Powered By Blogger

Wednesday, July 5, 2023

প্রবন্ধঃ আমার দয়াল ঠাকুর ও আমার আচার্যদেব। (১)

এই যে আমি প্রায় বিপদ সীমার শেষ প্রান্ত থেকে ফিরে এলাম এই ফিরে আসা কি ক'রে সম্ভব হ'লো!? কে ফিরিয়ে আনলো? ডাক্তার? ওষুধ? ঠাকুর না আচার্যদেব? এর উত্তর দেওয়ার আগে দেখে নিই বিপদটা কি ছিল আমার?

আমার অন্যান্য বিপদের কথা এখানে আলোচনা ক'রে লেখাকে দীর্ঘ করতে চাই না। শুধু রোগ নিয়ে যে বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলাম সেই রোগ সংক্রান্ত বিপদ্গুলির কথায় শুধু বলবো এখানে এই প্রবন্ধে।
তার আগে ব'লে রাখি জাগতিক জীবনে আমার শ্রীবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেই ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সুখই আমাকে রাঙাতে পারেনি। জীবন জুড়ে ছোটোকে বড় আর বড়কে আরো বড় করার ঠাকুর দর্শনে বিশ্বাসী আমি শুধু বাড়ির খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অন্যের মই হ'য়েই বেঁচে আছি আজ পর্যন্ত।

সালটা সম্ভবত ২০১৫ হবে। বর্তমান শ্রীশ্রীআচার্যদেব তখন দর্শন দিতেন শ্রীশ্রীবড়দার বাড়ি যাওয়ার পথে ঠাকুর বাংলো থেকে বেরিয়েই পাশে যে গেট সেই গেটের ভিতরের বিশাল যে ফাঁকা জায়গা সেইখানে নির্দিষ্ট বসার জায়গায় এবং আচার্যদেব শ্রীশ্রীদাদার নির্দেশেই তাঁকে নিবেদন করার পরিবর্তে বর্তমান আচার্যদেবকে সব নিবেদন করা হত সেই সময়।

সেইসময় কোনও একদিন সকালে শ্রীশ্রীআচার্যদেবকে আমার স্ত্রী আমার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রসঙ্গে বলেছিল, "আমি অন্যের মই হয়েই কাটিয়ে দিয়েছি আমার রাজনৈতিক সারাটা জীবন। মই হিসেবে সবাই ব্যবহার করে আর কাজ মিটে গেলে কেউ খোঁজ রাখে না।" এ কথার উত্তরে সেদিন আচার্যদেব রাজনীতির সঙ্গে আর যুক্ত না থাকার কথা আমায় বলেছিলেন। বলেছিলেন পুরো সময়টায় ঠাকুরের কাজে যুক্ত থাকতে। আর হাসতে হাসতে বলেছিলেন, "রঙ করেন কেন? রঙ করবেন না। সাদা চুল আর দাঁড়ি দেখে আপনাকে কেউ আর ডাকবে না নতুবা আপনার মুক্তি নেই।" চারপাশে একটা হাসির রোল উঠেছিল।

অনেকদিন পর বেশ ভালো লাগছিল, নিজেকে হালকা বোধ হচ্ছিলো সেই মুহুর্ত থেকে। মুহূর্তে যেন একটা বিরাট অসহ্য চাপ নেবে গেল মাথা থেকে। যে চাপ কোনও ডাক্তার, কোনও ওষুধ, কোনও জাগতিক সুখ এতদিন নাবাতে পারেনি। একটা পাহাড় হ'য়ে চেপে বসেছিল মাথার ওপর। সেদিন বেশ ফুরফুরে পাখির পালকের মতো হালকা বোধ হচ্ছিলো শরীরটা সেই মধুময় আলোময় রূপময় সকালে। অনুভব করলাম একটা দিব্য জ্যোতি যেন সেই দেবোপম শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হ'য়ে আমাকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে! আমি তৃপ্ত হলাম, শান্ত হলাম। তখন আমি তাঁকে হাত জোড় ক'রে প্রণাম ক'রে বললাম, 'আজ্ঞে তাই হবে। আর আজ থেকে নিজের মই নিজে হলাম।'
তখন তিনি শ্রদ্ধেয় শান্তিদাকে ডেকে কিছু নির্দেশ দিয়ে দিলেন আমার জন্য। প্রণাম ক'রে উঠে এলাম সেখান থেকে। সেই থেকে শ্রদ্ধেয় শান্তিদার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা।

প্রথমে স্ত্রীর উপর বিরক্ত হ'লেও পরে বুঝেছিলাম আচার্যদেবকে বলা আমার সম্পর্কে স্ত্রীর সেই কথার আল্টিমেট উপকারিতা। সেই শুরু হ'লো মানসিক নিরাময় প্রক্রিয়া! আমি ধীরেধীরে সম্পূর্ণ রূপে মসৃণ ভাবে রাজনীতি থেকে মুক্ত ক'রে নিলাম নিজেকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে কোনও জটিলতার সৃষ্টি হ'লো না, সৃষ্টি হ'লো না কোনও টানাপোড়েন, হ'লো না কারও সঙ্গে কোনও বিরোধ, মনোমালিন্য। এখনও পুরোনো সবার সঙ্গে সুন্দর মসৃণ সম্পর্ক আমার!

এখানে অলৌকিক রহস্য কোথায় জানি না। তবে দীর্ঘদিন পরে নিজেকে স্বাভাবিক ও হালকা বোধ হ'লো। এটাকে কি বলবো? মানসিক চিকিৎসা? জানি না। তবে তিনি যে বাকসিদ্ধ পুরুষ এবং তাঁর সাক্ষাৎ দর্শন, সঙ্গলাভ, পরামর্শ, উপদেশ, নির্দেশ গ্রহণ ও পালন সমস্যা সমাধানের ও মুক্তির উপায় তা বাস্তবভাবে অনুভূত হ'ওয়া শুরু হ'লো।

কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম পরবর্তী সময়ে, অন্যের মই হওয়া যত সহজ ও সম্ভব নিজের মই নিজে হওয়া ততটাই কঠিন ও অসম্ভব। কখনো কখনো মনে হয় অবাস্তবও!! এখানে দয়ালের দয়া, আচার্যদেবের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদ, পরামর্শ ছাড়া নিজের মই নিজে হওয়া এবং সমস্ত রকম কঠিন ভয়ংকর সমস্যা, রোগ এমনকি নিশ্চিত মৃত্যু থেকে মুক্ত হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। দয়ালের উপর বকলমা দিয়ে নিজের মই নিজে কি ক'রে হ'তে হয় আর বকলমাই বা কি ক'রে দিতে হয় তার আচার আচরণ স্বয়ং আচার্যদেব শিখিয়ে দেন। তাই তিনি আমার ও আমাদের আচার্যদেব। 
( লেখা ২৭শে নভেম্বর'২০২২ )
ক্রমশঃ

প্রবন্ধঃ আমার দয়াল ঠাকুর ও আচার্যদেব। (৩)

এবার আসি আমার সেই বিপদ সীমা থেকে ফিরে আসার ঘটনায়। আমার দয়াল ঠাকুর ও আচার্যদেব (১) ও (২) পর্বে আমি দেখাতে চেয়েছি সমস্যায় নিমজ্জিত অসহায় মানুষের প্রতি আচরণসিদ্ধ পুরুষের সহজ স্বাভাবিক অথচ আশ্চর্য লীলা! এই দুই পর্বে চেষ্টা করেছি কেন তাঁরা আমাদের কাছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের আচার্য। চেষ্টা করেছি দেখাতে কেন তাঁরা আমার দয়াল ঠাকুরের ব'লে যাওয়া হাজার হাজার বাণী ও সত্যানুসরণের জীবন্ত চলমান আচরণসিদ্ধ রূপ! আর এই পর্বে দেখাবো আমার জীবনের ওপর দিয়ে ঘটে যাওয়া বর্তমান আচার্যদেবের প্রত্যক্ষ প্রভাব। দয়ালের অসীম অনন্ত অদ্ভুত দয়া কিভাবে আচার্যদেবের আচরণের ভিতর দিয়ে ঝর্ণাধারার মত প্রবাহিত হ'য়ে আমার বিধ্বস্ত জীবনকে সিক্ত ক'রে তুলে আমায় নোতুন জীবন দান করেছে সেই ঘটনায় তুলে ধরবো এই পর্বে।

সেদিনটা ছিল আর দশটা দিনের মতো স্বাভাবিক দিন। সকালটা ভালোভাবে কেটে গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতরটা কে যেন চেপে ধরছে মনে হ'লো। কয়েকদিন ধ'রে শরীরটাও ফুরফুরে ছিল না। কেমন জানি হাত, হাতের আঙ্গুলগুলি ঝিনঝিন করতো। রাতের দিকে ঘুমের মধ্যে মাথার ভেতরটা ঝন ঝন ক'রে উঠে ঘুমটা ভেঙ্গে যেত। তারপর শুরু হ'লো ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলে দুই হাতে ঝাঁকুনি। এমনিভাবে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না। ক'দিন পর মনে হ'লো ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাচ্ছে। তাই ঠিক করলাম ডাক্তারকে একবার দেখিয়ে নিই। ডাক্তারকে দেখালাম। ডাক্তার প্রেস্ক্রিপশান করলো। প্রেসারের ওষুধ দিল, সঙ্গে দিল নার্ভের ভিটামিন ও আরও কয়েকটা ওষুধ। কিছুদিন পর আরও একবার দেখালাম। দেখে ওষুধ চেঞ্জ ক'রে দিল, প্রেসারের ডোজ দিল বাড়িয়ে, সঙ্গে রেফার ক'রে দিল নিউরোলজিস্ট ডাক্তারকে দেখাবার জন্য।

এমনিভাবেই কেটে গেল আরও কিছুদিন। বুঝতে পারছিলাম সমস্যাটা একটু একটু ক'রে বাড়ছে। বেশ কিছুদিন ধ'রে নানারকম চিন্তা মাথাটাকে চেপে ধরছিল। ইষ্টপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতিনিয়ত সংঘাত, জন্ম থেকে এই বয়স পর্যন্ত নিজের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে, এলাকা ছেড়ে ছেলের কেনা ফ্ল্যাটে নিজের প্রিয়জনদের ছেড়ে চলে আসা ও আরো অনেক স্মৃতি শরীর মনকে আচ্ছন্ন ক'রে রাখতো সবসসময়। বিশেষ ক'রে আমাকে আচ্ছন্ন ক'রে রেখেছিল তিন বছরের একটা ছোট্ট শিশু। যে আমার পুরোনো বাড়িতে আমার সবসময়ের ছিল সঙ্গী। সে ছিল আমার ছোট্ট নাতি, আমার সোনাবাবা। আমার ভাইপো অর্থাৎ ছোড়দার নাতি। সঙ্গে আরও একজন ছিল সে আমার আর এক ভাইপো অর্থাৎ আমার বড়দার নাতনি, আমার সোনামা। মানে উভয়েই আমার সম্পর্কে নাতিনাতনি।

যাই হ'ক সেই প্রতিদিনের একই ছাদের তলায় থাকার যে বিচ্ছেদ তা আমাকে অস্থির ক'রে রাখতো সবসময়। শ্রীশ্রীআচার্যদেবের সহধর্মিনী বড় বৌরাণীমা আমাকে সেই মায়ার বাঁধন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার কথা বলতেন। কিন্তু মধুর সেই স্মৃতিগুলি আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখতো সবসময়। একটা ঘোরের মধ্যে থাকতাম আমি যা কাউকে বোঝাতে পারতাম না। আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে মিষ্টি ক'রে সহানুভূতির স্বরে বড়বৌরাণীমা বলেছিলেন আমার মেয়েকে, "উনি তো বেরিয়েই আসতে চান না ঐ স্মৃতি থেকে, চেষ্টা কি আর করবে।" সেদিন আমি কিছু বলতে না পেরে চুপ ক'রে বসেছিলাম তাঁর সামনে। তিনি আমার দিকে করুণ স্নেহ ঝরা চোখে চেয়েছিলেন অনেকক্ষণ। এই না বেরিয়ে আসার অক্ষমতার জন্য আমার চোখের দৃষ্টি একেবারে ঝাপসা হ'য়ে এলো।

তারপর দিন কেটে যায় একদিন দু'দিন ক'রে অনেকদিন। শারীরিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে ক্রমশঃ। বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় যায় আমি ভয় পেয়ে যায় প্রচন্ড। সারাদিন যা না কষ্ট অসুবিধা হ'তো তার থেকে অনেক অনেক গুণ বেশী হ'তো রাতে ঘুমের মধ্যে আর ভোরবেলায় ঘুম ভাঙলে। রাতে ঘুমের মধ্যে এসে ভিড় করতো নানাবিধ চিন্তা। পাখির পালকের মতো সেই চিন্তাগুলি এলোমেলো ঝাপটা মারতো মাথার মধ্যে। আর সবচেয়ে কষ্ট শুরু হ'লো যখন শুরু হ'লো প্রতিদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখা। সে কি অসহ্য যন্ত্রণা। অর্থহীন স্বপ্ন যার কোনও শুরু নেই শেষ নেই, মাথামুন্ডূহীন স্বপ্ন! জটিল প্রচন্ড গিঁট পাকানো স্বপ্ন! গিঁট পাকানো স্বপ্নের কোথায় মাথা আর কোথায় লেজ তার কোনও সন্ধান পেতাম না। স্বপ্নের মধ্যে সবসময় অন্ধকার, অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ, জনশূন্য বিস্তৃত স্থান ঘিরে আমার অবস্থান। তার মধ্যে দিয়ে আমি হেঁটে চলেছি! প্রচন্ড এক ভয়, দমবন্ধ হওয়া এক নিদারুণ ভয়ঙ্কর চাপ হার্টের ওপর চেপে বসতো। মনে হ'তো এই বুঝি বেরিয়ে যাবে প্রাণবায়ু। ধড়ফড় ক'রে উঠে বসতাম বিছানার ওপর। সারা শরীর ঘেমে নেয়ে উঠতাম। চুপ ক'রে বসে থাকতাম বিছানায় আর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলতাম। তারপর উঠে চলে যেতাম ঠাকুরঘরে। চুপ ক'রে বসে থাকতাম ঠাকুরের সামনে। সঙ্গে চলতে থাকতো অনবরত নাম। এ তো একধরণের সমস্যা। আরও একটা সমস্যা হ'তো মাথার মধ্যে। তা হ'লো কে যেন হঠাৎ হঠাৎ হাতুড়ি দিয়ে মারতো মাথায়। দড়াম্ দড়াম্ ক'রে উঠতো মাথার মধ্যে। ঝাঁকিয়ে উঠতো মাথাটা। আর ভোরবেলা হ'ত ঘোড়ার দৌড়। দু'হাত দিয়ে কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত উপর থেকে নীচে ঝনঝন ক'রে ছুটে যেত কাঁপুনি। মনে হ'তো রক্ত ঘোড়ার মতো দৌড়ে নাবছে উপর থেকে নীচে। আঙুলগুলি ঝিনঝিন করতো। কেঁপে কেঁপে উঠতো সমস্ত শরীর। তাড়াতাড়ি উঠে বসতাম ঘুম চোখে। কি এক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম তা বোঝানোর ভাষা আমার নেই। সাপের ছোবল যে খায়নি সে জানে না সাপের বিষের জ্বালা কি।
যাই হ'ক, এমনিভাবেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল দিনগুলি। হঠাৎ ঝুপ ক'রে নেবে এলো শরীর আর মন জুড়ে অবসাদ, অবসন্নতা, ক্লান্তি আর অসুস্থতা। একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল জীবন চক্র। ঘরে হ'য়ে গেলাম বন্দী। বই পড়া, লেখালেখি সব হ'য়ে গেল বন্ধ। লিখতে গিয়ে মাথার ওপর প্রচন্ড চাপ পড়তো লেখা নিয়ে চিন্তার কারণে। কম্পিউটার হ'য়ে গেল চোখের বিষ। ছোট ছোট বিষয় তীব্র দুশ্চিন্তার কারণ হ'য়ে উঠলো। ঘুম থেকে উঠে আবার রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত এবং ঘুমের মধ্যেও ছোটো থেকে ছোটো, বড় থেকে বড় নানা বিষয়ে আগাম দুশ্চিন্তা এসে প্রচন্ড ঝাপটা মারতো মনের মধ্যে। বাইক চালানো মানুষ বাইক তো দূরের কথা সাইকেল চালালে হাত কাঁপত। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মনে হ'তো রাস্তাটা দুলে উঠছে। এমতোবস্থায় বাড়ির লোক নিয়ে গেল নিউরোলজিস্টের কাছে।
যেদিন নিউরোলজিস্টের কাছে গেলাম সেদিন চেম্বারের পরিবেশ আমাকে আতংকিত ক'রে তুললো। দেখলাম চেম্বারের বাইরে চেয়ারে সব বসে আছে নিউরো পেশেন্ট আর সঙ্গে তাদের লোকজন। এক জন ক'রে নাম ডাকা হচ্ছে আর বাইরেই ডাক্তারের লোকজন তাদের প্রেসার, অক্সিজেন মাত্রা চেক ক'রে ও ওজন মেপে নিয়ে লিখে নিচ্ছে। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে যাচ্ছে ছেলে, মেয়ের হাত ধ'রে চেম্বারে। তারপর পাঁচ মিনিট পরেই আবার বেরিয়ে আসছে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে সঙ্গে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা ও নোতুন ওষুধের লম্বা প্রেস্ক্রিপশান হাতে নিয়ে।

এইসব দেখতে দেখতে মনে হ'লো আমারও পরিণতি এমন হবে? এত ঠাকুরের কাজ নিয়ে থাকার পর দিন শেষে অবশেষে আমাকেও এভাবে কাঁপুনি, ডাক্তার আর ওষুধ নির্ভর হ'য়ে বাকী জীবন কাটাতে হবে? কাটাতে হবে বৌ, বৌমা আর ছেলের উপর নির্ভর ক'রে, পরনির্ভরশীল হ'য়ে!?

যখন চেম্বারে ঢুকলাম একগাল হেসে ডাক্তার সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বললো। আমি তাঁর সামনে রাখা একটা টুলে বসলাম। তিনি হেসে বললেন, কি হয়েছে বলুন। আমি আমার কথা সবিস্তারে বললাম। তিনি হাসিমুখে সব শুনলেন তারপর একটা হাতুড়ি দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত হাতুড়ি দিয়ে ঠক ঠক ক'রে মেরে কি যেন বোঝার চেষ্টা করলেন তারপর প্রেসক্রিপশান লিখতে শুরু করলেন। লেখা শেষ ক'রে দিন পনেরো পরে লিখে দেওয়া সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে আসতে বললেন। তারপর হাসতে হাসতে অনেক কথা বললেন, মনে জোর দিলেন, প্রবোদ দিলেন তারপর হ্যান্ডশেক ক'রে বললেন, কোনও চিন্তা নেই, সব ঠিক হ'য়ে যাবে।

ডাক্তারের ব্যবহার আমায় মুগ্ধ করলো। বেশ ভাল লাগল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর আচরণ। আমাকে বিদায় দেওয়ার পর তাঁর কম্পাউন্ডার পরবর্তী পেশেন্টের নাম ধ'রে ডাকলেন। আমি ধীরে ধীরে চেম্বারের বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর বাইরে অফিসে প্রেস্ক্রিপশান দেখানোর পর তাঁরা আমাকে ইসিজি ও হার্ট এক্সরে ক'রে নিতে বললেন। আমি সেইমতো ইসিজি ও হার্ট এক্সরে ক'রে নিলাম সেইখানেই। তারপরে অন্য আর একজায়গায় (M R I)) ব্রেন এক্সরে ও নানারকম রক্ত পরীক্ষা করাতে হ'লো। সমস্ত রিপোর্ট পেলে দিন পনেরো পরে আবার যেতে হবে চেম্বারেে। এরপরে বাড়ি ফিরে এলাম।

এরপরে শুরু হ'লো ওষুধ খাওয়ার পালা। প্রেস্ক্রিপশান অনুযায়ী একটা ওষুধ খাওয়ার চারদিন পর আমি একবারেই ঝিমিয়ে পড়লাম। যাও চ'লে ফিরে বেড়াতাম এবার আর বিছানা থেকেই উঠতে ভালো লাগতো না। বাকী ওষুধ খেতে ভয় লাগছিল।
( ২৮শে নভেম্বর' ২০২২ )
ক্রমশ

Saturday, July 1, 2023

প্রবন্ধঃ মূর্তি পূজো ও শ্রীশ্রীঠাকুর (৪)

ঠাকুরের কথা সব জায়গায় বলা যায়?
ঠাকুরের কথা মানে রক্তমাংস সংকুল জীবন্ত ঈশ্বরের কথা। মূর্তি বা বোবা ভগবান বা আকাশের অদৃশ্য ভগবান বা অমূর্ত ভগবান ( Unseen God)-এর কথা নয়। ঠাকুরের কথা মানে জীবন্ত নারায়ণের কথা। আগামীকাল ০২/০৭/২৩ রবিবার গুরুপূর্ণিমা। গুরুপূর্ণিমা অর্থাৎ গুরুদের জন্য উৎসর্গিত দিন। আষাঢ় মাসে এই গুরুপূর্ণিমা পালন করা হয়। ব্যবহারিক জীবনের গুরু ও আধ্যাত্মিক জীবনের গুরুকে শ্রদ্ধা জানাতে এই ব্রত পালন করা হয়। অর্থাৎ এখানে কোনও মূর্তিকে পুজো ও শ্রদ্ধা জানানোর ব্যাপার নেই। ঋষি বেদব্যাস আষাঢ় পূর্ণিমায় এই দিনে তাঁর শিষ্যদের জ্ঞান দান করেছিলেন তাই এই দিনটিকে গুরু পূর্ণিমা বা ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয়। সেই থেকে গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ছাত্ররা তাদের শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানায়। বর্তমানে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে এসব প্রথা উঠে গেছে। এসব এখন ব্যাক ডেটেড।
আবার কথায় আছে, যস্য কেন্দ্রে বৃহস্পতি কিং কুর্বন্তি গ্রহা। অর্থাৎ যার জীবনের কেন্দ্রে গ্রহের গ্রহ বিগ্রহ বৃহস্পতি আছে তাকে গ্রহ কিছু করতে পারে না। আর বৃহস্পতি অর্থাৎ রক্তমাংস সংকুল গুরু যার জীবনে আছে সেই গুরু তাকে দয়া করে অর্থাৎ রক্ষা করে সমস্ত গ্রহদোষ থেকে। আবার গ্রহদোষ মানে গ্রহণ দোষ আর গ্রহগুণ মানে গ্রহণ গুণ। অর্থাৎ তুমি তোমার জীবনের চলার পথে জীবন ধ্বংসের জন্য যে যে দোষ জীবনে গ্রহণ করেছো বা যে যে গুণাবলী জীবনে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য গ্রহণ করেছো তাই গ্রহদোষ বা গ্রহগুণ।
আর, এই যে সমস্ত রকম গ্রহদোষ থেকে রক্ষা করে গ্রহের গ্রহ বিশেষ গ্রহ বৃহস্পতি বা গুরু সেই বৃহস্পতি হ'লেন বিষ্ণু বা নারায়ণ।
তাই এই গুরুপূর্ণিমার দিনে বিষ্ণু বা নারায়ণ পূজো হয়ে থাকে। এই বিষ্ণু বা নারায়ণ মানে বিস্তার বা মানুষের চলার পথ। বিষ্ণু বা নারায়ণের অনেক ব্যাখ্যায় না গিয়ে শুধু বলি এই বিষ্ণু বা বিস্তার মানে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, "বিষ্ণু মানে তিনি, যিনি সর্ব্ব ও প্রত্যেকের ভিতর বিশেষভাবে পরিব্যাপ্ত।" আর নারায়ণ মানে ঠাকুর বললেন, নারায়ণ কথার অর্থ নর+অয়ন। অর্থাৎ নর মানে মানুষ আর অয়ন মানে পথ, চলার পথ। তাহ'লে মানুষের চলার পথের সন্ধান যিনি দেন তিনিই নারায়ণ।
এখন আমার আপনার সবার প্রাণে প্রাণে কে পরিব্যাপ্ত হ'য়ে আছেন আর কেই বা আমাদের জীবনে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য যে পথের দরকার সেই চলার পথের সন্ধান ব'লে দেন? তা কি ঐ হাজারো দেবদেবীর মূর্তি বা বোবা ভগবান বা আকাশের ভগবান বা অমূর্ত ভগবান ( Unseen God ) ব'লে দেন? কল্পনার ঐ বিষ্ণু বা নারায়ণের মূর্তি বা আঁকা ফটো কি কথা বলতে পারেন? তাঁরা আমাদের কি বলতে পারেন আমি তোমাদের সবার মধ্যে প্রাণ স্বরূপ পরিব্যাপ্ত হ'য়ে আছি ও তোমার জীবনে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য এই এই নিখুঁত ও পরিপূর্ণ চলার পথের সন্ধান ব'লে দিলাম? তাঁরা কি পারেন বলতে, এটা ক'রো না, ওটা ক'রো না, এটা ব'লো না, ওটা ব'লো না, এটা খেয়ো না, ওটা খেয়ো না, এখানে যেয়ো না, ওখানে যেয়ো না ইত্যাদি? পারেন না। যা কিছু বলেন ঐ জীবন্ত বিষ্ণু বা জীবন্ত নারায়ণ বলেন।
জীবন্ত ঈশ্বর শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা মানে জীবনের কথা, বাঁচা-বাড়ার কথা। জীবন বর্দ্ধনের কথা। অস্তি বৃদ্ধির কথা। মরণকে রোধ ক'রে জীবনের পথে এগিয়ে চলার কথা। অস্তিত্ব রক্ষার কথা। আনন্দময় জীবন লাভ ও তা' উপভোগের কথা। ভুল ভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচার কথা। বৃত্তি-প্রবৃত্তির বেড়া জাল থেকে বেরিয়ে আসার কথা। শয়তানের ছড়ানো মোহজাল থেকে উদ্ধার পাওয়ার কথা। পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক কুসংস্কার থেকে রক্ষা পাবার কথা। চারপাশের জীবন বিধ্বংসী মোহজাল থেকে বেরিয়ে আসার কথা। নিজের মিথ্যে অহঙ্কার, ইগো থেকে বেরিয়ে আসার কথা। ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে ভুল, মিথ্যে, ভ্রান্ত প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার কথ। সংসার জীবনের কথা। জন্মের আগে ও জন্মের পর থেকে শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্য জীবনে নিখুঁত চলার কথা। অকাল মৃত্যুকে রোধ করার কথা। নাম ধ্যান অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা। তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকলে কুষ্ঠি ওলোটপালোট ক'রে দেওয়ার কথা। নিশ্চিত বিপদ, দূর্ঘটনা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা। সমস্ত রকম রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা। জন্ম বিজ্ঞান ও বিবাহ বিজ্ঞানের কথা। সমাজ গঠনের কথা। শিক্ষা ব্যবস্থার কথা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিকের কথা। সবটাই শুধু পজিটিভ-পজিটিভ আর পজিটিভ। নেগেটিভ ব'লে কিছুই নেই, কোনও অস্তিত্বই নেই।
মোদ্দা কথা জীব ও জগতের এমন কোনও দিক নেই যে দিকের জীবনীয় কথা, জড় (?) ও অজড় সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব রক্ষা ও বৃদ্ধির কথা জীবন্ত ঈশ্বর, মূর্ত ভগবান বা ঈশ্বর, জীবন্ত ঈশ্বর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ব'লে যাননি। তাই ঠাকুরের কথা মানেই বাঁচার ও বেড়ে ওঠার কথা আর সে কথা সব জায়গায় বলা যায়।
আর, সেই জীবন্ত মূর্ত রক্তমাংস সংকুল ঈশ্বর, সেই মানুষরূপী বিষ্ণু বা নারায়ণ হ'লেন রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ, মুহাপ্রভু, রামকৃষ্ণ ও সর্ব্বশেষ The greatest phenomenon of the world SriSriThakur Anukulchandra. সেই এক ও অদ্বিতীয়ের পূজা হবে কাল গুরুপূর্ণিমার দিনে। কারণ তিনিই একমাত্র আধ্যাত্মিক জগতের গুরু; বাকী সব সাধক।
তাই-ই আমাদের নানা দেবদেবীর মূর্তি পূজো, আংটি, তাবিজ, মাদুলি, লাল সুতো, নীল সুতো, কালো সুতো, তুকতাক, ঝাড়ফুঁক, মায়াজাল ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যথাশীঘ্র সম্ভব আর শয়নে-স্বপনে-জাগরণে-ভোজনে যদি বাঁচতে চাই ও বাড়তে চাই তাহ'লে পূজো করতে হবে জ্যান্ত জগন্নাথ দেবের, জীবন্ত ঈশ্বর রক্তমাংসের নারায়ণের। আর, চলতে হবে তাঁর ব'লে যাওয়া পথ ধ'রে। তবেই মুক্তি, তবেই শান্তি, তবেই হবে এই জন্ম ও জীবন হবে সার্থক ও সফল।
তাই আসুন, কাল আমরা সৎসঙ্গীরা গুরুপূর্ণিমায় ফটোর আঁকা নারায়ণ, অমূর্ত নারায়ণ, বোবা নারায়ণ, আকাশের নারায়ণকে দূরে সরিয়ে রেখে জীব জগৎ জীবন কারণ করুণাময় স্বামী জীবন্ত নারায়ণ, মূর্ত নারায়ণ, কথা বলা নারায়ণ, মানুষ মায়ের গর্ভে মানুষ রূপে মানুষের মাঝে নেবে আসা রক্তমাংসের নারায়ণ এক ও অদ্বিতীয় গুরু শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আয়োজনের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি ও গুরুপূর্ণিমা পালন করি। ( শেষ )
----------প্রবি।

প্রবন্ধঃ মূর্তি পুজো ও শ্রীশ্রীঠাকুর (৩)

আজ এই বয়স পর্যন্ত সৎসঙ্গীদের প্রায় যার ঘরেই গেছি দেখেছি অদ্ভুত ঠাকুরের আসন। আসনে সিঁদুর চন্দন দিয়ে ল্যাপটানো দুনিয়ার অমূর্ত ভগবানের আর সাধক ও তথাকথিত গুরুদের ছবি। সঙ্গে লালনীল ফুল দিয়ে জবরজং ক'রে সাজানো আসন। সিঁদুর, চন্দন দিয়ে ল্যাপটানো লালনীল ফুল দিয়ে অগোছালো, এলোমেলো ক'রে সাজানো আসন দেখলে ভক্তির বদলে বিরক্তি আসে ও নেগেটিভ ভাবের উদ্রেক হয়। দূর্বল হৃদয় ও মনের মানুষ ভয় পায়। আর এই দুর্বলতা ও ভয়ই হয় ধর্ম ও ঈশ্বর বেওসায়ীদের মোক্ষম অস্ত্র।
আর, এখান থেকেই আমাদের ঠাকুর টেনে বের ক'রে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সৎসঙ্গীরাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক সৎসঙ্গীদের মানসিক উন্নতির এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের স্বপ্নপূরণের। আরও পরিষ্কার ক'রে বললে বলতে হয় দ্বিধাহীন কন্ঠে, এই ধরণের সৎসঙ্গীদের সঙ্গে সঙ্গে এর জন্যে দায়ী শ্রীশ্রীঠাকুরের মেসেঞ্জার রূপী ঋত্বিক, যাজক ও অধ্বর্য্যুরা (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে এবং সংখ্যায় তা নগন্য)। কারণ ইনারা নিজেরাই এই মূর্তি বা দেবদেবী পূজা থেকে বেরোতে পারেননি। এদের ঘরেও নানা দেবদেবী ও গুরুদের একসঙ্গে অবস্থান। কেউ কেউ অবশ্য আলাদা আসনের ব্যবস্থাও ক'রে রেখেছেন। এর পক্ষেও এদের মোক্ষম যুক্তি সাজানও আছে এবং তা আছে ঠাকুরের বাণীকে আশ্রয় ক'রেই। এছাড়া এরা অনেকেই ঠাকুরের অনেক কথা মানেন না। উদাহরণ স্বরূপ যেমন, ঠাকুরের নিষেধ আছে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম না করা। কিন্তু এরা ঠাকুরের সামনেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম নেয়। বেশী উদাহরণ দিয়ে বিষয়কে তিক্ত করতে চাই না। আর বাণীর একটা দু'টো উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যাবে মূর্তি পূজোর পক্ষে এদের সওয়াল। আসলে ব্যাপারটা হ'লো নিজের মনকে চোখ ঠারা।
এদের যুক্তির উদাহরণঃ
"পূর্বপুরুষ চেতন ধারা ধর্মে যদি ছাড়তে হয়
জোর গলাতে বলছি আমি নিছক সেটা ধর্ম নয়"
"পূর্বতনে মানে না যারা
জানিস নিছক ম্লেচ্ছ তারা!!" ----এমনি আরো অনেক বাণী আছে যা এদের নিজের বৃত্তি-প্রবৃত্তির লালন-পালনের পক্ষে মোক্ষম জোরালো অস্ত্র। একেবারে সাধারণ সৎসঙ্গীরা যেহেতু এসব বাণীর অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞাত তাই তারা এদের দ্বারা বিপথে চালিত হয়। এরা নিজেরাও মরে অন্যকেও মারে।
মূর্তি পূজার পক্ষে সওয়ালকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অহেতুক ইগোতে নিয়ে নেয় আর ক্ষিপ্ত হ'য়ে যায়। নিজের পয়েন্টে স্ট্রিক্ট থেকে আলোচনায় চনা ঢেলে দিয়ে আঘাত ক'রে বসে। আর সেই কমেন্টে তার পছন্দের লোকেরা তাকে বাহবা দেয় আর আমাকে বিশ্রীভাবে ব্যঙ্গ ও কটুক্তি করতে কমেন্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর, পরে সমস্ত আলোচনা ডিলিট ক'রে দেয়, পাঠককে পড়ার সুযোগ দেয় না। পরে আলাদা ক'রে মতামত পোষ্ট করে। তখন ভাবি আমরা সবাই ঠাকুরের কথামতো সত্যিই সোনার সৎসঙ্গী!?
যাই হ'ক এবার আসি আমার দয়াল ঠাকুর মূর্তি পূজো সম্পর্কে কি বলেছেন তাঁর দু'একটা উদাহরণে।
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, "ঋষিদের কেতাবেও মূর্তিপূজার কথা নাই। কোরাণ শরিফ, বাইবেল বা বৌদ্ধ গ্রন্থাদিতেও মূর্তিপূজার কথা নাই। যেখানে ওসব ব্যবস্থা আছে তা' দেবতা বা hero-দের পূজার কথা। ভগবান পূজোর কায়দায় ওসব পুতুল-টুতুল, গরু, মোষ______ওসব নেই বাবা।
আর দেবতা কথার মানেই হ'চ্ছে------যিনি, যে বা যারা মানুষের প্রয়োজনকে পূরণ ক'রে, তা'দের পরিপোষণের স্বার্থ হ'য়ে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞ অর্ঘ্যের অধিকারী হ'য়েছেন। ঐ রকম পূজা, পার্ব্বণ যা'-কিছু হিন্দুদের-----তা' ভগবৎ-অনুগ্রহ-সম্পন্নদেরই। ভগবান পূজার একমাত্র চিহ্নই হ'চ্ছে জ্যান্ত পুতুল ঐ পয়গম্বর, পীর, ঋষি, আদর্শ বা ইষ্ট। এঁর বা এঁদের অনুসরণ না করলে, পূজা না করলে, ভক্তির টানে আনত না হ'লে, পোষণ ও বর্দ্ধনের সেবায় আপ্রাণ না হ'লে,------বিন্যস্ত জ্ঞানের, বিন্যস্ত ভুয়োদর্শনের অধিকারী কিছুতেই হওয়া যাবে না। আর এই দর্শন বিশেষ সূক্ষ্ম, বিশেষ তীক্ষ্ণ না হ'লে খোদাকে উপলব্ধি করা কিছুতেই যাবে না। এ বাবা কঠোর সত্য------সব মালিকের এক জেল্লা-----সবাই ঐ কথায় ব'লেছেন।"------------প্রবি।
ক্রমশঃ

প্রবন্ধঃ মূর্তি পুজো ও শ্রীশ্রীঠাকুর (২)

আমার এই লেখা কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণের উদ্দেশ্যে লেখা নয়। অনেকেই ভুল ক'রে সেটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে আমার বক্তব্যের ভুল অর্থ ক'রে আমাকে ভুল বুঝে থাকেন ও অপমান ক'রে বসেন। তা'তে আমি দুঃখ পাই না। যাজন করতে গিয়ে পড়াশুনা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধির নিরিখে মতবিরোধ হ'য়ে থাকে ও হ'তেই পারে। আমার সহ্জ সরল উপলব্ধিঃ যাজনে মতান্তর হ'তেই পারে, মনান্তর যেন না হয়। ভুল হ'লে আমরা শুধরে নিতে পারি আর অবশ্যই তা ঠাকুরের বলাকে মেনে নিয়েই। কিন্তু যেন ইগো কে স্ট্রং ক'রে আক্রমণ ক'রে না বসি একে অপরকে। কারণ আমরা সৎসঙ্গী গুরুভাইবোন।
আমি আমার সবচেয়ে বড় যে শত্রু 'দুর্বলতা' যে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে আমার হৃদয়ে ও মনের আনাচে কানাচে উদারতার ভঙ্গিতে ভালোমানুষের সাজে, ভক্ত মানুষের ছদ্মবেশে তাকে চিহ্নিত ক'রে একেবারে উপড়ে নিয়ে গোড়া থেকে খতম ক'রে দেওয়ার সাধনা এই জন্মে আমার আর তাই হয়তো মতবিরোধ হ'য়ে পড়ে অনিবার্যভাবেই। একে আমার জ্ঞান দান ব'লে যারা কটাক্ষ ক'রে থাকেন তারা আমার সব সন্তান সম সৎসঙ্গী। তাই দুঃখ বা কষ্ট হয় তাদের আগামীদিনের কথা ভেবে।
যাই হ'ক, আমার মূর্তি পুজো ও শ্রীশ্রীঠাকুর (১) আমি যেখানে শেষ করেছিলাম সেই লেখাটা আবার লিখেই শুরু করছি এই প্রতিবেদন।
"------------------ এবার দেখে নিই আমার দয়াল ঠাকুর কোথায় কোথায় কখন কাকে কি বলেছেন বা কি আচরণ করেছেন এই অমূর্ত ভগবান (Unseen God)-এর পুজো প্রসঙ্গে।"
(১) শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর সত্যানুসরণ গ্রন্থে পরিস্কারভাবে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, "ভারতের অবনতি (degeneration) তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছে, যখন থেকে ভারতবাসীর কাছে অমূর্ত ভগবান অসীম হ'য়ে উঠেছে------ঋষি বাদ দিয়ে ঋষিবাদের উপাসনা আরম্ভ হয়েছে।"
এখানে তিনি দু'টো বিষয় পরিষ্কার ক'রে দিয়েছেন। প্রথমতঃ ভারতের অবনতির কারণ বলতে গিয়ে তিনি ভারতবাসীর অমূর্ত ভগবান (Unseen God)-এর প্রতি সীমাহীন নির্ভরতার কথা বলেছেন। আর, মুখে মারিতং জগতের মত শুধু ঋষির কথাগুলি প্রবচনের মাধ্যমে আউড়ে আউড়ে জগৎ মাতিয়ে গেছে ভারতবাসী কিন্তু ঋষিকে জীবন থেকে মাইনাস ক'রে দিয়েছে।
(২) একবার এক মা যিনি সবসময় ঠাকুরের সেবায় লেগে থাকতেন তাঁর পুরীর জগন্নাথদেবের দর্শন লাভের ইচ্ছা হয়েছিল। ঠাকুরের কাছে সে কথা বারবার জানানোই ঠাকুর তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেন। পুরীর জগন্নাথ দর্শন শেষে আশ্রমে ফিরে যখন সেই মা জগন্নাথ দেবের বর্ণনা দিচ্ছেন তখন ঠাকুর কথাচ্ছলে বলেছিলেন,
"জীবননাথকে হেলায় ফেলে জগন্নাথকে দেখতে গেলি
জীবননাথই যে জগন্নাথ অহংকারে দেখতে না পেলি।"
------এইখানেই এই বাণীর মধ্যে দিয়ে দয়াল ঠাকুর অমূর্ত ভুগবানের পূজারীদের উদ্দেশ্যে তাঁর রহস্যময় পরিচয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যা সমঝদারকে লিয়ে কাফি হোতা হ্যাঁয়।
(৩) একবার শিবরাত্রির পুজোর দিন আশ্রমের মায়েরা বাবাধামে শিবের পুজো দিতে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ঠাকুর সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। গাড়িতে ক'রে মায়েদের নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। একবারে সব মায়েদের নিয়ে যাওয়ার অসুবিধা থাকায় কয়েকবারে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়। এইভাবে একটা সময় গাড়ি আসতে দেরী করায় (সম্ভবত গাড়ি খারাপ হয়) পুজোর সময় উত্তীর্ণ হ'য়ে যাবার আশংকায় মায়েরা উদ্বিগ্ন হ'য়ে পড়ে। গাড়ি সময় মতো এসে না পড়ার কারণে সময় যখন প্রায় শেষ হ'য়ে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন মায়েরা ছুটে এসে ঠাকুরের কাছে তাদের পুজো দিতে যেতে না পারার কারণ নিবেদন করেন তখন মায়েদের সারাদিন উপোস থাকা শুকনো করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে দয়াল ঠাকুর মায়েদের দিকে তাকিয়ে শশব্যস্তে বলেছিলেন, তাড়াতাড়ি পুজোর যা কিছু আছে নিয়ে আয়। ঠাকুরের কথা শুনে মায়েরা পুজোর সামগ্রী সব এনে ঠাকুরের সামনে উপস্থিত হ'লে ঠাকুর মদু হেসে নিজের দুই হাতের তালু বাড়িয়ে বলেছিলেন, দে, দে তাড়াতাড়ি দে, তোদের যা দেবার। মায়েরা সেই দৃশ্য দেখে সবিষ্ময়ে দয়ালের দুই হাতের তালুতে জল ঢালতে লাগলেন। সে এক অপরূপ দৃশ্য! মায়েরা একে একে জল ঢেলে চলেছেন দয়ালের দুই হাতের তালুতে আর সেই জল হাতের তালু গড়িয়ে এসে পড়ছে দয়ালের চরণ যুগলে। এই অভুতপূর্ব দৃশ্য দেখে মায়েরা সেদিন স্তম্ভিত হ'য়ে গিয়েছিল। সেদিন যে মায়েরা বাবাধামে পুজো দিতে যেতে পারেনি সেই মায়েরা উপলব্ধি করলো তাদের জীবনে শ্রেষ্ঠ শিবপুজো পালন হ'লো জীবন্ত শিবের চরণ বন্দনায়। সেই মায়েদের জীবন ধন্য হয়েছিল সেদিন। সার্থক হয়েছিল জীবনে শিবব্রত পালন। সেই থেকে মায়েরা প্রতিবছর শিবপুজোর দিন শিবব্রত পালন করতো ঠাকুরের সামনে, বাবাধামে যাওয়ার আর দরকার মনে করেনি মায়েরা।
এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমার দয়াল ঠাকুর অমূর্ত ভগবান শিবের পূজারিদের উদেশ্যে মূর্ত ভগবান শিবের উপস্থিতি তাঁর রহস্যময় কার্যক্রমের মাধ্যমে তুলে ধ'রে এক মেসেজ দিলেন।
(৪) আমরা এটাও জানি একেবারে ছোটোবেলায় জমিদার উমেশ লাহিড়ীর ঠাকুরঘরের ঘটনা। সেদিন উমেশবাবু ঠাকুরঘরে ঢুকেই হতবাক হ'য়ে গেলেন। ছোট্ট অনুকূল ঘরে ঢুকে আসন থেকে বিগ্রহ, পট ইত্যাদি সবকিছু মাটিতে ফেলে দিয়ে নিজেই আসনে বসে আছে। জমদার উমেশবাবুকে দেখে ছোট্ট শিশু অনুকূল হাসতে থাকে। কোনও ভয়ের লেশমাত্র নেই চোখেমুখে! উমেশবাবু রাগ করলেন না। শিশু অনুকূলের মন ভোলানো প্রাণ জুড়ানো সরল মিষ্টি হাসি দেখে নিজেও হাসতে লাগলেন। মাতা মনোমোহিনী দেবী ছুটে এলেন। এ দৃশ্য দেখে ক্রূদ্ধ হ'লেন, শিশুকে মারতে উদ্যত হ'লেন। জমিদার উমেশবাবু নিষেধ করলেন শিশুকে মারতে। তিনি উপভোগ করতে লাগলেন এই অপরূপ রহস্যময় দৃশ্য!
এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে বালক অনুকূল অমূর্ত নারায়ণের (Unseen Narayana) পূজারী উমেশবাবুকে এবং সমগ্র হিন্দু সমাজের অমূর্ত ভগবান নারায়ণের Unseen God Narayana) পূজারী ভক্তদের মূর্ত নারায়ণের ( Seen Narayana) উপস্থিতির জ্বলন্ত মেসেজ দিলেন।-------প্রবি।
ক্রমশঃ

প্রবন্ধঃ মূর্তি পুজা ও শ্রীশ্রীঠাকুর (১)

মূর্তি পুজা নিয়ে নানাভাবে ঠাকুরের স্পষ্টভাবে বলা আছে। তা সত্ত্বেও দেবদেবীর পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকা সৎসঙ্গীরা মূর্তি পুজোর পক্ষে সওয়াল ক'রে চলেছে; ক'রে চলেছে ঠাকুরকে, ঠাকুরের বাণীকে হাতিয়ার ক'রে। সেই বাণীর অর্থের সঙ্গে মূর্তি পূজোর কোনও সম্পর্ক বা মিল থাকুক আর নাই থাকুক ব্যবহার করলেই হ'লো। শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝবো না, বোঝার চেষ্টা করবো না, অথচ উপরি ভাসা ভাসা আধাখেঁচড়া অর্থ বুঝেই সৎসঙ্গে দাঁড়িয়ে ও ফেসবুকের মাধ্যমে তা তামাম সৎসঙ্গী ও সাধারণ ধর্ম বা ঈশ্বর বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীদের মধ্যে তুলে ধ'রে ঠাকুরকে প্রকারান্তরে ছোটো ও কলঙ্কিত করবো।
সম্প্রতি ফেসবুকে এইরকম নানালেখা নিয়ে সৎসঙ্গীরাই কনফিউজড। বিপদতারিণী পুজো হ'য়ে গেল দু'দিন আগে। সেই নিয়েও অনেক সৎসঙ্গী দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ ক্ষিপ্ত বিপদতারিণী পুজো প্রসঙ্গে বহুনৈষ্ঠিকের প্রসঙ্গ তোলায়। কিছুদিন আগে কোন্নগরের শকুন্তলা কালিপুজোকে কেন্দ্র ক'রে ফেসবুকে আলোচনায় সৎসঙ্গী মায়েদের কাছ থেকে চরম অপমানিত হয়েছি। এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি প্রায় সবসময়েই হ'তে হয়। দূর্বলতা এতটাই তীব্র সেখানে ঠাকুরের উপস্থিতিও গৌণ হ'য়ে যায়। মূর্তি পুজোতে মানুষের বিশেষ ক'রে মায়েদের দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। এই প্রসঙ্গ উঠে আসে প্রায় সময়ই নানা দেবদেবীর পুজোকে কেন্দ্র ক'রে। সৎসঙ্গী যারা নানা দেবদেবীর পুজো করে, আরও নানা ধর্মীয় গুরুর আরাধনা করে, নানা ব্রত পালন করে, আংটি, মাদুলি, তাবিজ, লাল কালো হলুদ সুতো ইত্যাদি ধারণ করে, ইদের কোরবানির মত মায়ের মূর্তির সামনে বলি দেয় আবার শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষা গ্রহণ ক'রে সৎসঙ্গে গলা ফাটিয়ে ঠাকুরের জীবন দর্শন বুঝুক আর অল্প বুঝুক কিংবা না বুঝুক তা বলে ও নিজের মন মতো তাঁর পুজো করে। সাধারণ দীক্ষিত, স্বস্ত্যয়নীধারী, ঋত্বিক, যাজক, অর্ধ্বয্যু প্রায় সকলকেই দেখেছি (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে) এই 'আমি জিরাফেও আছি আবার ধর্মেও আছি' রোগে আক্রান্ত। তাদের ল্যাজে পা পড়লেই তারা ফোঁস ক'রে ওঠে, নিজের বৃত্তি-প্রবৃত্তিকে সযত্নে লালন পালন করে। এর জন্য ঠাকুরকেও স্যাক্রিফাইস করতে দ্বিধা বোধ করে না।
এইসব দেখে মনে হয়, আমি জিরাফেও আছি আবার ধর্মেও আছি প্রবাদটা কত সত্য। এই জিরাফেও আছি আবার ধর্মেও আছি মানসিকতার যারা তারা ঠাকুরকে নিজের বৃত্তি-প্রবৃত্তি অনুযায়ী কাজে লাগায়। ঠাকুরের যে কথাগুলি বৃত্তি-প্রবৃত্তির পক্ষে পোষণ দেয় না, বিপক্ষে অবস্থান করে সেই কথাগুলি তাদের কাছে গ্রহণীয় নয়। সেই কথা বা বাণীগুলিকে নিজের মতো ক'রে তারা ব্যাখ্যা ক'রে নেয়।
যাই হ'ক, এবার দেখে নিই আমার দয়াল ঠাকুর কোথায় কোথায় কখন কাকে কি বলেছেন বা কি আচরণ করেছেন এই অমূর্ত ভগবান (Unseen God)-এর পুজো প্রসঙ্গে।------------প্রবি।
ক্রমশঃ