Powered By Blogger

Wednesday, June 11, 2025

আত্মকথন ১০

কিছুক্ষণ হতভম্ব হ'য়ে দাঁড়িয়ে রইলো এলাকার দোর্দন্ডপ্রাতাপ দাদার ডানহাত বিজনেস পার্টনার। তারপর সে পিছন পিছন হন্তদন্ত হ'য়ে এসে আমার হাতটা ধ'রে টান দিল। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। বন্ধুদের বললাম এগিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপরে বললাম, বলো। সে উৎকণ্ঠা মিশ্রিত গলায় কৌতুহল ভরে বললো, কাল সকাল ন'টায় কি করবি? আমি হাসতে হাসতে নির্দ্বিধায় নির্বিকারভাবে বললাম, কাল প্রেসিডেন্টের গাড়ি আটকাবো, ঠিক ন'টায়। ভয় পেয়ে গিয়ে সে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় ক'রে বললো, কোম্পানীর প্রেসিডেন্টের গাড়ি!? আমি বললাম, হ্যাঁ। তারপরে জোরে চিৎকার ক'রে ব'লে উঠলো। তুই পাগল হ'য়ে গিয়েছিস? এই চিৎকারে চারপাশের সবাই তাকিয়ে আছে দেখে গলার স্বর নাবিয়ে ধীর অথচ অশান্ত গলায় বললো, বাপী এতবড় রিস্ক নিস না। বিরাট ক্ষতি হ'য়ে যাবে। পুলিশ-প্রশাসন-পার্টি-নেতা-গুন্ডা এত চাপ সামলাতে পারবি না। প্রচন্ড ঝামেলা হবে। আজ পর্যন্ত কেউ কোম্পানির প্রেসিডেন্টের গাড়ি আটকাতে সাহস করেনি। এই ভুল তুই করিস না।

আজ লিখতে বসে মনে পড়ছে আমার ভালোর জন্যেই সে সাবধান করেছিল। আমাকে ভালোবাসতো সেই দাদা। প্রতিদিন একসঙ্গে পুকুরে দুপুরবেলায় স্নান করতাম। দুধে আলতা ফর্সা, লোহা পেটানো চেহারা ছিল তার। আর হাত দু'টো ছিল অ্যায়সা তাগড়াই মোটা। আজও মনে পড়ে তার খাঁজ কাটা বুকে, হাতে, থাইয়ে হাত বুলিয়ে বলতাম, সারা শরীর জুড়ে ছোট ছোটো পাহাড় আর উপত্যকার বাহার! আর, সে কথা শুনে আমাকে বলতো, তুই তো ছুপা রুস্তম! নিজেকে সবসময় ঢেকে রাখিস। সত্যি কথা বলতে কি আমিও শরীর চর্চা করতাম। ফুলফ্লেজে করতাম। কিন্তু ফুলহাতা জামা ও গেঞ্জি ছাড়া যৌবনে কোনওদিনই কিছু পড়িনি। পায়জামা পাঞ্জাবী ছিল আমার প্রিয় পোশাক। যৌবনের শেষে প্রৌঢ়ত্বে এসে হাফ হাতা জামা ও গেঞ্জি পড়েছি স্ত্রীর কথায়। স্ত্রী অনেকদিন বলতো কোনোদিনই তো হাফহাতা জামা বা গেঞ্জিতে তোমায় দেখলাম না একবার দু'বার পড়লে কি হয়? ভাবলাম কথাটায় আপত্তির কি আছে!? তাই পড়লাম।

যাই হ'ক শীতকালে তেল মেখে আমার বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে বসে রোদ পোয়াতাম আর আখ চিবাতাম দাদা-ভাই মিলে দু'জনে। আস্তে আস্তে জুটে যেত একে একে অনেকে। আখ চিবানো শেষে সবাই স্নান ক'রে যে যার বাড়ির দিকে চলে যেতাম। সেখান থেকে গড়ে উঠেছিল একটা ঘনিষ্ঠতা।

যাই হ'ক, আমি চুপ ক'রে তার সত্য ও ভয় ধরানো সব কথা শুনে শান্ত স্বরে শুধু হালকা হাসি ঠোঁটে মাখিয়ে বলেছিলাম, কাল সকাল ন'টা। ব'লেই মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিয়েছিলাম। শুনতে পাচ্ছিলাম আমার নাম ধ'রে তার ডাক। পিছন ফিরে আর তাকাইনি। বোধহয় বরাবর মাথা উঁচু ক'রে চলার জোশ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো।

তারপর নিজের ডেরায় এসে বসলাম। মুড়ি চানাচুড় খেতে খেতে বন্ধুরা বললো, কিরে কাল সকাল ন'টায় কি করবি? আমি বললাম তোরা থাকবি তো আমার সঙ্গে? বুঝলাম ঝামেলার গন্ধ পেয়ে পিছিয়ে যেতে চাইছে। আমি বললাম, কাল সবার একটা চাকরীর ব্যবস্থা করবো। আর সঙ্গে সঙ্গেই সবাই উৎসুক হ'য়ে আনন্দে হৈ হৈ ক'রে উঠে জিজ্ঞেস করলো, কাল কি করতে হবে? আমি তাদের সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। আর তখনি রাস্তার ওপার থেকে একজন সাইকেল থেকে নেবেই চীৎকার ক'রে আমার নাম ধ'রে ডাক দিয়ে বললো, বাপী, ----দাদা তোকে ডাকছে। এক্ষুনি চল। তখন সবে আলুর চপে এক কামড় বসিয়েছি, পাশে গরম চা। আমি বললাম তুই যা, আমি যাচ্ছি। ও বললো, না না তুই এক্ষুনি চল। তোকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছে। দাদা তোর জন্য অপেক্ষা করছে। এক্ষুনি দেখা করতে বলেছে।

আমি সবাইকে অপেক্ষা করতে ব'লে ওর সঙ্গে চপ খেতে খেতে চললাম হাঁটতে হাঁটতে। ওরও হাতে একটা চপ ধরিয়ে দিলাম। সাইকেলে চড়তে বললো বন্ধু। আমি 'না' বললাম। কারণ প্যান্টে সাইকেলের দাগ লেগে যাবে বলে। বন্ধু বললো, শালা রাজার বেটা। সবসময় শালা স্যুটেড বুটেড থাকতে হবে? আমি হেসে বললাম তুই সাইকেলে চলে যা আমি হেঁটে হেঁটে আসছি। বন্ধু কিছু না ব'লে আমার সঙ্গে হাঁটতে লাগলো। আমি হাসতে হাসতে বললাম, দ্যাখ, বাবার হোটেলে খাই আর শালা এক্কেবারে রাজার বেটার মতো সবসময় ফিটফাট চলাফেরা করি। সোনার চামচ নিয়ে না জন্মালেও রুপোর চামচ নিয়ে জন্মেছি বুঝেছিস। আসলে সবসময় নিজেকে ফিটফাট রাখতে ভালো লাগে বুঝলি। কোনওদিনই এলোমেলো আগোছালো চলা ভালো লাগে না। শরীরচর্চা, খেলাধুলা, অভিনয়, পড়াশুনা, রাজনীতি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত রাখি নিজেকে। তুই তো জানিস, দেখিস সব।

ও শুধু বললো, এলাকার দাদা হ'য়ে উঠছিস। আর কিছু না ব'লে চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। আমি হাসতে হাসতে বললাম, দাদা না গুন্ডা! তবে ধর্ম্মগুন্ডা। তারপর আর কোনও কথা না বলে আমিও হেঁটে চললাম পাশাপাশি চুপচাপ। ( লেখা ১১ই জুন'২০২৩)

আত্মকথন ৯

 প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যাবেলায় বেড়িয়েছি বাড়ি থেকে আড্ডা মারতে। আমাদের বন্ধুদের ১০-১২ জনের একটা দল ছিল। সন্ধ্যে হ'লেই সবাই একজায়গায় জড়ো হ'য়ে আড্ডা মারতাম। হাঁটতে হাঁটতে কখনো চলে যেতাম গঙ্গার ধারে দলবেঁধে গঙ্গার হাওয়া খেতে। কখনো বা তিন রাস্তার মোড়ের মাথার এক কোণায় বিরাট বটগাছের চাতালে ব'সে দেদার আড্ডা মারতাম। কখনো বিরাট খোলা মাঠে বসে আড্ডা। এমনিভাবেই চলতো আমাদের প্রতিদিনের যৌবনের রুটিন।


একদিন দলবেঁধে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়িয়েছি একটা দোকানে মুড়ি-চানাচুর কিনবো ব'লে। সঙ্গে আলুর চপ। এমন সময়ে সামনে এসে দাঁড়ালো এলাকার দোর্দন্ডপ্রতাপ দাদার বিজনেস পার্টনার। এসে দাঁড়িয়েছিলো ভগবানের দূত হ'য়ে। এখন লেখার সময় জীবনের সায়াহ্নে এসে মনে হয় আমার জন্য তা ছিল হয়তো বা যমদূত। এখান থেকেই হয়েছিল সেই বুদ্ধি বিপর্যয় আর গ্রহদোষের সূত্রপাত।

সে এসেই মিষ্টি হেসে কেমন আছি জিজ্ঞেস করলো। তারপরই মুড়ি চানাচুরের ঠোঙা থেকে এক্মুঠো মুড়ি নিয়ে খেতে খেতে গল্প করতে লাগলো। আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর, দাদা-ভাইয়ের মতো। একদিকে এলাকার সেই অটোমোবাইল কারখানায় সে কাজ করে এবং অন্যদিকে দাদার বিজনেস পার্টনার। একদিনও কাজে যায় না, গেলেও ঘুরতে যায়। আর, মাইনের দিন যায়। কখনো কখনো ডিপার্ট্মেন্টের চ্যালা এসে মাইনের খামটা দিয়ে যায়। সবে কিছুদিন হয়েছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে রাজ্যে। আর সেই সময় শুরু হয়েছে সবে প্রোমোটিং বিজনেস। আমি কথা বলতে বলতে হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই তাকে আমার কপট অসন্তোষ প্রকাশ ক'রে ফেললাম। সেই অসন্তোষটা হ'লো 'তুমি বাপু উপরেরও খাচ্ছো আবার তলারও কুড়োচ্ছো আর আমি বসে বসে দেখবো আর আঙ্গুল চুষবো? মিটিং করলাম, মিছিল করলাম, স্লোগান তুললাম, বক্তৃতা দিলাম, পোষ্টার লাগালাম, নাটক-অভিনয় ক'রে বেড়ালাম গ্রামে-গ্রামে, জেলায়-জেলায় আমি আর নেপোয় মারে দই? আমাদের কথা একটু ভাবো। থতমত খেয়ে সেই দাদা ব'লে উঠলো, তুই কি চাস? আমি বললাম, আমি একা কিছু চাই না, আমার দলের প্রত্যেকের চাই। তুমি যেখানে চাকরী করো সেখানে আমাদের সবার কিছু একটা ব্যবস্থা ক'রে দাও। দাদা আশ্চর্য হ'য়ে ঘাবড়ে গিয়ে বললো, আমি কি ক'রে ব্যবস্থা করবো বল। তারপরে তার বিজনেস পার্টনার এলাকার দাদার নাম ক'রে বললো, তুই বরং ওকে বল। একটা কিছু ব্যবস্থা হ'য়ে যাবে। তারপরে একটু দূরে আলাদা ক'রে ডেকে নিয়ে বললো, তুই চিন্তা করিস না, তোর হ'য়ে যাবে একটা ভালো ব্যবস্থা। আমি বললাম, না না না, আমি আমার একার কথা বলিনি আর আমি একা কিছুই চাই না আর দরকারও নেই। উদারতার ভঙ্গিতে সহজ সরল ভাবে কথাগুলি ব'লে ফেললাম। এক্কেবারে দাতা কর্ণ ছিলাম। তারপরে হঠাৎ কিছু না ভেবেই ব'লে ফেললাম, কাল সকালে দেখতে পাবে কি করি। সে ঘাবড়ে গিয়ে বললো, কাল কি করবি? আমি বললাম, কাল সকালে দেখতে পাবে; দেখতে পাবে ঠিক ন'টায়। আমি আর কিছু না ব'লে সবাইকে নিয়ে আমাদের আড্ডার জায়গার দিকে হেঁটে চললাম।

আত্মকথন ৮

এখন আমার প্রচুর সময়। সকাল-বিকেল-রাত সবসময় ঘরে। তাড়াহুড়ো নেই কোথাও যাওয়ার। যৌবনের শুরুতেই কর্মহীন, ব্যস্ততাহীন অলস জীবন কারও জীবনের ভিত মজবুত করতে পারে না। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা নিয়ে বড় হচ্ছিলাম। হঠাৎ কর্মস্থলে ছেদ ছুটুন্ত জীবন গাড়িটাকে যেন জোর ক'রে ব্রেক মেরে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হ'লো। ফলে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেল গাড়িটা আর লাইন চ্যুত হ'লো। তখনও পর্যন্ত কোনও সওয়ারী ছিল না গাড়িতে।
এখন আর প্রতিদিনের মতো ডিউটি যাওয়ার জন্য শিফটিং অনুযায়ী কোনও ব্যস্ততা নেই। অফুরন্ত অলস সময়। একবার ভাবলাম এই অবসরে মাস্টার ডিগ্রীটা করে ফেলি। মনে পড়ে গেল মাস্টার ডিগ্রীর প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষায় বসার সুযোগ হারাবার কথা।

তখন ১৯৭৭ সাল। সবে বাম্ফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। মোটামুটি বিজয় উৎসব, আনন্দ উৎসব কেটে গেছে। এখন নোতুন স্বপ্ন নিয়ে রাজ্য গড়ার সময়। সরকার গঠনের পর চতুর্দিকে পৌরসভা-পঞ্চায়েতে, অফিসে-কাছারিতে, কলে-কারখানায়, স্কুলে-কলেজে সর্বত্র লালের এগিয়ে যাওয়ার মহোৎসব, জয়যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরাও একটু একনাগাড়ে দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনের বিরুদ্ধে জন জাগরণের জন্য মিছিল-মিটিং-স্লোগান-পথসভা-নাটক করার পর রাজ্য জয়ের পরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। সেই অবসরে প্রস্তুতি চলছিল মাস্টার ডিগ্রী পরীক্ষার। আর হঠাৎ তখনি সুর-তাল-ছন্দে ধাক্কা লেগে কেটে গেল। ডিরেইল্ড হ'য়ে গেলাম। লক্ষ্য বিচ্যুত হ'য়ে ছুটে চললাম অন্যদিকে। এখান থেকেই শুরু হ'লো বিপর্যয়। একেই বোধহয় বলে বুদ্ধি বিপর্যয়। আর পেছন পেছন এসে ঘিরে ধরে গ্রহদোষ অর্থাৎ গ্রহণদোষ।
এই বুদ্ধি বিপর্যয় বা গ্রহদোষের কথায় বলবো পরবর্তীতে।
( লেখা ১১ই' জুন'২০২৩)

আত্মকথন ৭

চিঠিটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হ'লো। বিশ্বাস হ'লো না চিঠিটার ভাষা। মনে হ'লো আমি যেন স্বপ্ন দেখছি। কারণ তখনও সেই অল্প বয়সে বুঝে উঠতে পারিনি মানুষের মন-মুখ যে এক নয় সেই নির্ম্মম সত্য কথা। অনেক দেরীতে প্রায় জীবনের শেষ অঙ্কে এসে বুঝেছি সরলতা মানে বেকুবি নয়।

এতদিন সেই যে স্কুল লাইফ ছেড়ে কলেজ জীবনে প্রবেশ ও তারপরে বৃহত্তর বাইরের জগতে যাদের সঙ্গে মেলামেশা করেছি তারা সবাই রাতারাতি অপরিচিত হ'য়ে গেল দেখে বিশ্বাস হ'লো না যে বাস্তব এত নির্ম্মম! মানতে চাইলো না মন। আবার চিঠিটাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। খাঁচায় বন্দী প্রাণীর ছটফটানির ভয়ঙ্করতা বোধের মধ্যে ধরা দিল। ভিতরে ঝড় ব'য়ে যাচ্ছে কিন্তু উপরে জোর ক'রে নিজেকে ধ'রে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা বুঝতে পারলাম চোখেমুখে ফুটে উঠছে। কি ক'রে আটকাবো তাকে ভাবতে ভাবতে মাথার ভিতরের স্নায়ূ ছিঁড়ে যেতে চাইলো। কি বলবো বাড়িতে? সদ্য সদ্য বাড়িতে বাবার মৃত্যুর রেশ এখনও তাজা হ'য়ে রয়েছে ঘরের চারপাশে। আমি জানি দাদারা সব জেনে যাবে। কিন্তু মাকে জানাবো কি ক'রে? কি ক'রে বলবো যে মা, আমার আর চাকরী নেই? কি ক'রে বলবো, আমি মারামারি করার অপরাধে সাসপেন্ড হয়েছি?

আমি চাকরীতে জয়েন করেছিলাম ৭৭ সালের শেষ দিকে দূর্গাপুজোর ঠিক একমাস আগে। আর সাসপেন্ড হ'য়েছিলাম ৭৯ সালের পুজোর আগেই। আর সাসপেন্ড হওয়ার সাথে সাথেই আমার এলাকার সবাই যারা একই কোম্পানিতে কাজ করতো তারা কথা বলা বন্ধ ক'রে দিল। আমি অচ্ছুৎ হ'য়ে গেলাম। আমি যেন এক সংক্রামক ব্যাধির রুগী! অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে যেমন লেখা থাকে 'শুধুমাত্র সংক্রামক ব্যাধির জন্য' ঠিক তেমনি আমি হ'য়ে গেলাম পাড়ায় ও কারখানায়। যারা কোম্পানিতে চুরি-চামারি-নেশাভাং-মারামারি এবং কোম্পানি অফিসার বা নেতাদের ব্যাক্তিগত রোষের কারণে সাসপেন্ড হ'য়ে যায় তারা পথেঘাটে দেখা হ'লে কথা বলতো, জিজ্ঞেস করতো কিছু সমাধান হ'লো কিনা। সবচেয়ে কষ্ট হয়েছিল যাদের চাকরী আমার ঐ প্রেসিডেন্টকে দেওয়া নামের লিস্টের ভিত্তিতে হয়েছিল তারা কেউ আর যোগাযোগ রাখতো না পারতপক্ষে।

অথচ এদের জন্যই জীবনে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলাম। ঝুঁকি নিয়েছিলাম নিশ্চিত মৃত্যুকে বা নিদেনপক্ষে ভয়ংকর শারীরিক ক্ষয়ক্ষতিকে স্বীকার করেই জোশ-সাহস আর মহৎ এক উদ্দেশ্যকে হাতিয়ার করেই। পরবর্তী আত্মকথনে সেটা বর্ণনা করবো আর সেখানেই একসময়ের এশিয়ার তথা ভারতের একমাত্র স্বয়ং সম্পূর্ণ ২৫ হাজার কর্মচারীর প্রেসিডেন্টের সংগে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কাহিনী তুলে ধরবো।

যাই হ'ক, এলাকার যারা এমপ্লয়ী ছিল ওই কারখানার তাদের কাছে আমি হ'য়ে গেলাম ভয়ানক অপরাধী। তারা এলাকার দাদাকে নাকি ইউনিয়নের নেতাকে নাকি কোম্পানীর পারসোনাল ডিপার্ট্মেন্টে কর্মরত আমার ঐ একই এলাকায় বসবাসকারী আমার দূরসম্পর্কের মামাকে কা'কে খুশি করতে যে আমাকে বয়কট করেছিল তা ভেবে কূলকিনারা পেতাম না। মোটকথা আমাকে একা ক'রে দেওয়ার একটা চেষ্টা শুরু হ'লো পাড়ায় ও কারখানায়। এটা যে একটা গোপন ষড়যন্ত্র আর সেই ষড়যন্ত্র যে মানসিক চাপ সৃষ্টি ক'রে ক'রে আত্মবিশ্বাস, জোশ, কর্মক্ষমতা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ইত্যাদি একটা মানুষের সমাজে মাথা উঁচু ক'রে বাঁচার গুণাবলী নষ্ট ক'রে নেতা বা দাদাদের ওপর নির্ভরশীল ক'রে তাদের আজ্ঞাবাহ দাসে বা লাঠিতে পরিণত ক'রে স্বাধীন ব্যক্তিত্বকে পঙ্গু ক'রে দেওয়ার নোংরা ষড়যন্ত্র তা বুঝেছিলাম দেরীতে, সময়ের পরতে পরতে। সময় সবসে বড়া বলবান জানি কিন্তু
কারখানায়-পাড়ায় আর ঘরে ঘরে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে
বিশ্বাসদার চাকরী গেছে মারামারি-গুন্ডামীর কারণে।
( লেখা ১১ই জুন' ২০২৩)

আত্মকথন ৬

সেই সময়টা ছিল সবে বাম জমানার সূত্রপাত। ১৯৭৭সাল। সিপিএম রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে ও সরকার গঠন করেছে। সেইসময়ের বাম আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম জড়িয়ে, ছিলাম গণনাট্যের সঙ্গে। মিছিল, মিটিং, স্লোগান, বক্তৃতা সবেতেই ছিলাম অগ্রণী ভুমিকায় সক্রিয়ভাবে। অনেক ঘটনাপ্রবাহ ব'য়ে যাচ্ছে মনের মধ্যে। সেই সূত্রে এলাকার পার্টির সব নেতাদের সঙ্গেই ছিল গভীর ও সুসম্পর্ক। এলাকার সেই দন্ডমুন্ডের কর্তা তিনিও ছিলেন সেই দলের সদস্য। আমার বড়দাও ছিলেন পার্টির আমৃত্যু মেম্বার। এলাকার সেই প্রভাবশালী দাদা আমাকে ক'দিন অপেক্ষা করতে বললেন। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। এমনিভাবে বেশ কয়েকদিন চলে গেল। পনেরো দিনের মধ্যে উত্তর দিতে হবে। কি করবো কিছুই স্থির করতে পারছি না, নিতে পারছি না কোনও সিদ্ধান্ত। কেউ পাশে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলছেনা, আয় আমার কাছে। যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কথা বলেছি, চলে গেছি যার অফিস ঘরে চাকরী পাওয়ার আগে সরাসরি বেশ কয়েকবার, কথা বলেছি একান্তে সাহসের সঙ্গে, দাপটের সঙ্গে সেখানে যেতে গিয়েও কোথায় জানি একটা অদৃশ্য বাধা পাচ্ছি যাতে তাঁর কাছে যেতে না পারি, জানাতে না পারি সমস্যার কথা। ঘুরপাক খাচ্ছি কেবল লাট্টুর মতো।

ক'দিনের মধ্যেই সব ও সবাইকে অপরিচিত মনে হ'তে লাগলো। আমি বুঝতে পারছি সময় চলে যাচ্ছে। জোর ক'রে যে সবাইকে অস্বীকার ক'রে চলে যাবো প্রেসিডেন্টের ঘরে সেখানেও যেন কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলছি ধীরে ধীরে। চিড় ধরছে আত্মবিশ্বাসে। শুধু তাই নয় মনে হ'লো সিকিউরিটিরাও কারও গোপন নির্দেশে যেন তৎপর যাতে প্রেসিডেন্টের ঘরের দিকে যেতে না পারি। নিজের বক্তব্য যে নিজে লিখে জমা দেবো তাও দিতে পারছি না।

ক'দিন পর এলাকার সেই দাদা আমাকে ইউনিয়নের সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে বললো। আর, ইতিমধ্যে ইউনিয়ন থেকেও আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বলা হ'লো জেনারেল সেক্রেটারিকে বিষয়টা জানাতে। গেলাম সেখানে। তাকেও বললাম সত্য যা ঘটেছে। তিনি শুনলেন। কিছু বললেন না। শুধু বিজ্ঞের মতো বললেন, কোম্পানি প্রেমিসেসের ভেতরে মারামারি করেছেন তার জন্য কোম্পানি তার মতো ব্যবস্থা নেবে। আমি বললাম, আমি তো আপনাকে সত্য ঘটনা বললাম। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন, বললেন, ইউনিয়নের তরফ থেকে চিঠি যাবে। আমি বললাম আমাকে পারসোনাল অফিস থেকে বলা হয়েছে উত্তর দিতে। আমি সত্য যা ঘটেছে তাই লিখে জানাই। তিনি একটু বিরক্ত হ'য়ে বললেন, সব যদি অত সহজ হ'তো তাহ'লে ইউনিয়নের আর দরকার হ'তো না। তারপরে আমার থেকে শো-কজের লেটারটা চেয়ে নিয়ে বললেন, আপনি এখন যান, আপনাকে সময়মতো ডেকে নেওয়া হবে।

আমি চুপ ক'রে উনার অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে বেরিয়ে এই প্রথম চারপাশের দিকে তাকিয়ে মনে হ'লো আমি একা। কেউ নেই কোথাও। যেদিকে তাকাচ্ছি মনে হ'লো সবাই যেন কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে আর নীরব মজা নিচ্ছে। অফিসে, পাড়ায় সবাই এড়িয়ে চলতে লাগলো। এই প্রথম নিজেকে একা সঙ্গীহীন মনে হ'লো।

এইভাবে কেটে গেল পনেরোদিন। তারপর একদিন পোষ্টম্যান হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল আর একটা রেজিস্ট্রি চিঠি। খুলে দেখলাম আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। লেখা রয়েছে, কোম্পানির শো-কজের উত্তরে আমাকে সাসপেন্ড না করার কারণ কোম্পানির কাছে গ্রাহ্য না হওয়ায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য সাসপেন্ড করা হ'লো। কোম্পানির নিয়ম মতো পরবর্তী প্রক্রিয়া চালু থাকবে।

আমি কর্মহীন ভবঘুরে হ'য়ে গেলাম। ( লেখা ১১ই জুন' ২০২৩)

আত্মকথন ৫

সে সময় আমার এলাকার যিনি দন্ডমুন্ডের কর্তা তিনি আমার বড়দা ও মেজদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং আমাদের ক্লাবের একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আমাদের পরিবারের সঙ্গে ছিল একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। উনাকেও আমরা পরিবারের অন্য সদস্যরা পরিবারের একজন সদস্যের মতোন ভাবতাম। এলাকা ও ফ্যাক্টরিতে খুব প্রভাব ছিল। আমাদের বাড়ির ঠিকানা ছিল ক্লাবের ঠিকানা। সন্ধ্যেবেলা তাকেও তার অফিসে গিয়ে সব জানালাম। শুনে চিবিয়ে চিবিয়ে শুধু বললেন, কোম্পানির ভেতরে মারামারি করবি তো সাসপেন্ড হবি না? আমি তাকেও মূল ঘটনাটা বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু তিনিও পরে শুনবো ব'লে এড়িয়ে গেলেন ও বিশেষ কাজ আছে, পরে আসিস ব'লে বেরিয়ে গেলেন। আমিও ফেউ ফেউ ক'রে ঘুরে বেড়ানো ভ্যাগাবন্ডের মতো যেন তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।


বুঝলাম এখন কারও সময় নেই আমার কথা শোনার। শুধু মনে পড়ে গেল অনেকগুলি ঘটনা। তার মধ্যে এলাকার পার্টির এই দোর্দন্ডপ্রতাপ দাদার একদিন আমাকে বলা কথা মনে পড়লো। "বাপি। তুই যে চাকরীর লিস্টটা প্রেসিডেন্টকে দিচ্ছিস সেখানে আমার দু'টো লোকের নাম দিয়ে দিস।" আমি বলেছিলাম, দু'টো কি বলছেন দাদা, আপনি যেমন বলবেন আমি তেমন ক'রে লিস্ট তৈরী করবো। তিনি বললেন, না-রে আমার দু'টো লোক হ'লেই হ'য়ে যাবে। এই চাকরীর লিস্ট তৈরীর ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েকদিন যা কথা হয়েছে তোর সঙ্গে হয়েছে, আমার তো এখানে কোনও হাত ছিল না, আমার কোনও অবদান নেই। তাই তুই তোর লিস্টে আমার দু'টো লোকের নাম দিলেই হবে। তখন তিনি যে দু'টো লোকের নাম বলেছিলেন সেই দু'জন সম্পূর্ণ ফোকটে দাঁও মেরে দিয়েছিল। তার মধ্যে একজন আজ আর নেই, মারা গেছে কিন্তু সেই জন এলাকার সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ দাদার সঙ্গে দাদার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ছিল এবং ব্যক্তিগত স্বার্থেই ছিল। আর একজন ছিল জন্মকৃতঘ্ন। শুধু এলাকার দাদার বন্ধুর ভাই ব'লে সুযোগটা পেয়েছিল। কোনদিনও কারও সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না তার আর চাকরী পাওয়ার পরও একদিনের জন্য যোগাযোগা রাখেনি।


সেদিন দাদার কথাটা ভালো লেগেছিল। সহজ সরল স্বীকারোক্তি। প্রায় ২৫ হাজার কর্মচারীর অটোমোবাইল কোম্পানির একছত্রাধিপতি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার পরিচয়ের কাহিনীটা অন্য কোনও এক সময় আত্মকথনের ফাঁকে তুলে ধরবো। সেই প্রেসিডেন্টের নির্দেশ মতো আমি এলাকার কয়েকজন বেকার যুবকের একটা লিস্ট তৈরী ক'রে কোম্পানির হেড টাইম কিপারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সেটা ছিল সম্পূর্ণ আমার আর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপার। আর সেটা সেই এলাকার দন্ডমুন্ডের কথা জানতো বলেই স্বীকার করেছিল যে চাকরীর লিস্ট তৈরীর ব্যাপারে উনার কোনও কৃতিত্ব নেই। কিন্তু সেই মানুষই যে পরে আমার উন্নয়নের পথের কাটা হ'য়ে দাঁড়াবে তা ভাবতে পারিনি। যেমন পারিনি আমার দূর সম্পর্কের মামার নিষ্ঠুর ভূমিকার কথা। আসলে তখন বয়স ছিল ২৫ আর ছিল সহজ-সরল জীবন। অনেক পরে যখন বুঝেছি তখন অনেক দেরী হ'য়ে গেছে।
( লেখা ১১ই জুন' ২০২৩)

Sunday, June 8, 2025

বিচিত্রা ১৫০

হে বন্ধু! যে যেখানে যাকেই পুজো করো না কেন সব পুজো, সব প্রার্থনা এসে পড়ে দয়াল প্রভুর পায়ে। দয়াল প্রভু আমার রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মহাপভু, রামকৃষ্ণ ও সর্বশেষশ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনারা সবাই একজনই বারেবারে যুগে যুগে এসেছেন আমাদের বাচা ও বাড়ার পথ দেখাবার জন্য। তারা প্রত্যেকেই এক ও অদ্বিতীয়। হে হিন্দু, হে বৌদ্ধ হে মুসলমান, হে খ্রিস্টান, হে সব ধর্মমতের সব পূজারি আসুন নিজত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে স্ববৈশিষ্ট্য স্বধর্ম বজায় রেখে বাকী সব পরিত্যাগ ক'রে সেই এক ও অদ্বিতীয় জীবন্ত রক্তমাংসের ঈশ্বরকে ভালোবাসি, পুজো করি। রোগ, শোক, গ্রহদোষ, বুদ্ধিবিপর্যয়, দারিদ্রতা সমস্ত কিছু থেকে মুক্তি পাবেই পাবে, রক্ষা পাবে।
( লেখা ৮ই জুন' ২০২২)