাবধান হ'য়েই আমাদের প্রচার করতে হবে। যাতে প্রচারের ঠেলায় শিব গড়তে বাঁদর না গড়ে বসে। ঠাকুরের স্বপ্ন দেখা ও অলৌকিক ঘটনা প্রসংগে বলাগুলি মাথায় রেখে সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে যেন আমরা সৎসঙ্গীরা চলি। ঠাকুর সমস্ত কিছুকে বাস্তবে রূপ দিতে পছন্দ করতেন।

এ প্রসঙ্গে বলি, একবার ঠাকুরকে প্রফুল্লদা বলেছিলেন, "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের মৃত্যুর পর স্বামীজী তো তাঁকে বহুবার দেখেছেন।
তার উত্তরে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন, "স্বামিজী হয়তো দেখতে পারেন, কি আর একজন হয়তো দেখতে পারে---কিন্তু environment-এর (পরিবেশের) সকলে যদি স্বাভাবিকভাবে না দেখতে পারে---তাহ'লে কী হ'লো? আমার রকমটাই এইরকম যে concrete (বাস্তব) না হ'লে আমার কিচ্ছু ভাল লাগে না। যদি কোন instrument-এর মধ্যে দিয়ে কিংবা অন্য কোনভাবে environment-এর সকলে মিলে বোধ করতে না পারি---তাহ'লে খুশী হ'ই না। তাই, আমার কথাগুলির মধ্যে বোধহয় Philosophy, Art, Religion--সবকিছু Science-এ merge ক'রে গেছে।"
(১লা জানুয়ারী'২০৩২৩)

অনু কবিতাঃ পাবি-যাবি।

জীবন মাঝে তুই
জীবন খুঁজে পাবি
তখন জীবন জুড়ে
আনন্দেতে রবি।
আর যাবার বেলায়
যেতেই যখন হবে
হাসি মুখে যাবি! ----প্রবি।
(লেখা ১৬ই নভেম্বর; ২০১৫)

কবিতাঃ অনুকূল

বহু দিন মাস বছর পিছনে ফেলে ছুটেছি ক্রমাগত,
যৌবনের পাগলা ঘোড়ায় চেপে প্রৌঢ়ত্বের আঙিনায়
ছুটেছি অলিম্পিয়াস তনয় রূপে; রাজনীতির যত
ঘোর অন্ধকার গোলকধাঁধায় ঘুরেছি আমি, আরো গভীর
অন্ধকার ঘিঞ্জি ধর্মের পাংশুল প্রাঙ্গণে হায়! আমি হতভম্ব
জড়ভরত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র প্রতিকূল,
আমারে অজড় অমর প্রাণ দিয়েছিল নব বৃন্দাবনের অনুকূল।
আঁখি তাঁর কবেকার হারিয়ে যাওয়া সেই আলোর পর্বত,
হাসি তাঁর সৌদামিনীর রুপোলী ঝলক, নির্মল
সমুদ্র সফেন, যেন মৃতসঞ্জীবনী শীতল সরবৎ;
মাঝিহীন যে জীবনখেয়া হারিয়ে দিশা
খাদের কিনারায় ফেলে নোঙর,
ভেসে ওঠে শেষের সেদিনের ভয়ংকর ছবি;
বেঁচে ফেরার পথ আর অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোর
যখন সে চোখে দেখে বিধাতার-বিধির ভিতর,
তেমনি দেখেছি আমি তাঁরে জীবনের ঘোর অন্ধকারে;
বলেছে সে, ‘জীবন খুঁজে পাবে হেথায়,
ছুটে এসো, চলে এসো, পিছনে ফেলে যত প্রতিকূল’
বরাভয় হাতে হাসির ফোয়ারা তুলে দেবঘরের অনুকূল।
সমস্ত দিনের শেষে বিকেলের ফুলের মতন
বিষন্নতা আসে; মধ্যাহ্নের সূর্যের মত রক্তের উষ্ণতা
শেষ বেলার ম্লান আলোয় ঝিম মেরে হতে চায় ছন্দপতন।
তখন আবার তাঁর ডাকে_________
বাধভাঙ্গা জলের স্রোতের তীব্রতার মত জাগে বাঁচার মত্ততা;
সব আলো ফিরে আসে, ফিরে আসে স্নিগ্ধ মলয়ানিল
পেলব স্পর্শে কেটে যায় শেষ বিকেলের ক্লান্তি ঘুম
জেগে ওঠে সুপ্তোত্থিত হৃদয়ের উষ্ণতা
আর ফিরে যায়, সরে যায় সব যত প্রতিকূল;
থাকে শুধু তাঁর নাম পেয়ালা, আর নাম মদ অনুকূল।
(লেখা ১৬ই নভেম্বর'২০১৬)

Tuesday, November 14, 2023

প্রবন্ধঃ শিক্ষা ও শিক্ষিতের প্রতিফলন

শিক্ষা ও শিক্ষিতের প্রতিফলন বা পরিচয় কি সেটা ভাবতে বসে সব ওলটপালট হ’য়ে গেল। আইনের বেড়াজালে সরকার বাধা পড়েছে। প্রফেসর অম্বিকা মহাপাত্র তাঁর তৈরি মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাঙ্গ চিত্র কাণ্ডের জেরে তাঁকে পুলিশি হেনস্থার অভিযোগে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড়
করিয়েছেন। প্রফেসর মহাপাত্রের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি রাজ্যবাসীকে সরকারের প্রতিহিংসা এবং পুলিশি অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ঠিক-বেঠিক, শ্লীল-অশ্লীল প্রশ্নে আবার সব ঘেঁটে ঘ হ’য়ে গেল। খবরের কাগজে নানান কার্টুনিষ্টদের কার্টুন বেরতো আর তা’ দেখবার জন্য মুখিয়ে থাকতাম, কখন সকাল হবে। সেসব বড় মজার। কিন্তু কখনও আজকের মত দেখিনি। বাক স্বাধীনতার কি কোনও বর্ডার লাইন আছে কিম্বা থাকা উচিত? বাক স্বাধীনতার জন্য যদি কেউ আহত হয় বা অপমান বোধ করে তাহ’লে কি সেই বাক স্বাধীনতা গ্রহণযোগ্য? না-কি বাক স্বাধীনতা ওসব মান-অপমান, হত-আহত, ঠিক-বেঠিক, শ্লীল-অশ্লীল ধার ধারে না, মানে না? বাক স্বাধীনতার উদরপুর্তি হ’লেই হ’ল? স্বাধীনতা মানে কি উচ্ছৃঙ্খলতা? না-কি স্বাধীনতা মানে অবাধ ভাল করা বা করতে পারা? পরিচালক ঋতুপর্ন ঘোষ-কে দেখেছিলাম তাঁকে নিয়ে মীরের মিমিক্রি বা ভাঁড়ামিতে আহত হ’তে। কেউ যদি আহত হয় বা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে তাহ’লেও তা’ বাক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বা আওতায় এনে কারোর আহত হওয়া বা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করাকে খারিজ করা হবে? অন্যের গায়ে আঁচ লাগে লাগুক, আমার গায়ে আঁচ না লাগে ফুরিয়ে যাবে মামলা, ব্যাপারটা এ-রকম? আর আঁচ লাগলেই তা’ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ? প্রতিহিংসা বা অত্যাচার? বাক স্বাধীনতার নমুনা আগেও দেখেছি এখনও দেখছি। ব্যাঙ্গ ছবি বা উক্তি কিম্বা যৌনতা বা ধর্ষণ সম্পর্কিত প্রশ্নে প্রতীকের ব্যবহার দেখেছি। দেখেছি সাহিত্যে ও শিল্পে ভাবধারা প্রকাশের জন্য কিম্বা মনের কোন বিশেষ ভাব প্রকাশ করার জন্য লেখক, শিল্পী, পরিচালকদের প্রতিকের ব্যবহার। বুদ্ধিদীপ্ত, রুচিশীল ও মার্জিত পরিবেশন। আর এখন চরম বাক স্বাধীনতার নমুনা আকছার দেখছি। দেখছি শিল্পীর আঁকা ছবিতে, পরিচালকের তৈরী সিনেমায়, কবির কবিতায়,গানে ইত্যাদিতে। সম্প্রতি বাংলা ছবি ‘প্রলয়’-এ বাক স্বাধীনতার নামে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নন স্টপ খোলাখুলি কাঁচা কাঁচা গালাগালি এখন প্রকৃত বাক স্বাধীনতার সংস্কৃতি? বহু মানুষের ভক্তির জায়গা, বিশ্বাসের জায়গা, শ্রদ্ধার জায়গা, ভালবাসার জায়গা-কে শিল্পীর ইরোটিক শিল্প ভাবনার একক বাক স্বাধীনতার অধিকারে বা অজুহাতে উলঙ্গ করা, লাঞ্ছিত করা, অপমান-অসম্মান করা, পদদলিত করার নাম বাক স্বাধীনতা!!! তাহ’লে সি, বি, আই অধিকর্তার সাম্প্রতিক মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসা মন্তব্য ‘প্রতিরোধ করতে না পারলে ধর্ষণ উপভোগ করুন’ বাক স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে!! এ-ব্যাপারে কি বলেন বাক স্বাধীনতা ও মানবতার পুজারী অম্বিকা মহাপাত্ররা? তাহ’লে চারিদিকে এত ‘গেল, গেল’ রব কেন? তবুও সি, বি, আই অধিকর্তা তাঁর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। যদিও তাঁর এ-ধরণের মন্তব্যের পিছনে আসল কারণটা বা চাপা পড়া রাগটা স্পষ্ট ছিল।

তাহ’লে কি বাক স্বাধীনতার প্রকৃত রুপ এখন এটাই আর এটাই এখন সভ্যতা? এটাই সংস্কৃতি? এই সভ্যতায় আঁচ পড়লেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, প্রতিহিংসা বা অত্যাচার বলে বিবেচিত হবে? স্বাধীনতা ‘গেল, গেল’ বলে আওয়াজ উঠবে? সত্যমিথ্যা, আসল-নকল, আলো-অন্ধকার, দোষী-নির্দোষ, সাধু-শয়তান সব একাকার, ডালে-চালে মিশে খিচুড়ি হ’য়ে যাবে? সব কিছুর পিছনে একটা অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য থাকে। সেই অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্যই কি বাক স্বাধীনতা রক্ষা বা লঙ্ঘন-এর বিচারের মাপকাঠি হওয়া উচিত? কুট্টিরা কি এখন ব্রাত্য? শিক্ষার অঙ্গন কি এখন বাক স্বাধীনতার দাবীতে হরিহরের গোয়ালঘর? যেখান থেকে শ্রদ্ধা মা অন্নপূর্ণার মত গৃহহীন হ’য়ে রাস্তায় এসে দাড়িয়েছে! রাজ্যবাসী-কে এই অশ্রদ্ধা চাষের হাত থেকে কে বাঁচাবে?
( ১৪ই নভেম্বর'২০১৩)

কবিতাঃ দুঃখভাব।

সবসময় এত দুঃখের কথা বলো কেন?
কেন আঁকো এত দুঃখের ছবি?
কেন বলো এত দুঃখের কথা?
দুঃখ-ই কি তোমার হবি?
দুঃখ দিয়ে হবেটা কি?
দুঃখকে ক'রে সাথী আকাশ গঙ্গা দিচ্ছো পাড়ি
সুখের সাগরে কাটছো সাঁতার তবুও সুখের সাথে আড়ি!?
এতটাই আনাড়ি!?
দুঃখ দুঃখ ভাব আসলে ভিন্ন ভাবের অভাব
না পাওয়ার অভাব তোমায় মারছে ছোবল সকাল থেকে রাত।
অভাব তোমার ঘিড়ছে জীবন ঘিড়ছে পলে পলে
সঙ্গ দোষে দুঃখের আঁধার, আলো সঙ্গ গুণে জ্বলে।
দুঃখ নিয়েই ঘর বেঁধেছো আর সঙ্গী-সঙ্গিনী তোমার অভাব
ভাবের সাথে ভাব না রাখায় কি তোমার স্বভাব?
আমি বলি, যার যেমন ভাব তার তেমন লাভ
আর মনে রেখো যেমন সঙ্গ তেমন ভাব।
প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও তারাই নিয়ত দুঃখের কথা বলে
জেনো জীবন মাঝে ভাবের অভাব ভাবীর সাথে হ'লে।
ভাবীর সাথে রাখতে ভাব বন্ধু বাড়াও তোমার হাত
'জীবন' খুঁজে পাবে সেথায় বন্ধু পাবে সোনার ধাত!
(লেখা ১৪ই নভেম্বর'২০১৯)

Saturday, November 11, 2023

কবিতাঃ দীপাবলির অঙ্গীকার।

হে আর্য! হে আমার আর্যা!
ভোরের সূর্য হয়ে আমি অস্ত যাবো, অস্ত যাবো
মধ্যাহ্নের সূর্যের প্রখরতা নিয়ে। গোধূলির নরম
আলো চোখে মেখে আমি অস্ত যাবো
আর অস্তমিত পথে আমি দিয়ে যাবো
তোমাদের আগামীর সোনাঝরা আলোর সংকেত।
অস্তাচলের সূর্যের মত উপস্থিতি আমার
সত্তা জুড়ে; আমি আছি, আমি থাকবো
আতিবাহিক সত্তা রূপে তোমাদের মাঝে;
তোমাদের কাছে এ আমার দীপাবলির অঙ্গীকার।
কন্ঠস্বরে কান পেতে শুনতে পাবে মানব
সমুদ্রের কল্লোল ধ্বনি, দেখতে পাবে আমার
অস্তমান স্মিত মুখে অধরোষ্ঠ কাঁপন আর
শুনতে পাবে অধরৌষ্ঠ্য চাপা ঝড়ের গর্জনঃ
আমি ছিলাম, আমি আছি, তোমাদের
মাঝে আমি থাকবো।
ভোরের সূর্য হয়ে অস্ত যাবো, অস্ত যাবো
প্রাণে প্রাণে নরম আলোর সোহাগ ছড়িয়ে।
দ্বিপ্রাহরিক মধ্যগগনের তীব্রতায় মিটিয়ে
দেবো শীতলতা ও শিথিলতা যত তোমাদের।
অস্তমিত সূর্যের মত লালিমা ছড়িয়ে রাঙ্গিয়ে
দিয়ে যাবো পাংশুমুখ যত। আর শীতের
সকালের স্নেহমাখা মায়াময় আলোময়
সোনাঝরা রোদ্দুরের মত উদাত্ত কন্ঠে বলে যাবো,
হে প্রভু!
চরণতলে ঠাই দাও দাও দাওগো এবার যাবার আগে।
তোমার চরণতলে ঠাই দাও দাও দাওগো এবার.........
(লেখা ১২ই নভেম্বর'২০১৮)

প্রবন্ধঃ তৃষ্ণা!

আমার বড় তৃষ্ণা। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হ'য়ে যাচ্ছে। চারপাশে আমার জল আর জল। তবুও তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে কেন!? কেন আমি তৃষ্ণার্ত?

ঠিক এইরকম যখন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তখন একটা পোষ্ট চোখে পড়লো। মুখের কারণে নাকি কিছু মানুষের জীবনে উত্থান আটকে যায়।

তাই কি? চারদিকে কি তাই দেখছি? সকাল থেকে রাত অব্দি কি তাই দেখছি? সূর্য ওঠা থেকে শুরু ক'রে অস্ত গিয়ে আবার পরদিন ওঠা পর্যন্ত আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী শুধু তো গালবাজ আর গলাবাজদের উত্থান!!!! তাই নয় কি?

আচ্ছা বাড়ির পাশে পেঁচো অন্ধকার গলি থেকে শুরু ক'রে উন্মুক্ত আলোর রাজপথে, বস্তির জঞ্জাল থেকে আকাশ ঢাকা ইটের জঙ্গলের দমবন্ধ করা ভিড়ে, টিভির চ্যানেল থেকে চ্যানেল শুরু ক'রে রেডিও স্টেশনে, স্থলে-জলে-অন্তরিক্ষে সব জায়গায় আমরা কি দেখি? কি শুনি? সবজায়গায় তো মুখে মারিতং জগতের কারবার চলছে! তাই না? ঘরেবাইরে, পাড়ায়পাড়ায়, স্কুলেকলেজে, অফিস-কাছারিতে, কলেকারখানায়, হাটেবাজারে, পথেঘাটে, মাঠেময়দানে, সাহিত্য, নাটক, চলচিত্র, শিল্প, ধর্ম্ম, রাজনীতি ইত্যাদি সমস্ত অঙ্গনে সকাল থেকে রাত শুধু গালবাজি আর গলাবাজি আর মুখের কারণে উপরে ওঠার লাজ লজ্জাহীন তীব্র প্রতিযোগীতা আর প্রতিযোগীতা চলছে! তাই নয় কি? ভুল বললাম? বাজে বকলাম?

হ্যাঁ! এটা সত্যি কথা যে, মুখ আর মুখের ভাষায় আকাশপাতাল তফাৎ থাকে। কারও মুখ এত সুন্দর কিন্তু মুখ খুললেই সাপ ব্যাঙ ছুঁচো বেরিয়ে পড়ে! আবার দেখতে সুন্দর না হ'লে কি হবে মুখের কথা এত মিষ্টি যে শয়নে স্বপনে জাগরণে তা মনে লেগে থাকে! কানে বাজতে থাকে!! কিন্তু সময় কি বলে? সাপ, ব্যাঙ, ছুঁচো উগলাতে উগলাতে ছুটে চলেছে শুধু সুন্দর মুখের দল উন্নতির শিখরে, উত্থানের পথে! ভবিষ্যৎ কি হবে, শেষের সেদিন ভয়ংকর হবে না সুন্দর হবে তা দেখার প্রয়োজন নেই, ধারও ধারে না। তাৎক্ষণিক ফল লাভ হ'লেই হ'লো আর হয়ও তাই। আর অসুন্দর মুখের অধিকারী মিষ্টি ভাষার মানুষ পড়ে থাকে নীচে, খুদকুঁড়ো পাওয়ার আশায় বাঁচে! ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় নেই। ত্রুটি নিয়েই বাঁচে-মরে। মিষ্টি ভাষার মানুষের উত্থান না হওয়ার পিছনে কিছু কমি বা ছোটো বড় ত্রুটি থাকেই।
যাই হ'ক, বলছিলাম তৃষ্ণা নিয়ে আর তাই ফিরে আসি সেই তৃষ্ণায়। এই লেখাটা যখন লিখছি তখন লিখতে লিখতে মনে পড়লো পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ভালোবাসাময় প্রেমময় আলোময়, রূপময়, রসময় মানুষ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র-এর বাণী "Behavior is the beverage of life." যার অর্থ দাঁড়ায়, ব্যবহারই জীবনের পানীয়। এই মিষ্টি প্রাণকাড়া ব্যবহারের কথা তিনি যতবার এসেছিলেন সেই রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণ রূপে ততবারই বারেবারে নানাভাবে, নানা ঢঙ্গে ব'লে গেছেন আমাদের সবার জন্য, পৃথিবী জুড়ে তাঁর সমস্ত সন্তানদের জন্য। সেখানে কোনও হিন্দু ছিল না, মুসলমান ছিল না, ছিল না কোনও খৃষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন কোনও সম্প্রদায়ের কেউ। সবাই, সব সম্প্রদায়ের বিশ্ব জুড়ে ৮০০ কোটি মানুষের জন্য ব'লে গেছিলেন এই মিষ্টি পানীয় রূপী ব্যবহারের কথা। যাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেই এই ভয়ংকর অন্ধকার সময়ে জীবনের সব তৃষ্ণা মিটে যায়! জুড়িয়ে যায় সব জ্বালা, যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট!! দূর হ'য়ে যায়, কেটে যায় সব অভাব, অনটন, রোগ, শোক, গ্রহদোষ, বুদ্ধি বিপর্যয়, দারিদ্রতা!!! বুকের মধ্যে জ্বলে ওঠে অপার আনন্দের আলো! আলোর ফুলঝুড়ি!!
আর, তৃষ্ণা মেটার জন্য আমরা কি করেছি? কি করছি?? কি করবো???
(লেখা ১২ই নভেম্বর'২০২১)