এর সঙ্গে পড়লাম যিনি লিখেছেন, তিনি দুঃখপ্রকাশ করেছেন যখন শিল্প ধর্মঘটের পক্ষে মিছিল চলছিল তখন শিল্প ধর্মঘটের মিছিল ও শ্লোগানের বিরুদ্ধে পথচারীদের ব্যঙ্গ হাসি ও টিপ্পনি করা দেখে। ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে। লেখাটা পড়তে পড়তে কয়েকটি কথা মনে হ'লো অতীত ও বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আর ভাবলাম পথচারীদের ব্যঙ্গ হাসি ও টিপ্পনির পিছনে কি কারণ আছে? কেন আজ এত অনীহা, অবিশ্বাস, বিরক্তি, রাগ? সবটাই অকারণ, অযৌক্তিক? একদিন ৭০ দশকের যে আন্দোলন, যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে, যে রক্তপাত ও লক্ষ লক্ষ মেধার আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসি শাসনের অবসানের পর গভীর বিশ্বাস, গভীর ভালোবাসা, স্বপ্ন, আশা, ভরসা নিয়ে বামফ্রন্টের শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল আজ সেই বাম দলের আন্দোলনের ওপর, মিছিল, মিটিং, শ্লোগানের ওপর কেন এত ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, টিপ্পনি, অবিশ্বাস, অভক্তি? বামপন্থীরা কি ভেবে দেখবে না এত কষ্ট, এত পরিশ্রম, এত আত্মত্যাগ, এত রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা কেন ধ'রে রাখতে পারলাম না?
আসুন ভেবে দেখি একে একে কেন মানুষ ৭০দশকের স্মৃতি আর মনে রাখতে চায় না।
১) শিল্প ধর্মঘট প্রসঙ্গঃ
আসলে ১৯৭৭সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর গত ৩৪বছর বাম্ফ্রন্ট্রের শাসনে পশ্চিমবঙ্গের কলে কারখানায় শিল্প ধর্মঘট শব্দটা এত ব্যবহার ও প্রয়োগ হয়েছে, প্রয়োগ হয়েছে পথেঘাটে, মাঠেময়দানে যে, শব্দটা সম্পর্কেই মানুষের রুচি হারিয়ে গেছে, শব্দটার মধ্যে আর প্রাণ নেই, মৃতবৎ একটা একঘেয়ে বিরক্তিকর ঘড়ঘড় শব্দ। শুনলেই মানুষের মনের মধ্যে শুরু হ'য়ে যায় শিল্প ধর্মঘট নামক যন্ত্রদানবের ভয়ঙ্কর ঘড়ঘড় এক শব্দ যেটা থেকে ভেসে আসে শিল্প ধ্বংসের গা শিউড়ে ওঠা 'ঘচাং ফু' কর্কষ ধ্বনি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে পশ্চিমবঙ্গে ৭৭-এর কংগ্রেসি অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন লড়াইয়ে যুক্ত না থাকা নেপোয় মারে দই চরিত্রের অযোগ্য, অদক্ষ, অপদার্থ, অশিক্ষিত, ধান্দাবাজ নেতৃত্বের পরিচালনায় কলে কারখানায় শিল্প ধর্মঘট নামক এক বুল্ডোজারের শিল্প ধ্বংসের একের পর এক ছবি।
শিল্প ধর্মঘট বাম্ফ্রন্টের ৩৪বছরের আমলে হয়নি? পশ্চিমবঙ্গের ছোটো বড় কলে কারখানায় কথায় কথায় ছিল শিল্প ধর্মঘটের হুংকার। তার ইতিহাসটা কি? সেটা নিয়ে, তার মেরিটস-ডিমেরিটস নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে না বর্তমান প্রজন্ম? বাম্ফ্রন্ট্রের যারা প্রবীণ তাঁরা তো জানেন ৩৪বছরের শাসনে প্রতিটি ছোটো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে শিল্প ধর্মঘটের ইতিহাস, তাদের সেই সময়ের প্রতিটি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বদের জীবন ও চরিত্র।
কিন্তু বর্তমান নোতুন প্রজন্ম? তারা হয়তো জানে বা সবাই জানে না। জানলেও চোখ উল্টে থাকে। শিল্প ধর্মঘটের মিছিলের সঙ্গে যুক্ত নোতুন প্রজন্ম যারা, তারা বাংলার বুকে ১৯৭৭সালে বাম্ফ্রন্ট পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তী ৩৪বছরের রাজত্বে অতীতের এই শিল্প ধর্মঘটের ইতিহাস নাই জানতে পারে কিন্তু প্রবীণ নেতারা অনেকেই আজও আছেন। তাঁরা তাদের বিগত শিল্প ধর্মঘটের ফলে কলে কারখানায় ঘটা ঘটনা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি বর্তমান প্রজন্মকে জানিয়ে যান। জানিয়ে যান কেন পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় শিল্প বন্ধ হ'য়ে গেল। জানি্যে যান সেই সমস্ত শিল্পের জমির ওপর পরবর্তী সময়ে কি হয়েছে ও হচ্ছে। যদিও শিল্প ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত প্রজন্ম ইচ্ছে করলেই জানতে পারবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জেলায় ছোটো বড় বন্ধ কারখানাগুলির জমির অবস্থা কি। ইচ্ছে করলেই জানতে পারবে ৩৪বছরে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটি জেলায় কোথায় কোথায় শিল্প ধর্মঘটের ফলে শিল্পের কি অবস্থা হয়েছিল ও উন্নতি বা অবনতি কতটা হয়েছিল।
আর, সত্যের ওপর, সততার ওপর, মনুষ্যত্বের ওপর যদি বর্তমান প্রজন্ম দাঁড়ায় আর আগামী পথ চলা ভুল স্বীকারোক্তি ও প্রায়শ্চিত্তের ভিত্তিতে যদি হয় তবে নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ সুন্দর ও মজবুত হবে।
এ আমার চিরদিনের আশা ও গভীর বিশ্বাস। যে আশা ও গভীর বিশ্বাস আমার যৌবনের দিনগুলিতে ছিল পথেঘাটে, মাঠেময়দানে মিছিলে, মিটিঙে, শ্লোগানে, গণনাট্য মঞ্চে, পথ নাটকে। এই আশা ও গভীর বিশ্বাস আজও সমানভাবে আছে।
প্রকাশ বিশ্বাস।
ভদ্রকালী, উত্তরপাড়া।
ক্রমশ (পরবর্তী অংশ ২য় পর্বে)।

No comments:
Post a Comment